২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

৭৫ হাজার অবিক্রীত গরু নিয়ে বিপাকে পাবনার খামারিরা

সাঁথিয়া উপজেলার সেলন্দা গ্রামের খামারি জাভেদ মিয়ার অবিক্রীত গরু : নয়া দিগন্ত -

পাবনা-সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের গো-খামারি, চাষি, মওসুমি ব্যবসায়ী ও ব্যাপারীদের মাথায় হাত পড়েছে। মহামারী করোনা ও বন্যার কারণে এবার কোরবানির ঈদে গরু বিক্রি কম হওয়ায় ব্যাপক লোকসানে তারা মুষড়ে পড়েছেন। এ ছাড়া ক্রস হাইব্রিড ও দেশী মাঝারি জাতের প্রায় ৭৫ হাজার অবিক্রীত গরু নিয়ে তারা পড়েছেন মহা বিপাকে। অনেক ব্যাপারী খামারি ও চাষিদের পাওনা টাকা পরিশোধ না করতে পেরে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন বলে জানা গেছে।
এ অঞ্চলের বেড়া, সাঁথিয়া, সুজানগর, আটঘড়িয়া, ঈশ্বরদী, ফরিদপুর, ভাঙ্গুড়া, চাটমোহর, শাহজাদপুর, উল্লাপাড়া, তাড়াশ. চৌহালী, কামারখন্দ উপজেলার খামারি, চাষি ও মওসুমি ব্যবসায়ীরা ক্রসজাতের পাবনা ব্রিড, অস্ট্রেলিয়ান-ফ্রিজিয়ান ব্রিড, ইন্ডিয়ান হরিয়ান ব্রিড, পাকিস্তানি সাহিয়াল ব্রিড ও দেশী জাতের গরু পালন করেন। সারা দেশে পাবনা অঞ্চলের গরুর দারুণ চাহিদা রয়েছে। কিন্তু এবার মহামারী করোনা ও বন্যার কারণে কোরবানির পশুহাটগুলোয় ক্রস হাইব্রিড ও দেশী মাঝারি জাতের গরুর সরবরাহ চাহিদার তুলনায় বেশি থাকায় গরুর অস্বাভাবিক দরপতন ঘটেছে। এতে করে এ অঞ্চলের প্রায় ৩০ হাজার গরুর ব্যাপারী ও খামারি মূলধন হারিয়ে পথে বসেছেন। তবে মওসুমি গরু ব্যবসায়ীরা এবার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
গবাদিপশু সমৃদ্ধ পাবনা-সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের খামারি ও চাষিরা এবার জেলার চাহিদা মিটিয়ে প্রায় আড়াই লাখ কোরবানির পশু দেশের বিভিন্ন হাটে সরবরাহ করেছিলেন। গরু ব্যবসায়ীরা খামারি ও চাষিদের কাছ থেকে নগদ-বাকিতে গরু কিনে বিক্রির জন্য সড়ক ও নৌপথে ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলার পশুহাটে নিয়ে যান। চাহিদার তুলনায় গরুর সরবরাহ বেশি থাকায় ঈদের দুই দিন আগে দেশের বিভিন্ন পশুহাটে গরুর দাম কমে যায়। এতে অনেক ব্যবসায়ী ও খামারি বাধ্য হয়ে লোকসান দিয়ে গরু বিক্রি করেন। এ দিকে ঈদের তিন দিন আগে ঢাকার পশুহাটগুলোতে গরুর সঙ্কট দেখা দেয়। এ খবরে ব্যাপারীরা রাতারাতি অনেক গরু কিনে ট্রাকে করে সড়কপথে ঢাকা গরু পাঠায়। কিন্তু জ্যামে ট্রাক আটকা পড়ায় অনেক ট্রাক ঈদের দিন সকালে ঢাকা পৌঁছায়। এতে করে কিছু কিছু গরু বিক্রি হলেও অনেকেই বিক্রি করতে না পেরে গরু ফেরত নিয়ে আসেন।
সিরাজগঞ্জ উপজেলার রাউতরা গ্রামের আহম্মদ উল্লাহ জানান, গত বছর ঈদের আগে বিভিন্ন জেলার ব্যাপারীরা খামারি ও চাষিদের বাড়ি থেকে গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া কিনে ট্রাক ভর্তি করে নিয়ে যেতেন। এবার করোনাভাইরাস ও বন্যার কারণে দূর-দূরান্ত থেকে ব্যাপারীরা গরু কিনতে আসেননি। মানুষের আর্থিক অবস্থাও ভালো না। গরু বিক্রি করতে না পারায় সংসার চালানো নিয়ে তিনি কঠিন সমস্যায় পড়েছেন।
একাধিক গরুব্যবসায়ী ও খামারি বলেছেন, একদিকে মহামারী করোনাভাইরাস ও বন্যা অন্য দিকে হাটে চাহিদার চেয়ে সরবরাহ বেশি হওয়ায় ঈদের দেড় মাস আগে থেকেই গরুর দাম ব্যাপকভাবে কমে যায়। ট্রাক ও নৌকার ভাড়াসহ পথখরচ উঠানোর জন্য ব্যবসায়ী ও খামারিরা লোকসান দিয়ে গরু বিক্রি করেছেন।
বেড়ার নতুনপাড়া গ্রামের হায়দার আলী ঢাকার গাবতলী পশুহাটে ৭০টি গরু তুলেছিলেন। এর মধ্যে ৩৫টি গরু ১৫ লাখ টাকা লোকসান দিয়ে বিক্রি করেছেন। অবিক্রীত ৩৫টি গরু ফেরত নিয়ে এসেছেন। একই গ্রামের মন্টু ব্যাপারীর ৪৩টি গরুর ২১টি বিক্রি হয়েছে, ২২টি ফেরত নিয়ে এসেছেন। তার লোকসান হয়েছে প্রায় ৭ লাখ টাকা। নদীপাড়ের সোলেমান ব্যাপারীর ১০৫টি গরুর মধ্যে ৫৫টি বিক্রি হয়েছে। অবিক্রীত ৫০টি গরু ফেরত নিয়ে এসেছেন। তার লোকসান হয়েছে প্রায় ১৩ থেকে ১৪ লাখ টাকা।
বেড়ার রাকশা গ্রামের কালা ব্যবসায়ী আটটি গরু বিক্রি করে এক লাখ টাকা লোকসান দিয়েছেন। হাতিগাড়া গ্রামের আকরাম ও আলতাফ ব্যবসায়ীও ব্যাপক লোকসান দিয়ে গরু বিক্রি করেছেন।
সাঁথিয়া উপজেলার সেলন্দা গ্রামের খামারি রজব আলী হাইব্রিড জাতের ২০টি গরু চট্টগ্রামের হালিশহর হাটে নিয়েছিলেন। আটটি গরু বিক্রি হয়েছে। অবিক্রীত ১২টি অনেক কষ্ট করে ফেরত নিয়ে এসেছেন। তার লোকসান হয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা। পাবনা জেলার দুই সহ¯্রাধিক গরু ব্যবসায়ী ও খামারি প্রত্যেকের ৫০ হাজার থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত লোকসান হয়েছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।
এ দিকে অনেক খামারি বাকি টাকা না পাওয়ার আশঙ্কায় ব্যাপারীদের কাছ থেকে গরু ফেরত নিয়ে যাচ্ছেন। আবার অনেক ব্যাপারী খামারি ও চাষিদের পাওনা টাকা পরিশোধ করতে না পেরে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন বলে তাদের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন।


আরো সংবাদ