০৬ জুলাই ২০২২, ২২ আষাঢ় ১৪২৯, ৬ জিলহজ ১৪৪৩
`

হু হু করে দাম বাড়ছে গোখাদ্যের বিপর্যস্ত পাবনার খামারিরা

বেড়ার সিঅ্যান্ডবিতে খড় বিক্রি। ইনসেটে একটি গুদামে মজুদ করে রাখা বিভিন্ন ব্রান্ডের ভুসি : নয়া দিগন্ত -

গবাদিপশু সমৃদ্ধ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত পাবনা ও সিরাজগঞ্জে গোখাদ্যের দাম হু হু করে বাড়ছে। গোখাদ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে এ অঞ্চলের খামারি, গোব্যবসায়ী ও চাষিদের এখন দিশেহারা অবস্থা। কিন্তু খাদ্যের দাম নাগালের বাইরে চলে গেলেও দুধের দাম বাড়েনি। প্রতি লিটার দুধের দাম ৬০ টাকা থেকে কমতে কমতে এখন ৪৫ থেকে ৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এর ওপর অগ্নিমূল্যের গোখাদ্যে অসাধু ব্যবসায়ীরা ভেজাল দেয়ার পাশাপাশি ওজনেও কম দিচ্ছেন। এ অবস্থায় অব্যাহত লোকসানে অনেক খামারি ও ব্যবসায়ী বাধ্য হয়ে গরু বিক্রি করে দিচ্ছেন।
পাবনা ও সিরাজগঞ্জ প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানা যায়, বাঘাবাড়ী মিল্কভিটার আওতায় ৩৫০টি দুগ্ধ সমবায় সমিতি রয়েছে। সমিতিতে গোখামার রয়েছে ১২ সহস্্রাধিক। এ ছাড়া পাবনা-সিরাজগঞ্জ জেলায় তালিকাভুক্ত খামারের সংখ্যা প্রায় ২৪ হাজার। এ অঞ্চলে গরুর সংখা প্রায় ১৩ লাখ।
খামারি ও গোখাদ্য ব্যবসায়ীরা জানান, দিন দশেকের ব্যবধানে ৪০ টাকা কেজি দরের গম ও অ্যাংকর ডালের ভুসি ৫৭ টাকা, ৪৫ টাকা কজি দরের খেসারির ভুসি ৫৫ টাকা, ৩৪ টাকা কেজি দরের মশুরির ভুসি ৪২ টাকা, ১১ টাকা কেজি দরের ধানের গুঁড়া ১৫ টাকা হয়ে গেছে। গরু পালনকারীরা সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন মূল গোখাদ্য খড় কিনতে গিয়ে। কয়েক দিন আগেও ৩৫০ টাকা মণ দরে খর বিক্রি হতো, এখন সেই খরের দাম হয়েছে ৫০০ টাকা। তা-ও ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না।
খামারিরা অভিযোগ করে জানান, প্রতি বস্তায় ৩৭ কেজি করে ভুসি থাকার কথা থাকলেও অসাধু ব্যবসায়ীরা দুই থেকে তিন কেজি করে কম দিচ্ছেন। এসব ব্যবসায়ী বস্তা থেকে দুই থেকে তিন কেজি ভুসি বের করে তা নতুন করে সেলাই করে দেন। আবার কোনো কোনো ব্যবসায়ী ওজন সঠিক দেখানোর জন্য তুষ, পচা আটা, ধানের গুঁড়াসহ বিভিন্ন ধরনের ভেজাল মিশিয়ে দিয়ে থাকেন। খামারিরা বস্তাগুলোতে নিখুঁত সেলাই ও লেবেল দেখে তা ভালো ভুসি মনে করে কিনে নিয়ে যান। এতে তারা প্রতারিত হন। ভোজাল গোখাদ্যের কারণে গাভীর দুধ কম হচ্ছে।


এ ছাড়া খড় কিনতে গিয়েও খামারিরা প্রতারিত হচ্ছেন। খড় বিক্রেতারা প্রতি মণে পাঁচ থেকে আট কেজি করে ওজন কম দিচ্ছে বলে খামারিরা অভিযোগ করেছেন। সরেজমিন বেড়া ও সাঁথিয়ার কয়েকটি খড় বিক্রির স্থান ঘুরে দেখা গেছে সেখানে খড় ওজন করার কোনো ব্যবস্থা নেই। অনুমানের ভিত্তিতে বিক্রেতারা খরের বোঝা তৈরি করে তা খামারিদের কাছে মণ হিসেবে বুঝিয়ে দিচ্ছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাবনার সাঁথিয়া, বেড়া, সুজানগর, চাটমোহর, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, উল্লাপাড়াসহ কয়েকটি উপজেলায় ভেজাল গোখাদ্যের বিরুদ্ধে অনেক আগে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান চালিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীদের জেল-জরিমানা করা হয়েছিল। কিন্তু তাতে ভেজাল মেশানো বন্ধ হয়নি। প্রায় দুই বছর ধরে উপজেলাগুলোয় ভেজাল গোখাদ্যের বিরুদ্ধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো অভিযান পরিচালিত হচ্ছে না। এ সুযোগে ভেজাল কারবারিরা সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। ফলে প্রতারিত হচ্ছেন গোখামারি ও চাষিরা।
এ দিকে শুধু গোখাদ্যেই নয়, গবাদিপশুর চিকিৎসায় (ভেটেরিনারি) ব্যবহৃত ওষুধ নকল করা হচ্ছে। পাবনা ও সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার গোপন কারাখানা বসিয়ে কিছু অসাধু ব্যক্তি চালু কোম্পানির নকল ভেটেরিনারি ওষুধ তৈরি করে গ্রামাঞ্চলের ওষুধের দোকানে দোকানে সরবরাহ করে আসছে। এসব নকল ওষুধ কিনে খামারি ও চাষিরা প্রতারিত হচ্ছেন অভিযোগ উঠেছে।


সাঁথিয়া উপজেলার করমজা বাজারের খড় বিক্রেতা আব্দুল আউয়াল জানান, অনুমানের ভিত্তিতে খড়ের বোঝা বানিয়ে বিক্রি হলেও ওজন ঠিকই দেয়া হয়। আর কয়েক দিনের বৃষ্টিতে অনেক জায়গায় খড় নষ্ট হয়ে গেছে। এর ফলে মোকামে গিয়েও খর পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে দাম বেড়েই চলেছে।
বেড়া পৌর এলাকার বৃশালিখা মহল্লার খামারি আবুল মোমিন বলেন, ঈদের আগে এক কেজি গমের ভুসির দাম ছিল ৩৫ টাকা। ঈদের তিন-চার দিন পর সেই ভুসির দাম হয়ে গেল ৪০ থেকে ৪৫ টাকা। গমের ভুসির দাম ৫৭ টাকা কেজিতে গিয়ে ঠেকেছে। একই হারে অন্য গোখাদ্যের দামও বেড়ে গেছে। তাই বাধ্য হয়ে খামারের ১২টা গরুই বেচে দিলাম।
বেড়া পৌরসভার আমাইকোলা মহল্লার খামারি মাসুদ শেখ বলেন, ‘এমনিতেই পাল্লা দিয়্যা গোখাদ্যের দাম বাড়তেছে। এর ওপর এগুলোতে ভেজাল আর ওজনে কম দেয়া হতেছে। অবস্থা দেইখ্যা আমি খামারের সব গরু বেইচ্যা দিছি। আমাগরে এলাকার অনেকেই গোখাদ্যের দামে দিশেহারা হয়া গরু বেচতেছে।’
জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত বনগ্রাম মহল্লার খামারি মাহফুজা মীনা বলেন, ‘আমার খামারে মোট ৬৫টি গরু। প্রতিদিন ৩০০ লিটারের মতো দুধ হয়। এই দুধের দাম তিন-চার বছর আগে (প্রতি লিটার ৪৫ টাকা) যেমন ছিল এখনো তেমনই আছে। অথচ গোখাদ্যের দাম এই কয়েক বছরে দুই-তিনগুণ বেড়েছে। রোজার আগেও আমার খামার থেকে লাভ হতো। গোখাদ্যের দাম বাড়ায় এখন প্রতি মাসে এক লাখ টাকা লোকসান যাচ্ছে। তাই খামারর গরু বেচে দিতে শুরু করেছি।’
বেড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবুর আলী বলেন, ভেজাল গোখাদ্য ও নকল ওষুধের ব্যাপারে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাকে খোঁজ নিতে বলা হয়েছে। এ ব্যাপারে যাদের বিরুদ্ধে তথ্য প্রমাণ পাওয়া যাবে, তারা যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।


আরো সংবাদ


premium cement