১৯ জানুয়ারি ২০২১
`

চলনবিলে রসুনের ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা

-

পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জের বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ে গঠিত চলনবিলে চলতি রবি মৌসুমে মসলা জাতীয় ফসল রসুন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩২ হাজার ৭৬০ হেক্টর জমিতে। এ লক্ষ্যমাত্রা গত বছরের চেয়ে সাত হাজার হেক্টর বেশি। বর্ষা শেষে বিল-নদী-খাঁড়ি থেকে পানি নেমে যাওয়ার পর চাষিরা বিনাচাষে রসুন বীজ রোপণ করেন। এবার দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় রসুন আবাদ পিছিয়ে গেছে। গত তিন বছর রসুনের দাম ভালো পাওয়ায় এ অঞ্চলে রসুন আবাদ বেড়ে গেছে। এ দিকে পুরোদমে আমন ধান কাটা মাড়াই এবং রসুন রোপণ শুরু হওয়ায় কৃষি শ্রমিকের সঙ্কট দেখা দিয়েছে।
কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এ বছর চলনবিলের পাবনার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, উল্লাপাড়া এবং নাটোরের বড়াইগ্রাম ও গুরুদাসপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কয়েক দফা বন্যায় আমন ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য বিলের পানি নামার সাথে সাথে জেগে ওঠা সমতল ভূমিতে বিনাচাষে কৃষকরা ব্যাপকভাবে রসুন রোপণ করছেন। রসুন আবাদ পিছিয়ে যাওয়ায় চাষিরা ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন।
চলতি রবি মৌসুমে নাটোর ও পাবনা জেলা রসুন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য হয়েছে ৩২ হাজার ৮৬০ হেক্টর জমিতে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে দুই লাখ ৬২ হাজার ৮৮০ টন। গত বছরে রসুনের দাম চার গুণ হয়ে যাওয়ায় এ বছর চলনবিল অঞ্চলের কৃষকরা রসুন আবাদে ব্যাপকভাবে ঝুঁকে পড়েছেন। চলনবিলের মাঠে মাঠে কৃষকেরা স্ত্রী-সন্তানদের সাথে নিয়ে রসুন চাষে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। এ দিকে শ্রমিক সঙ্কটে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দোকানদারসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ নিজেরাই তাদের জমিতে রসুন বীজ রোপণ করছেন।
পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, দেশের উত্তরের চলনবিল অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি রসুন আবাদ হয়। এ অঞ্চলের বড়াইগ্রাম, গুরুদাসপুর, সিংড়া, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর, তাড়াশ ও রায়গঞ্জে রসুন অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসলে পরিণত হয়েছে। বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার পর কৃষকরা বিনা চাষে রসুন আবাদ করেন। এখন রসুনের বীজ রোপণের ভরা মৌসুম চলছে। তবে বিল-নদী-খাঁড়ির পানি বিলম্বে নেমে যাওয়ায় রসুন আবাদ পিছিয়ে গেছে। এতে রসুনের ফলনে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বলে কৃষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
মসলা জাতীয় ফসল রসুন উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত হচ্ছে চলনবিল। এ অঞ্চলের মধ্যে আবার সবচেয়ে বেশি রসুন আবাদ হয় বড়াইগ্রামের বাজিতপুর, মাড়িয়া, ইকড়ি, জালশুকা, তারানগর, শ্রীরামপুর, মানিকপুর, চকপাড়া, রয়না ভরট, মামুদপুর, রয়না, রোলভা, খাকসা, চড়ইকোল, গুরুদাসপুর উপজেলার ধারাবারিষা, কাছিকাটা, হাঁসমারী, দড়ি হাঁসমারী, শিধুলী, চড়কাদহ, মশিন্দা, চাটমোহর উপজেলার ছাইকোলা, কাটেঙ্গা, কোকড়াগাড়ি, ধানকুনিয়া, লাঙ্গলমোড়া, বরদানগর, ধুলাউড়ি, বোয়ালমারি, গৌরনগর, বিন্যাবাড়ি, নিমাইচড়া এলাকায়। চলনবিল অঞ্চলে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর পলিযুক্ত দোআঁশ ও এঁটেল দোআঁশ মাটিতে রসুন রোপণ করা হয়।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৯৫-৯৬ সালে নাটোরের বড়াইগ্রাম ও গুরুদাসপুর উপজেলার সীমান্ত এলাকার গ্রামগুলোর কৃষকেরা স্বউদ্যোগে প্রথম বিনা চাষে রসুন আবাদ শুরু করেন। এই আবাদ বা চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে বড়াইগ্রাম উপজেলার জালশুকা গ্রামের কৃষক খোরশেদ আলম পূর্ণি জানান, সাধারণত কার্তিক অগ্রহায়ণ মাসে চলনবিল অঞ্চলের নরম জমিতে বিনা চাষে রসুনের কোয়া রোপণ করা হয়। এ জন্য প্রচলিত নিয়মে জমি চাষ করার প্রয়োজন পড়ে না। এ পদ্ধতিতে ক্ষেতে আগাছা কম জন্মে। সার প্রযোগ করতে হয় কম। রোপণ থেকে উৎপাদন পর্যন্ত ১২০ দিনের এই উৎপাদন খরচ পুরনো পদ্ধতির রসুন আবাদের চেয়ে অনেক কম। বিনা চাষ পদ্ধতিতে রসুনের ফলন বেশি হয়। প্রতি বিঘা জমিতে রসুনের ফলন হয় ২৫ থেকে ৩০ মণ। সাধারণত চৈত্র মাসে জমি থেকে রসুন তুলে আনা হয়।
পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালাক আবদুল কাদের জানান, দোআঁশ ও এঁটেল দোআঁশ মাটি রসুন চাষের জন্য বেশি উপযোগী। এ কারণেই নাটোর জেলায় বিশেষ করে বড়াইগ্রাম ও গুরুদাসপুর উপজেলায় সর্বাধিক জমিতে রসুন চাষ হয়। প্রতি বিঘা জমিতে ৩০ কেজি টিএসপি, ২৫ কেজি পটাশ ও ১৫ কেজি জিপসাম ছিটানোর দুই-এক দিনের মধ্যে নরম জমিতে সারিবদ্ধভাবে রসুন বীজ রোপণ করতে হয়। রোপণের জন্য প্রতি বিঘা জমিতে দুই মণ রসুনের প্রয়োজন হয়। জমিতে রসুন রোপণের দিনই খড় বা বিচালী দিয়ে জমি ঢেকে দিতে হয়। বীজ রোপণের এক মাস পরে পানি সেচ দিয়ে বিঘায় ১০ কেজি হারে ইউরিয়া ও পাঁচ কেজি হারে এমওপি ছিটিয়ে দিলে ফলন ভালো হয়।

 



আরো সংবাদ