০৮ মে ২০২১
`

বাঘাবাড়ী থেকে রোজ ৫ লাখ লিটার কেরোসিন মেশানো পেট্রল সরবরাহ

-

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপরেশনের (বিপিসি) বাঘাবাড়ী অয়েল ডিপোতে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা তিনটি কোম্পানির বিপণন কেন্দ্র রয়েছে। এই ডিপো থেকে ১৯টি জেলায় প্রতিদিন প্রায় পাঁচ লাখ লিটার নিম্নমানের (বিএসটিআইয়ের মানসম্মত নয়) পেট্রল সরবরাহ করা হচ্ছে। দীর্ঘ দিন ধরে এই অয়েল ডিপোর তিনটি কোম্পানির কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী পরস্পার যোগসাজসে গোপনে পেট্রলের সাথে ৫ থেকে ১০ শতাংশ কেরোসিন মিশিয়ে ভেজাল পেট্রল পাম্প মালিকদের কাছে বিক্রি করে থাকেন। এ খাত থেকে তারা প্রতি মাসে হাতিয়ে নিচ্ছেন বিপুল অঙ্কের টাকা। বিপিসির বগুড়া আঞ্চলিক অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা বিষয়টি জেনেও চোখ-কান বন্ধ করে থাকেন।
বাঘাবাড়ী অয়েল ডিপো সূত্রে জানা যায়, এই ডিপো থেকে পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, রংপুর, নীলফামারী, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, জয়পুরহাট, নওগাঁ, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ ও জামালপুরে জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয়। এই ডিপো থেকে ১৯ জেলায় প্রতিদিন ৩৬ থেকে ৪০ লাখ লিটার জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয়ে থাকে।
বাঘাবাড়ী অয়েল ডিপোর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন বিদেশ থেকে আমদানি করা অপরিশোধিত জ্বালানি তেল কয়েকটি বেসরকারি রিফাইনারিতে পরিশোধনের জন্য দেয়। পরিশোধনের পর রিফাইনারিগুলো অকটেন, পেট্রল, ডিজেল ও কেরোসিন বিপিসির ডিপোগুলোতে সরবরাহ করে। গাজীপুরের বেসরকারি অ্যাকুয়া রিফাইনারি লিমিটেড অপরিশোধিত জ্বালানি তেল সঠিক মাত্রায় পরিশোধন করে বাঘাবাড়ী ডিপোর তিনটি কোম্পানিতে প্রতি মাসে ৬৫ ট্যাংকলরি (প্রতিটি ট্যাংকলরির ধারণক্ষমতা সাড়ে ১৩ হাজার লিটার) পেট্রল ও কেরোসিন সরবরাহ করে আসছে। এর মধ্যে ৪০ লরি (পাঁচ লাখ ৪০ হাজার লিটার) পেট্রল এবং ২৫ লরি (তিন লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ লিটার) কেরোসিন। এ ছাড়া চট্টগ্রাম ও সিলেট থেকে জ্বালানি তেল কার্গোভ্যাসেল ও ট্যাংকলরিতে করে বাঘাবাড়ী ডিপোতে আসে।
সূত্র জানায়, বাঘাবাড়ী ডিপোতে ট্যাংকলরি পৌঁছার পর তিনটি কোম্পানির ইনচার্জের মৌখিক নির্দেশে আনলোডের দায়িত্বে থাকা কর্মচারীরা পেট্রলের ট্যাংকারে পেট্রলের সাথে ৫ থেকে ১০ শতাংশ কেরোসিন আনলোড করেন। পেট্রল ও কেরোসিন দেখতে হুবহু এক রকম হওয়ায় কেরোসিন মেশালে বোঝার উপায় নেই এই পেট্রল ভেজাল। শুধু তাই নয়, চট্টগ্রাম থেকে কার্গোভ্যাসেলে যে জ্বালানি তেল আসে সেখান থেকে ওই আনুপাতিক হারে কেরোসিন পেট্রলের ট্যাংকারে মেশানো হয়।
ডিপো থেকে প্রতিদিন গড়ে দুই লাখ লিটার কেরোসিন ও পাঁচ লাখ লিটার পেট্রল সরবরাহ করা হচ্ছে। অথচ ১৯ জেলায় কেরোসিনের তেমন চাহিদা নেই বললেই চলে। ডিপোতে প্রতি লিটার পেট্রল ৮১.৫৬ টাকা ও কেরোসিন ৬৩.৫৬ টাকা দরে বিক্রি করা হয়। পেট্রলে কেরোসিন মিশিয়ে সংশ্লিষ্টরা প্রতি লিটারে ১৮ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
সূত্র জানায়, বিএসটিআই রাজশাহী অফিসের কর্মকর্তারা প্রতি বছর বাঘাবাড়ী ডিপোর পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার মিটার সাড়ে ৯ হাজার লিটার পরিমাপ করে সিলগালা করে দেয়। ডিপোর কোনো মিটারেই সিলগালা নেই, কিছু কিছু থাকলেও তা টেম্পারিং করা। কেরোসিনের ট্যাংক লরিতে পেট্রল সরবরাহ করা হয়। এভাবেই জ্বালানি তেল সরবরাহের হিসাব খাতা-কলমে ঠিক রাখা হয়। সূত্রের দাবি, বিএসটিআই কর্মকর্তারা বাঘাবাড়ী এসে সরেজমিন তদন্ত করলে সিলগালা টেম্পারিং এবং বেসরকারি অ্যাকুয়া রিফাইনারি লিমিটেড থেকে আসা ট্যাংকলরির পেট্রল ও ডিপোর ট্যাংকারের পেট্রল পরীক্ষা করলেই ডিপোতে ভেজাল কারসাজি ধরা পড়বে। এই ভেজাল পেট্রল ব্যবহার করায় যানবাহনের ইঞ্জিনসহ মূল্যবান যন্ত্রপাতির ব্যাপক ক্ষতি হয় ও ইঞ্জিনের আয়ুষ্কাল কমে যাচ্ছে। কয়েকজন পাম্প মালিক ডিপো থেকে নিম্নমানের পেট্রল সরবরাহের কথা জানিয়েছেন। তবে তেল সরবরাহ পেতে হয়রানির শিকার হতে হবে বলে তারা এর প্রতিবাদ করার সাহস পান না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাঘাবাড়ী ডিপোতে অনলোডের দায়িত্বে থাকা দু’জন কর্মচারী জানান, ডিপো ইনচার্জদের মৌখিক নির্দেশেই তারা পেট্রলের সাথে কেরোশিন মিশিয়ে থাকেন। তাদের নির্দেশ না মানলে হয় বদলি অথবা হয়রানির শিকার হতে হয়। সে জন্য বাধ্য হয়ে তারা এই কাজ করছে।
বাঘাবাড়ী অয়েল ডিপোর মেঘনা কোম্পানির ম্যানেজার মহবুবুর বহমান পেট্রলের সাথে কেরোসিন মিশ্রণের কথা অস্বীকার করে বলেন, বিএসটিআইর প্রতি বছর ট্যাংকলরি ক্যালিবারেশন করার কথা থাকলেও তা তারা করছে না। অনেক ট্রাংকলরির ক্যালিবারেশন নেই। এতে দেখা যাচ্ছে কোনো কোনো ট্যাংকলরি ৫-১০ বছর আগের ক্যালিবারেশন চার্ট দেখিয়ে তেল সরবরাহ নিচ্ছে। এতে ওই সব ট্যাংকলরির কোনো কোনেটিকে ১০০ লিটার পর্যন্ত জ্বালানি তেল বেশি দিতে হচ্ছে। সিলগালা ট্যাম্পারিংয়ের বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান এবং যমুনার ডিপো ইনচার্জের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন।
যমুনা অয়েল কোম্পানির সহকারী ম্যানেজার ফরিদুল ইসলাম জানান, পেট্রলের সাথে কেরোসিন মেশানোর কোনো সুযোগ নেই। কোনো সময় মেশিন নষ্ট হলে বিএসটিআইর সীলগালা খুলতে হয়। ট্যাংকলরিগুলোর ক্যালিবারেশন চার্ট অনুয়ায়ী জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয়।
কবে মেশিন নষ্ট হলে বিএসটিআরের সিলগালা খোলার এ দাবি সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন বিএসটিআই রাজশাহী অফিস। এ অফিসের সহকারী পরিচালক আব্দুল মুন্নাফ জানান, মেশিন নষ্ট হলে তেল ডিপোর কর্মকর্তাদের সিল ভাঙার কোনো এখতিয়ার নেই। কোনো সমস্যা হলে তা জানানোর পর বিএসটিআইর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার উপস্থিতিতে সিল ভাঙা হবে। আবার কাজ হওয়ার পর সেই কর্মকর্তা সিলগালা করবেন এটাই বিধান বলে তিনি দাবি করেন। টেম্পারিং বা সিলগালা না থাকার বিষয়ে তিনি আরো জানান, তাদের অভিযানে যেতে হলে পরিচালকের অনুমতির প্রয়োজন হয়। অনুমতি নিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তারা এ বিষয়ে অভিযানে নামবেন।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের বগুড়া আঞ্চলিক কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মোহম্মদ জসিম উদ্দিনের কাছে পেট্রলে কেরোসিন মিশানোর ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এ পর্যন্ত কেউ অভিযোগ করেনি। আপনার কাছ থেকে জানার পর খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।



আরো সংবাদ