২৬ নভেম্বর ২০২০

অপরিকল্পিত নদী খননে ভাঙছে বসতভিটা ও ফসলি জমি

-

টাঙ্গাইলের নাগরপুরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিরুদ্ধে অপরিকল্পিতভাবে ধলেশ^রী শাখার নোয়াই নদী খননের অভিযোগ উঠেছে। গেল বন্যার পর পানি নেমে যাওয়ার পরপরই দেবে গেছে বাড়ির আঙিনা, ঝুলন্ত অবস্থায় আছে কাঁচাপাকা বসতবাড়ি। নদীর পাড় ভেঙে শতাধিক গাছপালাসহ ফসলি জমি চলে গেছে নদীতে। শতাধিক পরিবারের চোখে মুখে হতাশা। উপজেলা সদর, গয়হাটা, সহবতপুর ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রামের শতাধিক বিক্ষুব্ধ মানুষ নদীভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন। তা না হলে যাতায়াতের রাস্তা, মাদরাসা, বসতভিটা, ফসলি জমি নদীতে বিলীনের আশঙ্কা করছেন তারা। প্রকল্পের উদ্দেশ্যানুযায়ী বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অবকাঠামো, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, কৃষি-অকৃষি জমি, ফসলাদি, জনসাধারণের ঘরবাড়ি প্রভৃতি রক্ষা পাওয়ার কথা থাকলেও কোনোটিই রক্ষা পাচ্ছে না; বরং ওই প্রকল্প অপরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়ন করায় অনেকেই বসতভিটা-ফসলি জমি হারাতে বসেছেন। তাদের আহাজারি যেন শেষ হচ্ছে না।
টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ধলেশ^রীর হাজীর ব্রিজ বিলের পাড়ের পয়েন্ট থেকে শাখা নদীর পয়েন্ট বাবুপুর লাউহাটি পর্যন্ত ১৩.৭৫ কিলোমিটার নদী খননের কাজ শুরু হয়েছিল। দুই কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয়ে এ খনন কাজ করেছে ফরিদপুরের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স খন্দকার শাহীন আহম্মেদ।
গত কয়েক দিন সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, গেল বন্যার আগে ধলেশ^রী নদীর চ্যানেল থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার নদী ৫-৬টি ভেকু দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় খনন শুরু করে ওই ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। ওই নদী এলাকা থেকে মাটি খনন করে নদীতে পানিপ্রবাহের জন্য চ্যানেল তৈরি করা হয়েছে। এটি দিয়ে মূল নদীর সাথে পানি প্রবাহের সংযোগ দেয়া হয়েছে। কাজ শুরু হওয়ায় নদী পাড়ের মানুষ খুশি হলেও অপরিকল্পিতভাবে নদী খননে তাদের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে। তাদের অভিযোগ, এভাবে খননে নদীপাড়ের মানুষরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সেটা তাদের বোঝা উচিত ছিল। সরকারি নির্দেশ মোতাবেক বাধা দিলে বিভিন্ন মামলার ভয়ে তখন কেউ মুখ খুলতে পারেননি। কিন্তু এখন মাথা গোঁজার ভিটেবাড়িও চলে যাচ্ছে। ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বিশেষভাবে জোর দাবি এলাকাবাসী ও নদী পাড়ের মানুষের।
গয়হাটা ইউনিয়নের ঘিওরকোলের দিনমজুর জসিম উদ্দিন বলেন, নদী খননে উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হয়েছে। ২৫ বছর ধরে তিল তিল গড়ে তোলা ২২ শতাংশ জমিতে পরিবার নিয়ে বসবাস করছি। নদী খননের পর বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথে প্রায় ১২ শতাংশ বসতবাড়ির ভিটা নদীতে চলে যাচ্ছে। ঝুলন্ত অবস্থায় ঘরটি টাকার অভাবে সরাতেও পারছি না। বাকিটুকুতেও ফাটল ধরেছে।
একই এলাকার রেফাজ উদ্দিন বলেন, সরকারি কলেজের চাকরির অবসরের টাকা দিয়ে পাকা করে ঘর করেছিলাম বাকি জীবন দুই ছেলে সন্তান নিয়ে একটু সুখে দিন কাটাবো বলে। সুখ তো দূরের কথা, মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু থাকবে কি না, জানি না। অপরিকল্পিত নদী খননে এবারের বন্যার পর প্রায় ১০ শতাংশ জমি নদীতে বিলীন হয়ে শখের পাকা ঘরে ভাঙন হানা দিয়েছে।
খনন এলাকায় কথা বলার সময় এগিয়ে আসেন কৃষক শওকত আলী। শতাংশ প্রতি দুই লাখ টাকা করে জমি কিনে বসবাস করছেন কয়েক যুগ ধরে। অপরিকল্পিত নদী খননে তার গাছপালাসহ প্রায় ৭ শতাংশ জমি নদীতে বিলীন হয়ে তিনি প্রায় ১৫ লাখ টাকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
নাগরপুর সদর ইউনিয়নের দুয়াজানি গ্রামের আবদুল জব্বার আলী (বিআইডব্লিউটিসির অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী) অভিযোগ করে বলেন, অপরিকল্পিত নদী খননে ক্ষতিগ্রস্ত তিনি নিজেও এবং এ গ্রামের অর্ধশতাধিক পরিবার ভাঙনের হুমকির মুখে রয়েছেন। সচেতনমহল বাধা দিলেও কাজ হয়নি। বরং আরো বেশি করে খনন করেছে। ভাঙন রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন ওই ব্যক্তি।
গয়হাটা ঘিওরকোলের মহিলা ইউপি সদস্য শিরিন আক্তার বলেন, অপরিকল্পিত নদী খননে অত্র ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক বসতবাড়ি ভাঙন হুমকির মুখে এবং প্রায় ১০০ শতাংশ ফসলি জমি গাছপালাসহ নদীতে বিলীন হয়েছে। এলাকাবাসীর পক্ষে তিনিও সরকারের কাছে ভাঙন রোধে স্থায়ী সমাধানে জোর দাবি জানান।
উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান হুমায়ূন কবীর নয়া দিগন্তকে বলেন, এ বছর বন্যায় যে ক্ষতি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। উপজেলায় ২৪৮টি গ্রামের মধ্যে পাইকশা-মাইঝাইলসহ বেশ কয়েকটি পুরো গ্রাম নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। সংসদ সদস্য আহসানুল ইসলাম টিটুর নির্দেশে উপজেলা প্রশাসন সর্বদাই সার্বিক সহযোগিতায় তাদের পাশে আছেন।
টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলামের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করে তাকে না পাওয়ায় ওই প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা রবিউল আওয়াল নয়া দিগন্তকে জানান, নদীভাঙনের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবর গুরুত্বসহকারে জানানো হয়েছে। বরাদ্দ পেলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান তিনি।

 


আরো সংবাদ