১২ এপ্রিল ২০২১
`

ঝিনাইদহে লক্ষাধিক নলকূপ পানিশূন্য

-

ঝিনাইদহ জেলার লক্ষাধিক নলকূপ মাসের পর মাস পানিশূন্য অবস্থায় রয়েছে। পানির জন্যে চলছে হাহাকার। হুমকির মুখে পড়েছে ঝিনাইদহের জনস্বাস্থ্য। মাঠ-ঘাট, বিল-ঝিল, জলাশয়, পুকুর-নদী কোথাও নেই পানি। পানি নেই নলকূপেও। জেলার ভেতর দিয়ে নবগঙ্গা, কুমার, বেগবতি, চিত্রা, কপোতাক্ষ, গড়াইসহ বেশকিছু নদনদী প্রবাহিত। তবে একমাত্র গড়াই বাদে সবই এখন মৃত, হচ্ছে ফসলের চাষ।
স্থানীয়রা বলছে, গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রত্যেক শুষ্ক মৌসুমে তাদের সেচ খালগুলোতে পানি দিয়ে থাকে; কিন্তু এবারে কোনো ধরনের পানি ছাড়েনি প্রকল্প থেকে। সেচ খালে পানি প্রবাহ থাকলে নলকুপগুলোতেও পানির স্বাভাবিকতা কিছুটা থাকে।
জানা যায়, জেলার ছয়টি উপজেলায় লক্ষাধিক নলকূপে এ অবস্থা। এর মধ্যে জেলার শুধুমাত্র শৈলকুপা উপজেলাতেই ৩০ হাজার নলকূপ পানির অভাবে অকেজো হয়ে গেছে। এ ছাড়া সদর, কালীগঞ্জ, মহেশপুরসহ বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে কোনো নলকূপেই পানি উঠছে না। গত কয়েক মাস ধরে এ অবস্থা বিরাজ করছে। কিছু কিছু জায়গাতে পানি মিললেও চলতি মাসের শুরুতে একেবারেই পানিশূন্য সব নলকূপ।
পানির প্রাকৃতিক উৎসগুলো ক্রমেই পানি শূন্য আর গরমের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় ধীরে ধীরে সব নলকূপই এমন অবস্থায় দাঁড়িয়েছে। এ অঞ্চলে গত ৬ মাসের বেশি সময় ধরে বৃষ্টিও নেই। ফলে ক্রমেই অবস্থার অবনতি হচ্ছে।
সুপেয় পানির তীব্র সঙ্কটে এক দিকে রান্না ও গৃহস্থালি কাজে যেমন সমস্যা হচ্ছে, তেমন গরু-ছাগল বা গৃহপালিত পশু-পাখির জন্যও পাচ্ছে না পানি। এমন অবস্থায় হুমকির মুখে পড়েছে জনস্বাস্থ্য।
তবে জনস্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছে, ব্যাক্তি উদ্যোগে যারা বাড়িতে নলকূপ বসিয়েছে তারা জনস্বাস্থ্য অধিদফতরের ইঞ্জিনিয়রের পরামর্শ নিয়ে নলকূপ স্থাপন করলে শুষ্ক মৌসুমে পানির সঙ্কট থেকে অনেকটাই মুক্তি পাবে। ডিজাইন অনুসারে টিউবওয়েল না বসালে প্রত্যেক শুষ্ক মৌসুমে এটি ঘটতেই থাকবে।
শুধু শৈলকুপাতেই রয়েছে ৩৭ হাজার ৫০০ নলকূপ। যার ভেতরে এই মুহূর্তে ৩০ হাজার নলকূপ পানির অভাবে অকেজো। এতে দুই লক্ষাধিক মানুষ পরেছে চরম বিপাকে। জনস্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় এমন সঙ্কট দেখা দিয়েছে। মনোহরপুর গ্রামের গৃহবধূ সাগরী বলেন, গত কয়েক মাস ধরেই তাদের নলকূপে কোনো পানি নেই। পানি নেই স্কুল-কলেজ, বিদ্যালয় ও হাসপাতালের নলকূপেও। হাট-বাজার, মাঠ-ঘাটের সব জায়গাতেই একই অবস্থা বিরাজ করছে।
এমন পরিস্থিতিতে অনেক সামর্থ্যবান মানুষ মাঠখুঁড়ে তাদের নলকূপের নিচে ২০-২৫ হাজার টাকা খরচ করে ইঞ্জিনচালিত জলমোটর বা সাবমার্সেল পাম্প বা এ জাতীয় মোটর স্থাপন করে নলকূপের পানি সচল রাখছে।
টিউবয়েল ব্যবসায়ী মনিনুর রহমান জানান, তাদের ঘরের শ্রমিকরা গ্রামাঞ্চলে নলকূপ বসিয়ে থাকে। সাধারণত ২০ থেকে ২৪ ফুট মাটির নিচে পানির লেয়ার বা স্তর পাওয়া যায় কিন্তু এখন নলকূপ স্থাপন করতে গিয়ে ৩২ থেকে ৪০ ফুট নিচে পানির লেয়ার মিলছে। তবুও পর্যাপ্ত পানি উঠছে না।
কৃষিকাজে পরিকল্পিত সেচ কার্যক্রম চালানোর উপর গুরুত্ব দিচ্ছে সচেতন মহলের অনেকেই। মাঠে সেচকাজে ব্যাপকহারে সেচপাম্প বসিয়ে ভূগর্ভস্থ পনির অতিরিক্ত ব্যবহার করায় সঙ্কট বাড়ছে বলে অনেকে মনে করছে। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনে পানির স্তর উদ্বেগজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে বলে মতামত তাদের।
সুপেয় পনির সঙ্কটে জনস্বাস্থ্য প্রসঙ্গে শৈলকুপা হাসপাতালের ডাক্তার রাশেদ আল মামুন জানান, বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার না করতে পারলে নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে যায়। বিশেষ করে শিশুরা ডাইরিয়া, আমাশয়, পেটেরপীড়াসহ নানা অসুখে পড়ে।
জনস্বাস্থ্য অধিদফতর ঝিনাইদহের নির্বাহী প্রকৌশলী আমিনুল ইসলাম জানান, জেলায় ৩২ হাজার সরকারি নলকূপ আছে। এসব নলকূপে পানির স্বাভাবিক অবস্থা রয়েছে। তিনি জানান, বিভিন্ন ফোরামে বা সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলে তারা জানিয়েছেন যাতে ডিজাইনমাফিক নলকূপ স্থাপনের আইন পাস হয়। প্রকৌশলীদের পরামর্শ নিয়ে নলকূপ স্থাপন করলে শুষ্ক মৌসুমে পানির সঙ্কট কমবে বলে তিনি পরামর্শ দেন।



আরো সংবাদ