০৩ জুন ২০২০

করোনার প্রভাবে ৫০ কোটি টাকা লোকসানে জালি টুপি শিল্প

শেরপুরের বোহালগাছা গ্রামে জালি টুপি তৈরি করছেন নারী কারিগররা : নয়া দিগন্ত -

পবিত্র ঈদে ছোট বড় সাবার প্রিয় বাহারি রঙের পাঞ্জাবির সাথে টুপি। তারই মধ্যে এখন রমজান মাস। তাই বছরের অন্যান্য মাসের তুলনায় এ মাসে টুপি বিক্রি হয় অনেক বেশি। এ ছাড়া সামনেই ঈদ, পাঞ্জাবির পাশাপাশি অবশ্যই চাই টুপি। আর এই সুযোগে টুপি দোকানদারদের পাশাপাশি প্রায় পাঁচ লাখ গ্রামীণ নারী এর সাথে জড়িত। প্রতি বছর এ সময় টুপি বানাতে চরম ব্যস্ত সময় পার করেন তারা। তাদের তৈরি টুপি দেশের চাহিদা মিটিয়ে সৌদি আরব, দুবাই, কাতার, পাকিস্তান, ভারতসহ বেশ কয়েকটি দেশে রফতানি হয়। বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশে রফতানি হয় হাতে তৈরি জালি টুপি। আর এসব টুপি তৈরির সাথে জড়িত পাঁচ লক্ষাধিক নারী শ্রমিক এবং প্রায় ২০০ ব্যাপারী। কিন্তু এ বছর করোনার কারণে বিদেশে এই জালি টুপি গোডাউনে আটকা পড়ে আছে।
জানা যায়, বগুড়ার শেরপুরের চকধলী, জয়লা-জুয়ান, জয়লা-আলাদি, কল্যাণী, চক-কল্যাণী ও গুয়াগাছী এবং ধুনটের বোহালগাছা, চৌকিবাড়ি, ফড়িংহাটা, কুড়হাহাটা, বিশ্বহরিগাছা, চাঁনদার, ভুবনগাতি, চালাপাড়া, পাঁচথুপি, থেউকান্দি ও বাটিকাবাড়িসহ দুই উপজেলার বিভিন্ন এলাকার ৬০০ পরিবার এই টুপি শিল্পের সাথে জড়িত। ব্যাপারী রাজু আকন্দ জানান, পাঁচ লাখ নারী এ পেশার সাথে জড়িত। প্রতিবারের মতো এবারও ঈদকে সামনে রেখে এ পেশায় আরো কয়েক হাজার নারী-পুরুষের আগমন ঘটেছে। কিন্তু করোনার প্রাদুর্ভাবে টুপি বিদেশে রফতানি না হওয়ায় আমরা বেকার হয়ে পড়েছি। আমাদের অর্থ আটকা পড়েছে, মানবেতর জীবন যাপন করছি।
প্রায় ২০ বছর আগে এসব গ্রামে টুপি বুনোনের কাজ শুরু হয়। বোহালগাছা গ্রামের বৃষ্টি খাতুন, মর্জিনা বিবি, হ্যাপি, রানা, শিরিন আকতার জানান, তারা জন্মের পর থেকেই টুপি বানানোর পেশার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। তাদের মতে, বাড়িতে কর্মহীন হয়ে বসে থাকার চেয়ে কিছু একটা করাই ভালো। এমন ভাবনা এবং বংশীয় ঐতিহ্যকে ধারণ করতেই অনেকে টুপি তৈরির শিল্পের সাথে জড়িয়ে পড়েছেন।
বীথি, সাবিনা ইয়াসমিন, সুবর্ণা ও শিউলি জানান, তারা স্কুলে লেখাপড়ার পাশাপাশি টুপি তৈরি করে। এ ছাড়া গ্রামের গৃহবধূরা সাংসারিক কাজের ফাঁকে ফাঁকে টুপি বানিয়ে থাকেন।
ব্যাপারী আব্দুল মান্নান জানান, ঠিকমতো কাজ করলে দিনে ৩-৪টি টুপি বুনোন সম্ভব। ৭০ টাকা দামের এক ববিন সুতা দিয়ে ১২টি টুপি তৈরি করা যায়, যার দাম ৪০০ টাকা। ব্যাপারীরা বাড়িতে গিয়ে সুতার ববিন দিয়ে আসেন এবং টুপি তৈরি শেষ হলে নিজেরাই কিনে নিয়ে যান।
বাংলাদেশ জালি টুপি অ্যাসোসিয়েশনের বগুড়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ফিরোজ উদ্দিন সোহাগ জানান, সরকার যেমন গার্মেন্ট শিল্পকে রফতানিতে ভর্তুকি দেয় তেমনিভাবে এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে এতেও ভর্তুকি দিতে হবে।
বাংলাদেশ জালি টুপি অ্যাসোসিয়েশনের বগুড়া জেলা শাখার সভাপতি জুয়েল আকন্দ বলেন, প্রতি বছর আমরা ৫০ কোটি টাকার বেশি বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আনি। কিন্তু করোনার কারণে আমরা এ বছর রমজানে এই কোটি কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা থেকে বঞ্চিত হয়েছি। সেই সাথে এই শিল্পের সাথে জড়িত পাঁচ লক্ষাধিক নারী এবং ২০০ ব্যাপারী লোকসান গুনছেন এবং মানবেতর জীবন যাপন করছেন। আমরা সরকার থেকে কোনো অনুদান বা সহযোগিতা পাইনি। এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে এই দুর্দিনে সরকারকে পাশে দাঁড়াতে হবে। নইলে এই শিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে। সরকার কোটি কোটি টাকা প্রতি বছর রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হবে।


আরো সংবাদ