২২ মে ২০২২
`

জলবায়ু পরিবর্তনে সুন্দরবন উপকূলে বিরূপ প্রভাব

সাগরের উগরে দেয়া লবণ পানিতে প্লাবিত হচ্ছে জমি; এতে কমছে উৎপাদন ক্ষমতা : নয়া দিগন্ত -

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে হুমকির মুখে পড়েছে সুন্দরবন উপকূলীয় অঞ্চল। সাগরের উগরে দেয়া লবণ পানিতে প্লাবিত জমিতে কমছে উৎপাদন ক্ষমতা। খুলনার পাইকগাছা-কয়রা অঞ্চলে জীবন-জীবিকায় ইতোমধ্যে পরিবর্তন দেখা দিয়েছে।
নিয়ম করে বছরের বিভিন্ন সময় নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে নদ-নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে প্লাবিত হচ্ছে বিস্তীর্ণ এলাকা। এসব কারণে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় সুপেয় পানির সঙ্কটের পাশাপাশি প্রতিনিয়ত বিলীন হচ্ছে গাছপালা, নষ্ট হচ্ছে ফসলি জমি, হ্রাস পাচ্ছে কৃষি উৎপাদন।
এতে মানুষ একদিকে কর্মহীন হয়ে পড়ছে অন্য দিকে বসবাসের অনুপযোগী হচ্ছে উপকূল। জীবন-জীবিকার তাগিদে প্রতি বছর পেশা বদল করছে বড় একটি অংশ। অনেকে আবার নতুন কাজের সন্ধানে পাড়ি জমাচ্ছে রাজধানীসহ দেশের অন্যত্র। নতুন নতুন অভিজ্ঞতার সামনে জীবিকার তাগিদে রীতিমতো সংগ্রাম করতে হচ্ছে উপকূলবাসীর।
প্রতি বছর দুর্যোগ আঘাত হানছে এ অঞ্চলে। সিডর, আইলার ক্ষত কাটিয়ে ওঠার আগেই গত দুই বছরে তিনটি বড় ধরনের দুর্যোগ আঘাত হেনেছে এলাকায়। এতে ওয়াপদার বেড়িবাঁধ ভেঙে ব্যাপক ক্ষতিসাধন হয়েছে। সময়ের ব্যবধানে নাব্যতা হারিয়েছে এলাকার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নদী। যার মধ্যে কপোতাক্ষ, শিবসা ও হাড়িয়া নদী অন্যতম। পানি নিষ্কাশনে প্রতিবন্ধকতার মুখে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় দু’উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চলে। আর এ সুযোগে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ঢুকে পড়ে লবণ পানি। এসব নদ-নদীর মাধ্যমে সমুদ্রের উগ্রে দেয়া পানি ও অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষাবাদের ফলে বিভিন্ন পোল্ডার অভ্যন্তরে এক প্রকার অবাধে অনুপ্রবেশ ঘটছে লবণ পানির। এতে ফসলি জমির উর্বরতা শক্তি হ্রাসের পাশাপাশি নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্থ জীব ও প্রাণী বৈচিত্র্যের।
উপজেলার লতা ইউনিয়নের গঙ্গারকোনা গ্রামের আদিত্য সরকার বলেন, এলাকায় সুপেয় পানির তেমন কোনো ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিদিন হেঁটে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে খাবার পানির ব্যবস্থা করতে হয়। এ ছাড়া লবণ পানির বিরূপ প্রভাব, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, অতিবৃষ্টি এবং জোয়ারের উপচে পড়া পানিতে বনাঞ্চল উজাড়ের পাশাপাশি ঘর-বাড়িসহ কৃষিজমির ব্যাপক ক্ষতিসাধন হয়েছে ও হচ্ছে। বর্তমান সময়ে সবচেয়ে সঙ্কট দেখা দিয়েছে গোখাদ্যের।
লবণ পানির আধিক্যে ইতোমধ্যে অত্রাঞ্চল থেকে হারিয়ে গেছে অসংখ্য দেশী মাছ। বিভিন্ন সময়ের দুর্যোগের মুখে পয়নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় দূষণে বাড়ছে বিভিন্ন ধরনের রোগ-বালাই।
বাঁধ মেরামতে ইতোমধ্যে সরকার মেগা প্রকল্প হাতে নিলেও ঠিক কবে নাগাদ এর বাস্তবায়ন হবে তা নিয়েও রয়েছে আশঙ্কা। প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে তৃণমূলের সচেতনতা বৃদ্ধিতে ২০১৮ সাল থেকে দুই উপজেলায় স্টোক হোল্ডারদের মাধ্যমে পানিই জীবন প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ডরপ। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের ক্ষয়ক্ষতি রোধ, সহায়তা প্রদান ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে জিও-এনজিও পর্যায়ে কাজের পাশাপাশি প্রয়োজন পরস্পরের সমন্বয় সাধন। এজন্য সংশ্লিষ্টদের নিয়ে দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
এ প্রসঙ্গে উপজেলার দেলুটি ইউপি চেয়ারম্যান রিপন কুমার মণ্ডল বলেন, আমার ইউনিয়নটি একটি দ্বীপবেষ্টিত অঞ্চল। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে প্রতিনিয়ত সেখানে বাড়ছে নানা সঙ্কট। বিশেষ করে পরিবেশ ধ্বংসের পাশাপাশি সেখানকার বৃহৎ সংখ্যক মানুষ কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়ছে। জীবন-জীবিকার তাগিদে অনেকেই প্রতি বছর অন্যত্র চলে যাচ্ছে এক প্রকার বাধ্য হয়ে। এজন্য জিও-এনজিও পর্যায়ে দরকার দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনার। টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, পর্যাপ্ত নিরাপদ পানির উৎস তৈরি ও এর প্লাটফর্ম এবং টয়লেটের প্লাটফর্ম উঁচু এবং উন্নত করা, স্থানীয় সরকার ও সরকারের জলবায়ু মোকাবেলায় অর্থায়ন বাড়ানো, পর্যাপ্ত ড্রেন, কালভার্ট ও সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণসহ কৃষি ক্ষেত্রে লবণসহিষ্ণু বিভিন্ন ফসলের নানা জাত উদ্ভাবন। এজন্য উপকূলীয় উন্নয়ন বোর্ড গঠনেরও পরামর্শ দেন এই জনপ্রতিনিধি।

 


আরো সংবাদ


premium cement