৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০

চামড়ার দামে দেশজুড়ে হতাশা

মৌলভীবাজারে পশুর চামড়া ফেলে দেয়া হচ্ছে নদীতে : নয়া দিগন্ত -

বিগত সব বছরের রেকর্ড ভেঙেছে এবারের কোরবানি পশুর চামড়ার বাজারের ধস। কোথাও ক্রেতার অভাবে চামড়া ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে নদীতে আবার কোথাও মাটিতে পুঁতে রাখা হয়েছে। কিছু এলাকায় চামড়ার এমন দুর্গতির জন্য কোরবানিদাতারা নিজেরাই চামড়া খাওয়ার জন্য সংরক্ষণ করেছেন। এ দিকে যে ব্যবসায়ীরা চামড়া কিনেছেন তারাও চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন। লবণের অভাবে চামড়া সংরক্ষণ করতে না পেরে অনেক ব্যবসায়ী চামড়া নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। এ ছাড়া ট্যানারি মালিকদের আগ্রহ না থাকায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির শঙ্কা করছেন ক্ষুদ্র চামড়া ব্যবসায়ীরা।
চুয়াডাঙ্গা সংবাদদাতা জানান, চুয়াডাঙ্গায় ঈদের দিন থেকে শুরু করে ঈদের তৃতীয় দিনেও জেলার বিভিন্ন এলাকা ও মাদরাসা থেকে কোরাবানির পশুর চামড়া কিনেছেন চামড়া ব্যবসায়ীরা। কাঁচা ও ওয়েট-ব্লু চামড়া রফতানির সরকারি সিদ্ধান্তের পরেও কোরবানির পশুর চামড়া সস্তায় বিক্রি হতে দেখা গেল। জেলায় এবার একটি ছাগলের চামড়া বিক্রি হয়েছে মাত্র ২০ থেকে ৫০ টাকায়। আর গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে ১৫০ থেকে ৬০০ টাকায়। চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, চামড়ার দাম নেই, যা চামড়া কিনেছি তা কবে বিক্রি করতে পারব জানি না। বুঝতে পারছি না এবার লাভ হবে না লোকসান হবে।
চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার আবুল কাশেম চারজনের সাথে ভাগে গরু কিনেছেন ৯৭ হাজার টাকা দিয়ে। কোরবানির পর তার গরুর চামড়া কেনার জন্য কয়েকজন মৌসুমি ব্যবসায়ী এসে দাম বলেন ১৫০ টাকা। একজন সর্বোচ্চ ২৫০ টাকা বলে চলে যায়। পরে কারো কাছে চামড়া বিক্রি না করে এলাকার পাশের মাদরাসায় দান করে দেন।
চুয়াডাঙ্গা রেলবাজারের চামড়া ব্যবসায়ী সামসুল আলম টুটুল জানান, লবণ ছাড়া ২৭-২৮ বর্গফুটের এক নম্বর একটা চামড়া ৬০০ টাকা করেও কিনেছেন। আর ত্রুটি যুক্ত তিন নম্বর শ্রেণীর খারাপ মানের লবণ ছাড়া চামড়া ১৫০ টাকা করেও কিনেছেন। এমন চামড়া ২০ থেকে ২২ বর্গফুটের হলেও মানের কারণে দাম পাওয়া মুশকিল হয় বলে জানান টুটুল। তিনি আরো বলেন, ঈদের তিন দিনে ৩০০টির মতো গরুর চামড়া এবং ১৪ শ’ থেকে ১৫শ’ টির মতো ছাগলের চামড়া কিনেছেন তিনি।
বেনাপোল (যশোর) সংবাদদাতা জানান, কোরবানির পশুর চামড়ার দাম না পাওয়ায় প্রভাব পড়েছে যশোরের শার্শায় গরিব দুস্থ, এতিম ও হেফজখানায়। বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করা চামড়া ন্যায্য দামে বিক্রি করতে না পারায় দিশেহারা হয়ে পড়েছে তারা।
এতিমখানা ও হেফজখানা কর্তৃপক্ষ বলছেন, গরিব ও দুস্থ মানুষের পাশাপাশি এতিমখানা, হেফজ খানা ও কওমি মাদরাসাগুলোর অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে ভূমিকা রাখে কোরবানির চামড়া বিক্রির টাকা। এ অর্থ গরিব ছাত্রদের পড়ালেখা, থাকা-খাওয়ার পেছনে খরচ করা হয়। এ সহযোগিতা বরাবর পেলেও এবার কাঁচা চামড়ার দাম কম হওয়ায় বিশাল ক্ষতির মুখে পড়েছে এই প্রতিষ্ঠানগুলো।
শার্শার বালুন্ডা হাইস্কুলের শিক্ষক মিজানুর রহমান বলেন, আমি ছাগল কোরবানি করেছিলাম। চামড়ার কোনো ক্রেতা না পাওয়ায় মাটিতে পুঁতে ফেলেছি।
সামটা মুসলিম এতিম খানার সভাপতি লিয়াকত আলী বলেন, চামড়ার দাম কম হওয়ায় এতিম খানা বড় আর্থিক সঙ্কটে পড়বে।
নাভারনের ওয়ালুম কওমি হাফিজিয়া মাদরাসা প্রধান হাফেজ আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, নাভারন কাজিরবেড় ও সিরামকাটি গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ তাদের কোরবানির পশুর চামড়া আমাদের দিয়ে থাকেন। এবার গরুর চামড়া পেয়েছি ১১২টি আর খাসির ২০৫টি। বেচাবিক্রির চেষ্টা করছি কিন্তু এখনো বেচতে পারিনি।
শার্শা নাভারন বাজারের চামড়া আড়তদার শফিউর রহমান জানান, ঢাকার ট্যানারি মালিকরা চামড়া নাকি নিচ্ছে না। তাই আমরাও কিনতে সাহস পাচ্ছিনে।
মৌলভীবাজার সংবাদদাতা জানান, লবণ ও ছালাই কর্মী সঙ্কটে মৌলভীবাজারে কোরবানির চামড়া ব্যাপকভাবে পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে বালিকান্দি চামড়া ব্যবসায়ীরা শত শত গরু ও খাসির চামড়া নদীতে ফেলে দিচ্ছেন। যার ফলে এবারে কয়েক লাখ টাকার ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। তবে চামড়া নষ্ট বা নদীতে ফেলার মতো কোনো অভিযোগ পাননি বলে জানালেন মৌলভীবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম। তাছাড়া চামড়া সংরক্ষণে লবণের সঙ্কট দেখা দিলে প্রয়োজন মতো তা সরবরাহের কথা জানান তিনি।
জানা যায়, মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসন কোরবানির চামড়া সংগ্রহে ব্যবসায়ীদের নিয়ে একাধিক বৈঠক করে নানাভাবে উৎসাহ দেন। সেই সাথে তাদের সংগ্রহ করা চামড়া ন্যায্য দামে ঢাকায় বিক্রির প্রতিশ্রুতিও দেয়া হয়। এতে মৌলভীবাজার জেলার অর্ধশতাধিক চামড়া ব্যবসায়ী ব্যাপক উৎসাহ নিয়ে বিভিন্ন মাধমে টাকা সংগ্রহ করে চামড়া ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন। কিন্তু চামড়া সংগ্রহের শুরু থেকেই সংরক্ষণে সুষ্ঠু ব্যবস্থা না থাকা এবং লবণ ও ছালাই কর্মী সঙ্কটে ব্যাপকভাবে চামড়া পচে নষ্ট হয়ে গেছে।
চামড়া ব্যবসার সাথে জড়িত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ বছর জেলার সাতটি উপজেলায় অর্ধলাখ গরু কুরবানি দেয়া হয়েছে। বালিকান্দি ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও চাঁদনিঘাট ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য শওকত আলম জানান, গত দু’দিনে বালিকান্দি চামড়া ব্যবসায়ীরা কম করে হলেও সাত হাজার গরুর চামড়া সংগ্রহ করেছেন। এছাড়া লবণযুক্ত আরো চামড়া মিলে সংগ্রহ এ পর্যন্ত ১২ হাজার। তিনি জানান, ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত তার অর্ধকোটি টাকা লোকসান হয়েছে। ঢাকার ব্যবসায়ীদের কাছে এখনো তার ২০ লাখ টাকা পাওনা। আমার মতো অনেকেই ঢাকার ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা পাবেন।
চামড়া ব্যবসায়ী ছুরুক মিয়া জানান, পচে নষ্ট হয়ে যাওয়াতে এর মধ্যে ১০০ পিস গরু চামড় ঈদের পরদিন মনু নদীতে ফেলে দিয়েছেন। এক পিস গরুর চামড়া ১০০-২৫০ টাকায় তিনি কিনে ছিলেন। একমাত্র লবণ সঙ্কট ও গরমে এসব চামড়া পচে গেছে। এভাবে ব্যবসায়ী সাজু মিয়া, শাহ আলম ও এলিন মিয়াসহ অনেকেই একই ধরনের কথা বলছেন।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম বলেন, চামড়া নষ্ট ও নদীতে ফেলে দেয়ার কোনো অভিযোগ আমি পাইনি। লবণ সঙ্কট দেখা দিলে পৌরসভা চেম্বার এবং ইউনিয়ন পরিষদ থেকে লবণ সরবরাহ করা হবে।
নাগরপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা জানান, টাঙ্গাইলের নাগরপুরে কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি হয়নি বললেই চলে। অপর দিকে দাম না থাকায় এতিমখানা ও মাদরাসা থেকেও চামড়া নিতে না আসায় নিজেরাই মাদরাসায় গিয়ে চামড়া দিয়ে আসছেন কেউ কেউ। আবার কেউ গরুর চামড়ার সাথে ছাগলের চামড়া ফ্রি দিয়েছেন।
উপজেলার সহবতপুরের কোকাদাইর দক্ষিণ পাড়া জামে মসজিদের সভাপতি আব্দুল মালেক নয়া দিগন্তকে জানান, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার কয়েক দফায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কোরবানিও কম হয়েছে। তারপরও চামড়া নিতে চাইছে না বেপারিরা। গরুর চামড়া মান ভেদে ৫০ থেকে ১০০ টাকা। আর খাসির চামড়া কিনতেই চায় না। তাই গরুর চামড়ার সাথে ফ্রি হিসেবে দিয়েছি। শুধু আমরা নই, সবারই এমন অবস্থা।
পাকুটিয়া গ্রামের কোরবানিদাতা শহীদুল ইসলাম জানান, চামড়া ব্যবসায়ীরা আসেনি অপর দিকে কেউ বিনামূল্যেও নিতে রাজি হয়নি। তাই বাধ্য হয়েই চামড়া পানিতে ভাসিয়ে দিয়েছি। এ গ্রামের প্রায় ১০-১২টি চামড়া বানের পানিতে ভাসিয়ে দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
উপজেলার ঘিওরকোল বাড়িয়া ইসলামিয়া মাদরাসা ও এতিমখানার রফিকুল ইসলাম আমিনি বলেন, চামড়ার দাম কম বিধায় এবার কোনো প্রতিষ্ঠানের চামড়া সংগ্রহের জন্য চিঠিপত্র বা কোনো প্রস্তুতি নেয়নি। যারা স্বেচ্ছায় এতিমখানায় এসে চামড়া দিয়ে যাচ্ছেন কেবল তাদেরটাই রেখেছি।


আরো সংবাদ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত মন্ত্রণালয়ের (১২৯৪২)ড. কামাল ও আসিফ নজরুল ঢাবি এলাকায় অবা‌ঞ্ছিত : সন‌জিত (১১৭২৬)‘সনজিতকে ক্যাম্পাসে দেখতে চায় না ঢাবি শিক্ষার্থীরা’ (১০৩২০)এমসি কলেজে গণধর্ষণ : সাইফুরের যত অপকর্ম (৯০২০)আজারবাইজান ৬টি গ্রাম আর্মেনিয়ার দখল মুক্ত করেছে (৮৩৪১)নতুন বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র সামনে আনলো ইরান (৫৭১১)যে কারণে এই শীতেই ভারত-চীন মারাত্মক যুদ্ধের আশঙ্কা রয়েছে (৫৬৫০)অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের জানাজা অনুষ্ঠিত (৫২২৯)আজারবাইজান-আর্মেনিয়ার মধ্যে সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩৯ (৫১৬৭)ছাত্রলীগের ঢাবি সভাপতি বক্তব্য স্পষ্টত সন্ত্রাসবাদের বহিঃপ্রকাশ (৫১৫০)