২৬ অক্টোবর ২০২০

সুনামগঞ্জে টানা বর্ষণে অচল জীবনযাত্রা

আমনচাষিদের সর্বনাশ
লাগাতার বর্ষণে জীবনযাত্রা স্থবির সুনামগঞ্জবাসীর। ছবিটি সুনামগঞ্জ-বিশ্বম্ভরপুর-তাহিরপুর সড়ক থেকে তোলা : নয়া দিগন্ত -

গত কয়েক দিনের অবিরাম বর্ষণ আর ভারতের চেরাপুঞ্জি থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জে চতুর্থবারের মতো হাওর ও সুরমা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায় সুরমা নদীর পানি বাড়লেও বন্যার আশঙ্কা আপাতত নেই। পানি বৃদ্ধির ফলে আমন ক্ষেত পানিতে তলিয়ে আছে। এ ছাড়া জামালগঞ্জ, বিশ্বম্ভরপুর ও তাহিরপুর উপজেলার সাথে জেলা সদরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মো: সফর উদ্দিন জানান, টানা বৃষ্টিতে জেলার প্রায় দুই হাজার হেক্টরের বেশি জমির আমন ধান তলিয়ে গেছে।
এ দিকে বন্যার কারণে বর্ষার শেষ সময়ের বৃষ্টিতে বেশির ভাগ আমন জমি আবার পানিতে ডুবে গেছে। প্রায় সপ্তাহ খানেক লাগাতার বৃষ্টি থাকায় রোপা আমন ধানের ক্ষেত পচে যাচ্ছে। কয়েক হাজার আমন চাষি বিপাকে পড়েছেন। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ ৬০ হেক্টর আমন জমি ডুবেছে দাবি করলেও আমন চাষিরা বলেছেন, ডুবে যাওয়া জমির পরিমাণের চেয়ে বহু বেশি।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, পরপর তিন বন্যার কারণে এ বছর প্রায় এক মাস বিলম্ব হয়েছে আমন আবাদের। গত ১৫ সেপ্টেম্বর বিলম্বিত সময় শেষ হয়েছে। ওই সময় পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ৮১ হাজার ৩৯৫ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ হয়েছে। প্রথম বন্যায় সরকারি হিসেবে ৫৯ হেক্টর জমির বীজতলা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে এরচেয়ে দ্বিগুণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে আরো দুই বন্যায় বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বন্যার কারণে প্রায় এক মাস নিমজ্জিত ছিল আমন ক্ষেত। ফলে যথাসময়ে ধান লাগাতে না পারায় বিলম্ব হয় আমন চাষ। কোনোমতে টানা বৃষ্টির মধ্যে আমনচাষ শেষ করতে পারলেও রুদ্র প্রকৃতির কারণে স্বস্তিতে ছিলেন না চাষিরা। এর মধ্যে প্রায় প্রতিদিনই গুঁড়ি গুঁড়ি ও ভারী বৃষ্টি হচ্ছিল। তবে গত ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর তিন দিন টানা ভারী বৃষ্টিপাতে পানি বৃদ্ধি পায়। এতে বিভিন্ন উপজেলায় সদ্য রোপণ করা আমনক্ষেত ডুবে যায়। কাঁচা ধান ডুবে যাওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়েন কৃষক। সরকারি হিসেবে ওই সময়ে ৬০ হেক্টর জমির আমন ধান নিমজ্জিত হয়েছে বলা হলেও কৃষকরা জানিয়েছেন নিমজ্জিত ক্ষেতের পরিমাণ প্রায় হাজার হেক্টর হবে। ওই সব জমি সদ্য রোপণ করার সাথে সাথে পানিতে নিমজ্জিত হয়ে ক্ষতি হয়েছে। তা ছাড়া ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা প্রখর রোদের কারণে নিমজ্জিত ওই সব ক্ষেত দ্রুত ভেসে গিয়ে শুকিয়ে মাটির সাথে মিশে গেছে ধানের চারা। যার ফলে ক্ষতির পরিমাণ বেড়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের দায়িত্বশীলরা বলেছেন, জেলার ১১ উপজেলায়ই এবার আমনের চাষাবাদ হয়েছে। সুনামগঞ্জ সদরে চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ হাজার ৬০০ হেক্টর, দোয়ারাবাজারে ১৪ হাজার ৫৬০ হেক্টর, বিশ^ম্ভরপুরে আট হাজার ৭০০ হেক্টর, জগন্নাথপুরে ৯ হাজার ৪৫৮ হেক্টর, জামালগঞ্জে তিন হাজার ৯৫০ হেক্টর, তাহিরপুরে ছয় হাজার ১০০ হেক্টর, ধর্মপাশায় ৫৩৪ হেক্টর, ছাতকে ১৩ হাজার ১০০ হেক্টর, দিরাইয়ে দুই হাজার ৭১৫ হেক্টর ও শাল্লায় চার হাজার ৭০ হেক্টর। সব মিলিয়ে চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮১ হাজার ৩৮৭ হেক্টর। কৃষি বিভাগের দাবি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৮ হেক্টর বেশি জমিতে চাষাবাদ হয়েছে অর্থাৎ ৮১ হাজার ৩৯৫ হেক্টর আমন চাষাবাদ হয়েছে। কিন্তু গত কয়েক দিনের লাগাতার বৃষ্টিপাতে আবারো শঙ্কার মধ্যে পড়েছেন আমন চাষিরা।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক সফর উদ্দিন বলেন, তিনবার বন্যার কারণে চলতি সুনামগঞ্জে আমন চাষ প্রায় এক মাস পিছিয়ে গেছে। এই কারণে এই বছর ফলন কিছুটা কমবে। সাপ্তাহব্যাপী টানা বৃষ্টির কারণে এখন কিছু জমি নিমজ্জিত হয়েছে। এতে কৃষকের কিছুটা ক্ষতি হবে।
সুনামগঞ্জ পাউবো নির্বাহী প্রকৌশলী সাবিবুর রহমান জানান, সুরমা নদীর সুনামগঞ্জ শহরের পাশের ষোলঘর অংশে পানি সাধারণ বিপদসীমার ৮ সেন্টিমিটার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে।
এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ জানান, বন্যার পানি বাড়তে থাকায় জেলার ১১টি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তাকে নিয়ে জরুরি সভা করা হয়েছে এবং ত্রাণসামগ্রী মজুদ রাখা হয়েছে। যেসব এলাকা প্লাবিত হবে তাৎক্ষণিক সেখানকার বন্যার্তদের আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে যেতে স্বেচ্ছাসেবীরা প্রস্তুত রয়েছেন।


আরো সংবাদ