২৮ মার্চ ২০২০

উজানে ভারতের পানি প্রত্যাহার : পদ্মা ও তিস্তার শাখা নদীগুলো পানিশূন্য

ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে পদ্মার তলদেশ ভরাট হয়ে জেগে উঠেছে ধু-ধু বালুচর হনয়া দিগন্ত -

সেচ মৌসুমে ভারত ফারাক্কা ও গজলডোবা ব্যারাজের মাধ্যমে পদ্মা ও তিস্তার পানি প্রত্যাহার করে নেয়ায় ভাটির বাংলাদেশ অংশে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় মরা নদীতে পরিণত হয়েছে পদ্মা ও তিস্তা। নদীর বুকে জেগে উঠছে ছোট-বড় অসংখ্য বালুচর। নদী দু’টির শাখা-প্রশাখা ও উপনদীগুলো প্রায় পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। এর ফলে দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। নলকূপে পর্যাপ্ত পানি উঠছে না। সেই সাথে বৃদ্ধি পাচ্ছে আর্সেনিকের মাত্রা। এ অঞ্চলের কৃষি, মৎস্য, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি অর্থনীতিকে ক্রমাগত পঙ্গু করে দিচ্ছে।
ভারত তিস্তা নদীকে কেন্দ্র করে গজলডোবার উজানে ২০০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে মোট পাঁচটি ক্যানাল বা খাল খনন করেছে। এগুলো হলোÑ তিস্তা-মহানন্দা মূল ক্যানেল, মহানন্দা প্রধান ক্যানেল, ডাউক নগর প্রধান ক্যানেল, নাগর টাঙ্গন প্রধান ক্যানেল ও তিস্তা-জলঢাকা প্রধান ক্যানেল। তিস্তা-মহানন্দা মূল ক্যানেলের সাহায্যে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার প্রবাহ থেকে এক হাজার ৫০০ কিউসেক পানি মহানন্দা নদীতে নিয়ে যাচ্ছে। তিস্তা-মহানন্দা লিংক ক্যানেলের দৈর্ঘ্য প্রায় ২৬ কিলোমিটার। এই ক্যানেলের মাধ্যমে বছরে প্রায় ৭৩ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেয়া হচ্ছে। এর বিতরণ খালের সংখ্যা ১০টি। এই সংযোগ খাল থেকে জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, পশ্চিম দিনাজপুর, কুচবিহার, মালদাহ জেলার কৃষি জমিতে সেচের পানি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এ খালটির মধ্যে করলা, নিম, সাহু, করতোয়া ও জোড়াপানি নদী রয়েছে। এসব নদীর ওপর অ্যাকুইডাক্ট (কৃত্রিম পানিপ্রণালী) তৈরি করা হয়েছে। আধুনিক কারিগরিতে তৈরি অ্যাকুইডাক্টের নিচে বলে চলেছে নদী, ওপর দিয়ে খাল। মহানন্দা প্রধান ক্যানেলের দৈর্ঘ্য ৩২ কিলোমিটারের বেশি। এই ক্যানেলের মাধ্যমে বছরে প্রায় ৭১ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেয়া হচ্ছে। এর বিতরণ খালের সংখ্যা ১৩টি। ডাউক নগর প্রধান ক্যানেলের দৈর্ঘ্য ৮০ কিলোমিটারের বেশি। এই ক্যানেলের মাধ্যমে বছরে প্রায় ৯৫ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেয়া হচ্ছে। এর বিতরণ খালের সংখ্যা ১৮টি। নাগর টাঙ্গন প্রধান খালের দৈর্ঘ্য ৪২ কিলোমিটারের বেশি। এর মাধ্যমে বছরে এক লাখ ১৬ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে সেচ দেয়া হচ্ছে। এর বিতরণ খালের সংখ্যা আটটি। তিস্তা-জলঢাকা প্রধান ক্যানেলের দৈর্ঘ্য ৩০ কিলোমিটারের বেশি। এর মাধ্যমে ৫৮ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে সেচ দেয়া হচ্ছে। এর বিতরণ খালের সংখ্যা ছয়টি।
গজলডোবা ব্যারাজের উজানে তিস্তা পানিতে ভরপুর থাকছে আর ভাটির বাংলাদেশ অংশ ধু-ধু বালুচরে পরিণত হয়েছে। এর প্রভাবে করতোয়া, চাওয়াই, পাঙ্গা, তীরনই, বেরং, রণচণ্ডি, জোড়াপানি, পাথরাজ, সিঙ্গিয়া, ধরলা, দুধকুমার, সানিয়াজান, তিস্তা, ঘাঘট, ছোটযমুনা, নীলকুমার, বাঙ্গালী, বড়াই, মানস, কুমলাই, সোনাভরা, হলহলিয়া, জিঞ্জিরাম, বুড়িতিস্তা, যমুনেশ্বরী, মহানন্দা, টাঙ্গান, কুমারী, রতœাই, মহানন্দা, পূনর্ভবা, ত্রিমোহনী, তালমা, ঢেপা, কুরুম, কুলফি, বালাম, ভেরসা, ঘোড়ামারা, মালদহ, চারালকাটা, পিছলাসহ অনেক শাখা-প্রশাখা ও উপনদী শুকিয়ে গেছে। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর তিন থেকে পাঁচ মিটার পর্যন্ত নিচে নেমে গেছে। নলকূপে পর্যাপ্ত পানি উঠছে না। অন্য দিকে তিস্তায় পর্যাপ্ত পানি না পাওয়ায় দেশের সর্ববৃহৎ তিস্তা প্রকল্পে কাক্সিক্ষত সেচ লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হচ্ছে না। তিস্তা সেচ প্রকল্প এলাকায় সাত লাখ হেক্টর জমিতে প্রতি বছর বোরো মৌসুমে পানির তীব্র সঙ্কট দেখা দেয়। এ দিকে তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রের মিলিত প্রবাহের যমুনা নদী নাব্যতা হারিয়ে ফেলেছে। নদীর মূলধারা সঙ্কীর্ণ হয়ে পড়েছে। যমুনা সংযুক্ত ২০টি নদী পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। এতে কমেছে মাছ ও জলজ প্রাণী।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ফারাক্কা ব্যারাজের ভাটিতে মুর্শিদাবাদের জঙ্গীপুরে একটি ব্যারেজ তৈরি করা হয়েছে। এর সাথে যুক্ত রয়েছে ৩৮ দশমিক ৩ কিলোমিটার ফিডার ক্যানেল। ফারাক্কা বাঁধ থেকে গঙ্গার পানি এই ক্যানেল পথেই ভাগীরথীতে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। ফারাক্কা বাঁধ প্রকল্পের মাধ্যমে ভাগীরথী-হুগলি নদীর প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে ফিডার ক্যানেলে দৈনিক ৪০ হাজার কিউসেক পানি ছাড়া হয়। ভারত ফারাক্কার উজানে উত্তর প্রদেশ ও বিহারে সেচের জন্য আরো প্রায় ৪০০ পয়েন্ট দিয়ে পানি সরিয়ে নিচ্ছে। এর বিরূপ প্রভাবে পদ্মা নদী শুকিয়ে মরা নদীতে পরিণত হয়েছে। পদ্মা সংযুক্ত অসংখ্য শাখা-প্রশাখা ও উপনদী শুকিয়ে গেছে। ফলে এ অঞ্চলের কৃষি সেচ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
পদ্মার পানি দিয়ে শুষ্ক মৌসুমে রাজশাহী, পাবনা, কুষ্টিয়া, যশোর, ফরিদপুর প্রভৃতি জেলায় সেচকাজ চালানো হয়। এ নদীর পানি দিয়ে প্রায় ২০ ভাগ জমির সেচকাজ চলে। বাংলাদেশের কৃষি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, নৌযোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পদ্মা নদীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। পদ্মার শাখা প্রশাখা ও উপনদী শুকিয়ে যাওয়ায় শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষি খাত ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
পদ্মা ও তিস্তার অসংখ্য শাখা-প্রশাখা ও উপনদী প্রায় পানিশূন্য হয়ে ধু-ধু বালুচরে পরিণত হয়েছে। অনেকে হেঁটেই পাড়ি দিচ্ছে নদী। পদ্মা ও তিস্তা পাড়ে এখন গাঙচিল, বেলেহাঁস আর ধবল বক দেখা যায় না। দৃষ্টিতে আসে না অন্যান্য পাখি। নদী দু’টিতে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় মাছ প্রায় শূন্য; যে কারণে সাদা বক, গাঙচিল আর বেলেহাঁসের দেখা পাওয়া যায় না। একসময় পদ্মা-তিস্তা ও এর প্রধান শাখা-প্রশাখা, উপনদীগুলোর সাথে জেলে পরিবারগুলোর জীবন-জীবিকা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিল। তারা আজ কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অনেকেই বাপ-দাদার এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশা শুরু করেছেন। আর মাঝি-মাল্লারা কর্মহীন হয়ে বেকার জীবনযাপন করছেন। খেয়াঘাটের মাঝি জব্বার শেখ (৬২) বলেন, ‘পানি নাই নৌকা চলব ক্যামনে, তাই হগোলেই হাঁইটা নদী পাড় হইতাছে।’ গড়াই পাড়ের জেলে অমল কান্তি হলদার জানান, পদ্মায় পানি নাই, তাই মাছও নাই। বেঁচে থাকার তাগিদে পেশা পরিবর্তন করে চালকল চাতালে দিনমজুরের কাজ করছেন।
পদ্মা নদীতে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় এর প্রধান শাখা নদী বড়াল ও আত্রাই প্রায় পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। জিকে প্রজেক্ট কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। পদ্মা, মধুমতি, নবগঙ্গা, কাজলা, মাথাভাঙা, আত্রাই, চিকনাই, হিনসা, কুমার, সাগরখালি, কপোতাক্ষ, চন্দনাসহ পদ্মার অসংখ্য শাখা-প্রশাখা নদীর বুকে জেগে উঠেছে ছোট-বড় অসংখ্য চর। কোনো কোনো স্থানে বালু স্থায়ী মৃত্তিকায় রূপ নেয়ায় ফসল আবাদ হচ্ছে। বর্তমানে পদ্মা নদীর হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ও লালন শাহ ব্রিজের নিচে খাসজমিতে কৃষক চীনাবাদাম, বাঙ্গী, তরমুজ, টমেটো, আখসহ নানা রকম শস্য আবাদ করেছেন।
এলাকার প্রবীণ লোকদের মতে, ফারাক্কা ব্যারাজের আগে এসব নদনদীতে সারা বছর পানি থাকত। অন্য দিকে তিস্তা নদীতে পানি না থাকায় ব্রহ্মপুত্র নদে পানির টান পড়ায় যমুনা নদী শুকিয়ে যাচ্ছে। যমুনা নদীর বুক জুড়ে অসংখ্য চর জেগে উঠেছে। নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় জ্বালানি তেল, সারসহ বিভিন্ন পণ্যবাহী জাহাজ আন্ডারলোড নিয়ে বাঘাবাড়ী বন্দরে আসছে।
শুধু ফারাক্কার প্রভাবে বাংলাদেশের কৃষি-শিল্প সব কিছুতে মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। মিঠাপানি ছাড়া কৃষি ও কোনো ধরনের শিল্প-কারখানা চলতে পারে না। ফারাক্কার কারণে যশোর-খুলনা অঞ্চলে মিঠাপানির প্রবাহ কমে গেছে। পদ্মার তলদেশ ওপরে উঠে এসেছে। শুষ্ক মৌসুমে এখন পদ্মায় তেমন ইলিশ পাওয়া যায় না। মাছ আসার জন্য নদীতে যে পরিমাণ পানিপ্রবাহ থাকার কথা সেটি না থাকায় এখন আর পদ্মায় ইলিশ আসে না। গাঙ্গেয় পানি ব্যবস্থায় দুই শতাধিক প্রজাতির মিঠাপানির মাছ ও ১৮ প্রজাতির চিংড়ি ছিল। সেগুলোর বেশির ভাগই এখন বিলুপ্তির পথে। পদ্মা নদীতে পানি স্বল্পতার কারণে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে মরুকরণ অবস্থা স্থায়ী রূপ নিতে যাচ্ছে। জীববৈচিত্র্য অনেক আগেই হুমকির মুখে পড়েছে।
নদী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃতিগত দিক দিয়ে নদী বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বুনিয়াদ। পেশাগত দিক থেকে জীবন-জীবিকার একটি অংশ নির্ভরশীল নদ-নদীর ওপর। এ দেশের কৃষিসম্পদ, যোগাযোগ ব্যবস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবেশ সবই নদীনির্ভর। অর্থাৎ নদীকে বাদ দিয়ে এ দেশের উন্নয়ন তথা মানুষের জীবন-জীবিকা কল্পনাই করা যায় না। ভারত অভিন্ন নদ-নদীর পানি একতরফা নিয়ন্ত্রণ করছে। এর বিরূপ প্রভাবে গত চার দশকে দেশের উত্তর-দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি, মৎস্য, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে, যা এ অঞ্চলের অর্থনীতিকে ক্রমাগত পঙ্গু করে দিচ্ছে।

 

 


আরো সংবাদ

ভূরুঙ্গামারীতে নদে ডুবে ২ শিশুর মৃত্যু নাগরপুরে হিজড়া সম্প্রদায়কে সাহায্যের হাত বাড়ালেন ওসি করোনা পরিস্থিতিতে মাওলানা সাঈদীর মুক্তির আবেদন তুরস্কে করোনা সতর্কতায় ট্রাফিক লাইট সানাউল্লাহ মিয়ার মৃত্যুতে জামায়াতের শোক করোনাভাইরাসে মৃতদের দাফনে ফোকাল পয়েন্ট ও বিকল্প ফোকাল পয়েন্ট নিয়োগ দরিদ্র-অসহায় মানুষকে যেন ঘরের বাইরে যেতে না হয় : জিএম কাদের করোনা সন্দেহে গ্রাম থেকে বিতাড়িত, চিকিৎসা মিলছেনা হাসপাতালেও পৌর মার্কেট ও নিজ বাড়ির ভাড়া মওকুফ করলেন সিংড়ার মেয়র দিনাজপুরে আইসোলেশনে থাকা দুজনের শারীরিক অবস্থার উন্নতি এই অ্যাপ দিয়ে আপনিই করতে পারবেন করোনার টেস্ট

সকল