১২ আগস্ট ২০২০

দৌলতদিয়ায় নতুন কৌশলে সক্রিয় চাঁদাবাজরা

দৌলতদিয়া পুলিশ গাড়ি আটকে রেখে কাগজ নেয়ার জন্য চালককে চাপ দিচ্ছে। বুধবার রাতে পুলিশ বক্সের সামনে থেকে তোলা : নয়া দিগন্ত -
24tkt

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ঘাটে দালালদের প্রত্যক্ষ দৌরাত্ম্য না থাকলেও চাঁদাবাজি ও পুলিশের অনৈতিক হয়রানি বন্ধ হয়নি। বরং প্রভাবশালী মহলের লোকজন অভিনব কায়দায় কিছু অসৎ পুলিশ সদস্য ও বিআইডব্লিউটিসির কর্মচারীদের যোগসাজশে পরোক্ষভাবে চাঁদাবাজি করে চলেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কড়া নজদারিতে দৌলতদিয়া ফেরি কাউন্টারে প্রায় দুই মাস ধরে দালালদের প্রত্যক্ষ দৌরাত্ম্য নেই বললেই চলে। সেক্ষেত্রে চালকদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে সিরিয়াল অনুযায়ী কাউন্টার থেকে টিকিট নিতে হচ্ছে।
জানা যায়, প্রতিদিন দৌলতদিয়া ঘাটে গাড়ির চাপ কমানোর জন্য গোয়ালন্দ মোড়ে ট্রাকগুলোকে আটকে রাখা হয়। এ সময় দালাল শ্রেণীর লোকজন মোটরসাইকেলে সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকচালকদের কাগজপত্র নিয়ে আসে। এরপর অতিরিক্ত টাকার বিনিময়ে ফেরির কাউন্টার থেকে টিকিট কাটা হয়। এরপর সময় সুযোগ বুঝে সিরিয়াল থেকে ট্রাক বের করে এনে ফেরিতে তুলে দেয়া হয়। এ ছাড়া কোনো কোনো ট্রাকের কাগজপত্র ডিজিটাল মেশিনে স্ক্যান করে হুবহু ডুপলিকেট কপি তৈরি করে ওই দালালদের কাছে রাখা হয়। সেই ডুপলিকেট কপি দিয়ে অগ্রিম টিকিট কাটা হয়। এই অসৎ কাজে সহযোগিতা করে থাকেন বিআইডব্লিউটিসি ও ট্রাফিক পুলিশের অসৎ লোকজন। কোনো চালক এ কাজে বাধা দিতে চাইলে তার কাগজপত্র আটকে দিয়ে পুলিশ হয়রানি করে আরো বেশি উৎকোচ আদায় করে থাকে।
সরেজমিন ঘুরে দেখাকালে সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে থাকা কুষ্টিয়া, যশোর, মাগুরা, ঝিনাইদহ থেকে আসা কয়েকজন ট্রাকচালক অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, আমরা দৌলতদিয়া ঘাটে এসে জিম্মি হয়ে যাই।
বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে দৌলতদিয়া ঘাট ট্রাফিক পুলিশ বক্সের সামনে দেখা যায় নজরুল ও তার সাথে আরো একজন ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব পালন করছে। এ সময় তারা অপচনশীল মালবোঝাই ট্রাকগুলোর চালকদের কাছ থেকে কাগজপত্র নিয়ে নিচ্ছিল। পরে তাদের সাথে চালক ও বাইরে থাকা কিছু লোকজন কানাকানি কথা বলে বনিবনা হলে কোনো কোনো চালকের কাগজ দিয়ে দেয়া হয়। আর বনিবনা না হলে তাদের ঘুরিয়ে পেছনে দিয়ে দেয়া হয়। তাদের কাগজ পরে সময় সুযোগ বুঝে উৎকোচের বিনিময়ে ছেড়ে দেয়া হবে বলে অন্য চালকরা জানান।
এ সময় দায়িত্বরত সার্জেন্ট মেহেদীর কাছে ট্রাক ঘুরিয়ে দেয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি প্রথমে কিছু বলতে রাজি হননি। সাংবাদিক পরিচয় দিলে পরে জানান, এখন শুধু কাঁচা মালভর্তি ট্রাক ও যাত্রীবাহী বাস পার করা হবে। তাহলে ওই গাড়িগুলো ঘাটে আসতে দেয়া হলো কেনো এমন প্রশ্নের জবাবে সার্জেন্ট মেহেদী বলেন, ওরা ছোট ছোট সড়ক দিয়ে পালিয়ে ঘাটে এসেছে। এ জন্য তাদের টিকিট দেয়া হবে না। আরো কিছু জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পুলিশ ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই) সাহেব আছেন তার কাছে যান।’ ট্রাফিক ইন্সপেক্টর মাসুদ সাহেবকে পুলিশ বক্সে না পেয়ে চালকদের অসহায় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
ট্রাফিক ইন্সপেক্টর কোথায় জানতে চাইলে পুলিশ বক্সে বসে থাকা কয়েকজন পুলিশ সদস্য বলেন, টিআই সাহেব বাইরে আছেন। এ সময় ট্রাফিক ইন্সপেক্টর মাসুদ সাহেবের মোবাইল নম্বরে কল করে অভিযোগের বিষয়ে জানাতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি ফেরিঘাটের জিরো পয়েন্টে আছি। কোনো কিছু বলার থাকলে এখানে চলে আসুন।’
বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে দেখা যায় দৌলতদিয়া ঘাটে সিরিয়ালের অনেক দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকগুলোকে বাঁ দিক দিয়ে ট্রাফিক পুলিশের সহায়তায় তাদের পছন্দের লোক দিয়ে আগে ফেরিতে ওঠার সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে। জানা যায় বাঁ দিক দিয়ে বের করে নেয়ার জন্য ট্রাক প্রতি পুলিশকে ২০০ টাকা দিতে হয়। এ কাজে সার্জেন্ট সঞ্জিবকে দালালদের সহায়তা করতে দেখা যায়। এভাবে প্রতিরাতেই চালকরা হয়রানির শিকার হন। এ সময় বাঁ দিক দিয়ে বের হওয়া দুটি ট্রাকের ছবি নিয়ে পুলিশ কন্ট্রোল রুমে দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই) আতাউর সাহেবকে বিষয়টি অবগত করা হলে তিনি বলেন, ওই দুটি ট্রাকের কাগজ আমি নিজে গিয়ে আটক করেছি। ওদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হবে।
দৌলতদিয়া ঘাট বিআইডব্লিউটিসির ম্যানেজার আবু আব্দুল্লাহ রণি বলেন, আমরা চাই সব গাড়ির টিকিট চালক বা হেলপার সংগ্রহ করুক। কাউন্টার থেকে তাদের হাতেই টিকিট দেয়ার কথা। কিন্তু যদি কোনো বাইরের লোক বা দালাল কাউন্টারের সামনে টিকিট নিতে এসে ধরা পরে তাহলে আটক করে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

 


আরো সংবাদ