০২ ডিসেম্বর ২০২০

চলনবিলে শামুক ঝিনুক নিধন হুমকিতে জীববৈচিত্র্য

-

পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও নাটোর জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে নিয়ে গঠিত চলনবিল। চলনবিলের নদী, বিল ও খাড়ির জলাভূমিতে প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেয়া শামুক ও ঝিনুক জীবিকা অর্জনের অন্যতম অবলম্বন হয়ে উঠেছে এ অঞ্চলের নিম্নবিত্ত হাজারও মানুষের। বর্ষা মৌসুমে কর্মহীন সময়ে শামুক-ঝিনুক কুড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করে তারা। এসব শামুক-ঝিনুক ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের মাছের ঘেরে চলে যাচ্ছে। বিশেষ করে সেখানে চাষ করা চিংড়ির খাবার হিসেবে এগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বিচারের শামুক-ঝিনুক নিধনের ফলে পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট হচ্ছে। কমে যাচ্ছে মাটির উর্বরা শক্তি। শামুক-ঝিনুক মরে গিয়ে তার মাংস ও খোলস পচে জমির মাটিতে প্রাকৃতিকভাবে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও পটাশিয়াম তৈরি করে। এতে জমির উর্বরতা বৃদ্ধিসহ ধানগাছের শিকড় মজবুত ও ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি করে।
শামুক ঝিনুক সংগ্রহের স্থান : চলনবিলের ১৬টি নদী, ৩৯টি বিল ও ২২টি খাড়িসহ বিস্তীর্ণ জলাভূমি থেকে প্রতিদিন প্রায় ২০০ টন শামুক-ঝিনুক সংগ্রহ করা হচ্ছে। শামুক-ঝিনুক বেচাকেনার জন্য চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, তাড়াশ, সিংড়া উপজেলায় ৫০টির বেশি আড়ত গড়ে উঠেছে। সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে আড়তদাররা প্রতি বস্তা শামুক-ঝিনুক ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা দরে কিনে ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করছেন। ব্যবসায়ীরা এসব শামুক-ঝিনুক কিনে ট্রাকে করে বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরাসহ দক্ষিণাঞ্চলের মাছের ঘেরের মালিকদের কাছে প্রতি বস্তা ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা দরে বিক্রি করছে। চিংড়িসহ চাষ করা অন্য মাছ দ্রুত বৃদ্ধিতে কম খরচে খাদ্য হিসেবে শামুক-ঝিনুকের বিকল্প নেই। তাই এর চাহিদা বেশি। এ কারণে এই অঞ্চলের ঘেরের মালিক ও ব্যবসায়ীরা আড়তদারদের কাছ থেকে শামুক ঝিনুক কিনছেন।
শামুক ঝিনুকের বাজার : চলনবিলের নদী, বিল ও খাড়ির পাড়ে গড়ে উঠেছে শামুক ঝিনুক বিক্রির অস্থায়ী বাজার। ফড়িয়ারা শামুক ঝিনুক কিনে আড়তে বিক্রি করছে। সেখান থেকে ঘেরের মালিক ও ব্যবসায়ীরা শামুক ঝিনুক কিনছেন। পরে ট্রাকে করে বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরাসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এ অঞ্চলের চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, উল্লাপাড়া, তাড়াশ ও সিংড়ায় প্রায় ৫০টির মতো শামুক ঝিনুক কেনাবেচার আড়ত রয়েছে। প্রধান কয়েকটি আড়ত হলো দীঘিবাজার, মহিষলুটি, ১০ নম্বর ব্রিজ এলাকা, হান্ডিয়াল, সাগুড়া, বিয়াস বাজার, নিমাইচড়া বাজারসহ ৫০টি এলাকায় পাইকারি শামুক-ঝিনুক বেচাকেনা চলে। সরেজমিন মহিষলুটি, ১০ নম্বর ব্রিজ এলাকা ও বিয়াস বাজার গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার পাশে রাখা হয়েছে শতাধিক বস্তা শামুক। অনেক গরিব মানুষ বর্ষার দিনে কাজ না থাকায় শামুক ধরে বিক্রি করে। আয়াশ গ্রামের মহাজন ছালাম মিয়া বলেন, বিভিন্ন ফড়িয়ার কাছ থেকে বস্তা হিসেবে শামুক ঝিনুক কিনে থাকি। আজ ৬০ হাজার টাকার শামুক কিনেছি। এখন ট্রাকে করে এই শামুক খুলনা পাঠাব। শামুকের ব্যবসা কাঁচামালের মতো, প্রতিদিন অবস্থার পরিবর্তন হয়।
তিনি বলেন, খুলনার বটতলা, রায়েরমহল, চিতলমারী, গুদারা ও আলমঘাটা এলাকায় নিয়ে গিয়ে এ শামুক ঝিনুক বিক্রি করি। দক্ষিণাঞ্চলের লোনা পানিতে শামুক হয় না। তাই আমাদের এই অঞ্চলের শামুকের বেশ চাহিদা রয়েছে। এই শামুক ভেঙে ভেতরের অংশ বিভিন্ন খামারে মাছের খাবার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। যে খোলসাগুলো থাকে তাও বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়। অনেকে বর্ষার দিনে শামুক ধরে সংসার চালায়।
পরিবেশের ওপর প্রতিক্রিয়া : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, চলনবিল অঞ্চলের জলাভূমির শামুক ঝিনুক অনেক কিছুরই খাবার। ব্যাপক হারে শামুক নিধন জলাভূমির খাদ্যশৃঙ্খলাও নষ্ট করে। যে শামুকগুলো বর্ষার শেষে মাটিতে বসে তা সেখানেই পচে সার হয়। জমিতে বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্যের জোগান দেয়। তিনি আরো বলেন, এ অঞ্চলে যেসব শামুক ধরা হয়, তা মূলত অ্যাপেল স্নেইল (আপেল শামুক) গোত্রের। এই শামুক ধরে নিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের মাছের ঘেরের যে চিংড়িকে খাওয়ানো হচ্ছে সেগুলো আমাদের দেশের মানুষ পাচ্ছে না। প্রতিদিন চলনবিল থেকে প্রায় ২০০ টন শামুক ধরা হচ্ছে। নিবিচারে শামুক নিধনের ফলে মাটির উর্বরতা ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
পাবনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) শামসুল আলম বলেন, যেকোনো মৃতজীবের অবশিষ্ট অংশ পচে-গলে জৈব সার হয়। তেমনি এ অঞ্চলের শামুক শুকনো মৌসুমে মাটির সাথে মিশে যায়, যা মাটির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধি করতে সহায়তা করে। আবার ফসলের জমিতে অতিরিক্ত শামুক হলেও তা ফসলের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। আমাদের এই শামুক প্রাকৃতিক সম্পদ। আমার জানা মতে, এ অঞ্চল থেকে নিয়ে যাওয়া শামুকের ভেতরের অংশ মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। খোলস ব্যবহার হয় চুন ও সার তৈরিতে। তবে নির্বিচারে শামুক নিধন এই অঞ্চলের জমির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধি ও খাদ্যশৃঙ্খলার জন্য ক্ষতিকর। এটি নিঃসন্দেহে এ অঞ্চলের জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে তিনি জানান।


আরো সংবাদ