০৯ মার্চ ২০২১
`

পাবনার ১৬ নদী এখন মৎস্য খামার, চলছে আবাদ

-

পাবনা জেলার ২০ নদীর মধ্যে ১৬টি এখন মাছের খামার ও ফসলি জমিতে পরিণত হয়েছে। চারটি নদী নাব্যতা সঙ্কটে ভুগছে। পাবনার নদ-নদীগুলোর প্রায় ৫০০ কিলোমিটার নৌপথ পলি পড়ে ভরাট হয়ে নৌচলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। নদীর ওপর নির্ভরশীল ৩৫ হাজার মাঝিমাল্লা ও জেলে বেকার হয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে খুব কষ্টে জীবন কাটাচ্ছেন। অনেকেই বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন।
নদ-নদীর এম দুরবস্থার কারণে পণ্য আমদানি রফতানি সড়কপথ নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এতে করে পণ্য পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে হতাশা। ১৬টি নদী মৎস্য খামার ও ফসলি জমিতে পরিণত হয়েছে। চারটি নদী নাব্যতা সঙ্কটে ভুগছে। ফলে জেলার ৬২৮ কিলোমিটার নৌপথের মধ্যে ৫০০ কিলোমিটার নৌপথ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কোনো রকমে টিকে আছে মাত্র ১২৮ কিলোমিটার নৌপথ। জেলার নৌরুটগুলোর বেশির ভাগ অংশ দখল, দূষণ ও পলি জমে ভরাট হয়ে যাচ্ছে।
জানা যায়, ১৯৬০ এর দশকে পাবনা জেলার বিভিন্ন নৌরুটে লঞ্চ ও নৌকা চলাচল করত। এখন জেলার নদীপথ বছরব্যাপী সচল থাকে না। নাব্যতা ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন সম্পর্কে সুচিন্তিত ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। প্রায় দুই যুগ হয়ে গেল কাজীরহাট ঘাটে ফেরি ভিড়ে না। প্রায় সাত কোটি টাকা ব্যয়ে বেড়ায় নৌবন্দর পরিকল্পনা আংশিক বাস্তবায়নের পর পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে।
বর্ষাকালে পাবনার পাট, মাছ, গুড়, গবাদিপশুসহ বিভিন্ন পণ্য এখনো ইঞ্জিনচালিত নৌকা বেড়া ডাকবাংলো ঘাট, নাকালিয়া ও কাজীরহাট ঘাট থেকে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। কিন্তু অভ্যন্তরীণ নদীপথের নাব্যতা রক্ষা ও উন্নয়নে কাজীরহাট ঘাট, বাঘাবাড়ীর ভাটিতে হুড়াসাগর ও যমুনা নদী ছাড়া আর কোথাও ড্রেজিং করা হয় না। অথচ নদীপথে যাতায়াত আগের মতোই এখনো সুলভ। প্রতি লিটার জ্বালানিতে নৌপথে ২১৭ টন মালামাল পরিবাহিত হয় এক কিলোমিটার পথ। অথচ সড়কপথে ডিজেল চালিত ট্রাকে এক লিটার জ্বালানিতে এক টন মালামাল এক কিলোমিটার বহন করা যায়। নিয়মিত নদী ড্রেজিং না করায় নৌপথ কমতে কমতে তলানিতে এসে ঠেকেছে। জেলায় সারা বছর কতটুকু নৌপথ চালু থাকে তারও জরিপ করা হয় না। ১২ মাস পানি থাকা পদ্মা ও যমুনায় বিশাল বিশাল চর জেগে ওঠায় ঝুঁকি নিয়ে চলছে মালবাহী জাহাজ।
বর্ষা মৌসুম শেষে যমুনায় বিশাল বিশাল চর ও বালিয়াড়ি জেগে উঠেছে। এ নদীতে ১২ মাস নৌযান চলাচল করতে পারে। নদীতে নাব্যতা থাকে না বলে স্থানে স্থানে ড্রেজিং করে নৌপথ চালু রাখা হয়। বর্ষা মৌসুমে এ নদী দিয়ে বড় মালবাহী জাহাজ, লঞ্চ ও নৌকা চলাচল করে। কিন্তু বর্ষা শেষে সাত ফুট ড্রাফটের জাহাজ চলাচল করে। নদী ড্রেজিং করতে হয় নিয়মিত। যমুনা নদী দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। ইছামতির ৩০ কিলোমিটার নৌপথ পরিত্যক্ত হয়ে আছে। আগে বেড়া থেকে ভাঙ্গুড়ার বড়াল ব্রিজ পর্যন্ত লঞ্চ সার্ভিস চালু ছিল। সেটি বন্ধ হয়ে গেছে। টিকে আছে কেবল কাজীরহাট-পাটুরিয়া। জেলার বড়াল, গুমানী ও চন্দ্রাবতীতে বর্ষাকালে মালবাহী নৌকা চলাচল করে। কিন্তু অন্যান্য সময়ে নদীতে পানি থাকে না। ভরাট হয়ে গেছে আত্রাই নদী।
পাবনা জেলার দক্ষিণ-পশ্চিম সীমানায় পদ্মা নদীর ৭৫ কিলোমিটার, পূর্ব দিকে যমুনা নদীর ২০ কিলোমিটার, উত্তর দিকে হুড়াসাগর নদের আট কিলোমিটার এবং বড়াল নদীর ২৫ কিলোমিটার নদীপথ কোনো মতে টিকে আছে। সামান্য নৌপথ রয়েছে গুমানী নদীতে। সুতিখালীর পাঁচ কিলোমিটার নৌপথ বন্ধ হয়ে গেছে। রতœাই, আত্রাই, চিকনাই, চন্দ্রাবতী, কাগেশ্বরী, বাদাই ও ইছামতি নদীতে বর্ষাকালে মাছ চাষ হয়। শুষ্ক মৌসুমে বিভিন্ন রকম ফসলের আবাদ হয়ে থাকে। জেলা প্রশাসন এসব নদী ইজারা দিয়ে থাকে। বিলুপ্ত হয়ে গেছে রুকনাই, বারনাই, ট্যাপাগাড়ী, গোহালা, শালিকা, শুঁটকিদহ ও ভাঙ্গুড়ার ইছামতি নদী। ইছামতি নদীতে ৫০ কিলোমিটার নৌপথ ছিল। চিকনাই ৩৮ কিলোমিটার ও আত্রাই ৩০ কিলোমিটার নৌপথ এখন বন্ধ।
বড়াল ও ইছামতি নদীর খাত সাঁথিয়ার বোয়ালমারীর কাছে দ্বিখণ্ডিত হয়ে আত্রাই নামে পূর্ব-দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে পদ্মা নদীতে মিলিত হয়। এক সময় আত্রাই নদীতে প্রচুর ইলিশ মাছ পাওয়া যেত। এখন এ নদীর শত শত হেক্টর জমি অবৈধ দখলে চলে গেছে। জেলায় যাতায়াতের একমাত্র উপায় ছিল নদীপথ। বিশেষ করে বর্ষা ও শরৎকালে। বর্তমানে পানি উন্নয়ন বোর্ড বিভিন্ন স্থানে বাঁধ নির্মাণ করায় নদীপথ বন্ধ হয়ে গেছে। জেলার নৌরুটগুলোর বেশির ভাগ অংশ ক্রমাগত পলি জমে চর পড়ে ভরাট হয়ে যাওয়ায় কৃষিপণ্য আমদানি রফতানিতে ব্যবসায়ীরা হতাশ হয়ে পড়েছেন।
ফরিদপুর, ভাঙ্গুড়া ও চাটমোহর উপজেলা মিলে বড়াল নদী রয়েছে মাত্র ২৫ কিলোমিটার। বসন্ত ও গ্রীষ্মকালে পানি থাকে না। এ নদীর গভীরতা বর্তমানে তিন মিটারে দাঁড়িয়েছে। চার মাসও নৌকা চলে না। গোমানী নদীর নাব্যতা থাকে না পাঁচ ঋতুতে। বাঘাবাড়ীর কাছে বড়াল ও করতোয়ার মিলিত প্রবাহ হুড়াসাগর নদ নামে পূর্ব দিকে এগিয়ে গেছে। বড়াল নদীপথে মিল্কভিটার সদস্যরা দুধ সরবরাহ করে থাকেন। কিন্তু নৌপথ অচল হয়ে পড়ায় তরল দুধ সরবরাহে তাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
পদ্মা নদী পাবনায় প্রায় ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণ সীমান্তজুড়ে প্রবাহিত। এ নদীতে আগে স্টিমার, মালবাহী বড় বড় নৌকা যাতায়াত করত। পানির স্তর কমে যাওয়ায় এ নদীতে লঞ্চ ও বড় বড় নৌকা চলাচল করে না। তিন দশক আগেও নৌপথই সামগ্রিক যোগাযোগব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। সড়কপথের তুলনায় নৌপথই জনপ্রিয় ছিল। পদ্মার শাখা নদী ও বিলের ওপর দিয়ে পণ্যবাহী নৌকা চলাচল করত। এখন কেবল বর্ষাকালে চাটমোহর, ফরিদপুর ও ভাঙ্গুড়া এলাকায় পণ্যবাহী পানসি, কোশা ও ডিঙ্গি নৌকা চলাচল করে। এক সময় ছোট ছোট নৌকায় করে নদীপথে পাট ও তেলবীজ যেত বৃহত্তর পাবনার সিরাজগঞ্জ, বেড়া ও নাকালিয়া বন্দরে। তারপর সেখান থেকে বড় বড় নৌকাবোঝাই হয়ে চালান যেত কলকাতায়। তখন বৃহত্তর পাবনা জেলার বিশাল বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল সিরাজগঞ্জ, বেড়া ও নাকালিয়া বন্দর। সেসব এখন কেবলই স্মৃতি।



আরো সংবাদ