০২ ডিসেম্বর ২০২০

চীন-অস্ট্রেলিয়া সম্পর্কের এতো অবনতি হওয়ার কারণ কী


অস্ট্রেলিয়া ও চীনের মধ্যে উত্তেজনা বর্তমানে এমন এক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে যে এই সম্পর্ককে এক শ্বাসরুদ্ধকর ভূ-রাজনৈতিক থ্রিলারের মতো মনে হতে পারে। কেউ জানে না এই গল্পটি কোন দিকে যাচ্ছে অথবা এটা কোথায় গিয়ে শেষ হতে পারে।

"অস্ট্রেলিয়া-চীন সম্পর্ক এতো জটিল ও এতো দ্রুত পাক খেয়েছে যা ছয় মাস আগেও চিন্তা করা যায়নি," লিখেছেন গবেষক জেমস লরেনসেন, তিনি ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি সিডনিতে অস্ট্রেলিয়া-চায়না রিলেশন্স ইন্সটিটিউটের পরিচালক।

শুধু গত কয়েক সপ্তাহে এই সম্পর্কের কতোটা অবনতি হয়েছে তার দিকে তাকালে এই পরিস্থিতি কিছুটা আঁচ করা সম্ভব হবে।

পাল্টাপাল্টি পুলিশি অভিযান
চীনা কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে যে অস্ট্রেলীয় নাগরিক এবং চীনে ইংরেজি ভাষার টিভি চ্যানেল সিজিটিএনের প্রখ্যাত সাংবাদিক চেং লেইকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি সন্দেহে আটক করা হয়েছে।

এর অল্প কিছুদিন পর, সর্বশেষ যে দুজন সাংবাদিক চীনে অস্ট্রেলিয়ার সংবাদ মাধ্যমের সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করতেন কূটনীতিকদের পরামর্শে তারাও তড়িঘড়ি করে অস্ট্রেলিয়াতে ফিরে গেছেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব ঘটনার বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে দুটো দেশের সম্পর্কের ওপর।

এবিসি চ্যানেলের রিপোর্টার বিল বার্টলস যখন তড়িঘড়ি করে বেইজিং ছেড়ে অস্ট্রেলিয়াতে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন চীনের সাতজন পুলিশ অফিসার মধ্যরাতে তার বাড়িতে গিয়ে হাজির হয়।

শাংহাই-এ অস্ট্রেলিয়ান ফাইনান্সিয়াল রিভিউর সাংবাদিক মাইকেল স্মিথের বাড়িতেও পুলিশ একই ধরনের অভিযান চালায়।

তারা দুজনেই অস্ট্রেলিয়ার কূটনৈতিক মিশনে আশ্রয় গ্রহণ করেন। কিন্তু "জাতীয় নিরাপত্তার" বিষয়ে চীনা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের আগে তাদের চীন ছেড়ে যেতে বাধা দেওয়া হয়।

এরা দুজন অস্ট্রেলিয়াতে ফিরে যাওয়ার পরদিন চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যমে বলা হয় যে এই ঘটনার আগে জুন মাসে অস্ট্রেলিয়ার গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বেশ কয়েকজন চীনা সাংবাদিককে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে এবং তাদের কাছ থেকে কম্পিউটার, মোবাইল ফোন জব্দ করে নিয়ে গেছে।

অস্ট্রেলিয়ার সংবাদ মাধ্যমে বলা হয়েছে সেদেশে বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগে গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও পুলিশের তদন্তের অংশ হিসেবে চীনা সাংবাদিকদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল।

এর আগে নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যের একজন এমপি শওকত মুসেলমানের অফিসে পুলিশ তল্লাশি চালিয়েছিল। তিনি চীনের একনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে পরিচিত। পরে তিনি বলেছেন যে, ব্যক্তিগতভাবে তিনি ওই তদন্তের আওতায় ছিলেন না।

অতি সম্প্রতি বেইজিং অস্ট্রেলিয়ার দুজন শিক্ষকের চীনে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর আগে অস্ট্রেলিয়া দুজন চীনা শিক্ষকের ভিসা প্রত্যাহার করে নেয়।

অন্য যে কোন সময় এরকম একটি ঘটনা ঘটলেই সেটা বেশ কিছু দিন ধরে সংবাদ মাধ্যমে শিরোনাম হয়ে থাকার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু এবার একের পর এক এধরনের পাল্টাপাল্টি ঘটনা ঘটতে থাকে।

এছাড়াও এসব ঘটনা এতো দ্রুত গতিতে ঘটে যায় যে পর্যবেক্ষকরাও বুঝতে পারছেন যে পরিস্থিতি আসলে কোন দিকে গড়াচ্ছে।

পিছনের গল্প
এই দুটো দেশের মধ্যে ক্ষোভ ও অবিশ্বাস গত কয়েক বছর ধরেই ভেতরে ভেতরে তৈরি হচ্ছিল।

এর মধ্যে মোড় ঘোরানো ঘটনাটি ঘটে যায় ২০১৭ সালে যখন অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা এসিও সতর্ক করে দেয় যে সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় চীনের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা বেড়ে গেছে।

চীনা ব্যবসায়ীরা অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় রাজনীতিকদের অর্থ দান করেছে এরকম একটি অভিযোগও তখন সামনে চলে আসে।

সেবছরেই প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুল অস্ট্রেলিয়ায় বিদেশি হস্তক্ষেপ ঠেকাতে কিছু আইন করার কথা ঘোষণা করেছিলেন। এর জবাবে চীন অস্ট্রেলিয়ায় তাদের কূটনৈতিক সফর স্থগিত রাখে।

আরো যেসব কারণ
এর পর ২০১৮ সালে অস্ট্রেলিয়া জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সরকারিভাবে তাদের ফাইভ জি নেটওয়ার্কে চীনা প্রযুক্তি কোম্পানি হুয়াওয়ের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। অস্ট্রেলিয়াই প্রথম দেশ যারা এমন সিদ্ধান্ত নেয়। এর পর আরো বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, চীন হয়তো অস্ট্রেলিয়ার প্রতি ক্ষুব্ধ হতে পারে, আবার এটাও ঠিক যে চীনের ক্রমবর্ধমান বৃহৎ অর্থনীতির চোখ পড়েছে অস্ট্রেলিয়ার প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর।

এসব সম্পদের মধ্যে রয়েছে আকরিক লোহা, কয়লা এবং তরল গ্যাস। চীন থেকে এসব সম্পদ অস্ট্রেলিয়ায় রপ্তানি করা হয়।

এর পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ায় চীনা পর্যটক ও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা থেকেও ক্যানবেরা প্রচুর অর্থ আয় করতে থাকে।

এধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা স্বত্বেও ২০২০ সালে দুটো দেশের সম্পর্কে নাটকীয় সব পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে।

অধ্যাপক লরেনসেন বলেন, "১৯৭২ সালে দুটো দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হওয়ার পর বর্তমানে তাদের রাজনৈতিক সম্পর্ক সবচেয়ে খারাপ পর্যায়ে পৌঁছেছে।"

বিষয়: করোনাভাইরাস
করোনাভাইরাসের উৎস খুঁজে বের করতে অস্ট্রেলিয়ার পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক তদন্তের আহবান জানানোর পর এই সম্পর্কের আরো অবনতি ঘটেছে। এই ভাইরাসটি প্রথম শনাক্ত করা হয়েছিল চীনের উহান শহরে।

প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন এজন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে "অস্ত্র পরিদর্শকের মতো" ক্ষমতা প্রদানের আহবান জানান।

এছাড়াও অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পিটার ডাটন মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে উদ্ধৃত করে বলেন ভাইরাসটি কীভাবে ছড়িয়েছে তার তথ্য প্রমাণ রয়েছে। তবে ডাটন এও বলেন যে এসব কাগজপত্র তিনি দেখেননি।

চীনা কূটনীতিকরা কড়া ভাষায় এর জবাব দেন। তারা বলেন, ডাটনকে হয়তো "যুক্তরাষ্ট্রের প্রোপাগান্ডা যুদ্ধে" সামিল হতে বলা হয়েছে।

প্রফেসর লরেনসন বলেন, সারা বিশ্বে শক্তির ভারসাম্য রক্ষায় অস্ট্রেলিয়ার অবস্থানও চীনকে ক্ষুব্ধ করেছে বলে তিনি মনে করেন।

"চীন দেখতে পাচ্ছে যে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় অস্ট্রেলিয়া যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে," বলেন তিনি।

বাণিজ্য বিরোধ
এবছরের এপ্রিল মাসে অস্ট্রেলিয়ায় চীনা রাষ্ট্রদূত চেং জিংগে হুমকি দিয়েছিলেন যে চীনের লোকজন অস্ট্রেলিয়ার পণ্য বয়কট করতে পারে।

চীনা রাষ্ট্রদূত বলেন, "পরিস্থিতি যদি আরো খারাপ হয়... হয়তো সাধারণ লোকজন বলবে আমরা কেন অস্ট্রেলিয়ার ওয়াইন পান করবো? কেন অস্ট্রেলিয়ার গরুর গোস্ত খাবো?"

এর পরে চীন অস্ট্রেলিয়া থেকে বার্লি আমদানির ওপর ৮০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে। কিছু গরুর গোস্ত আমদানিও সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। ওয়াইন আমদানির ওপরেও তদন্তের ঘোষণা দেয়।

এই বিরোধ এখানেই থেমে থাকেনি। কোভিড-১৯’র কারণে চীনারা জাতিগত বিদ্বেষের শিকার হতে পারেন- এই কারণ দেখিয়ে চীনা ছাত্রছাত্রী ও পর্যটকদের অস্ট্রেলিয়ায় ভ্রমণের ব্যাপারে সতর্ক করে দেয় বেইজিং।

অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতির ওপর নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণে চীনের প্রতি অস্ট্রেলিয়ার সাধারণ লোকজনের মনোভাবও তিক্ত হতে শুরু করে।

"ভয়ভীতি দেখানোর এই কৌশলের কারণে অস্ট্রেলিয়ার মনোভাব আরো শক্ত হয়েছে," বলেন নাতাশা কাসাম। লোওই ইন্সটিটিউট নামের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষক তিনি।

এই প্রতিষ্ঠানটির চালানো এক জরিপে দেখা গেছে অস্ট্রেলিয়ার ২৩ শতাংশ নাগরিক বিশ্বাস করে না যে চীন সারা বিশ্বে কখনো দায়িত্বপূর্ণ কোন ভূমিকা পালন করতে পারে।

কাসাম আরো বলেন, চীন যখনই অস্ট্রেলিয়াকে ভয় দেখাতে চেয়েছে তখনই বেইজিং-এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার জন্যে অস্ট্রেলিয়ার ভেতরে সরকারের ওপর চাপ জোরালো হয়েছে।

হংকং-এ চীন যে নতুন নিরাপত্তা আইন জারি করেছে তারও কঠোর সমালোচনা করেছে প্রধানমন্ত্রী মরিসনের সরকার। শুধু তাই নয় হংকং-এর অনেক বাসিন্দাকে অস্ট্রেলিয়ায় চলে আসার জন্যও প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। হংকং-এর সাথে থাকা বন্দী প্রত্যর্পণ চুক্তিও বাতিল করা হয়েছে।

এসব কিছুই চীনকে ক্ষুব্ধ করেছে।

অধ্যাপক লরেনসেন বলেন, "তিন বছর ধরে দুটো দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিরোধ যে মাত্রায় গিয়ে পৌঁছেছে তাতে আমি বিস্মিত হয়েছি। মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার বার্লি, গরুর গোস্ত, ওয়াইন এবং চীনা শিক্ষার্থী ও পর্যটকের ব্যাপারে বেইজিং এমন কঠোর অবস্থানে চলে গেছে।"

"এখন দুশ্চিন্তার বিষয় হলো এটা কোথায় গিয়ে ঠেকে সেটাও পরিষ্কার নয়," বলেন তিনি।

কাসামও মনে করেন সম্পর্কের তিক্ততা যে পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে সেটা যে "ভাল কূটনীতির মাধ্যমে" ঠিক করে ফেলা যাবে সেটাও তার মনে হয় না।

"বর্তমান বৈশ্বিক পৃথিবীতে এটা কখনো সম্ভব নয় যেখানে চীন ক্রমশই একটি বৃহৎ শক্তিশালী রাষ্ট্র হয়ে উঠছে," বলেন তিনি।

দুটো দেশই জানে উত্তেজনা বৃদ্ধির সাথে সাথে ঝুঁকিও বাড়বে। গত সপ্তাহে চীনের একজন শীর্ষস্থানীয় কূটনীতিক পরস্পরের প্রতি আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেওয়া বন্ধ করার আহবান জানিয়েছেন।

অস্ট্রেলিয়ায় চীনের সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং বেইজিং সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তি ফু ইং দুপক্ষের মধ্যে আরো ভালো যোগাযোগের আহবান জানিয়ে বলেছেন, বাণিজ্যের জন্য দুটো দেশেরই পরস্পরকে প্রয়োজন।

তার এই বক্তব্যই শুধু তাৎপর্যপূর্ণ নয়, তিনি যাকে একথা বলেছেন তাও সমান তাৎপর্যপূর্ণ। অস্ট্রেলিয়ান ফাইনান্সিয়াল রিভিউর যে মাইকেল স্মিথকে চীন থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল তার কাছে তিনি এই মন্তব্য করেছেন।

অধ্যাপক লরেনসেন বলেন, চীন ও অস্ট্রেলিয়ার উৎপাদন কাঠামো এতোটাই পরিপূরক যে এরকম আরো দুটো দেশ খুঁজে পাওয়া কঠিন। তিনি বলেন, "অস্ট্রেলিয়া যা উৎপাদন করে চীনের সেটা দরকার।"

কাসাম বলেন, বাণিজ্যকে রাজনৈতিক উত্তেজনা থেকে আলাদা করে রাখা যাবে না।

তিনি মনে করেন না যে দুটো দেশের মধ্যে খুব শীঘ্রই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে। তবে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এই সম্পর্ক কেমন হবে সেটা নির্ভর করে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সংঘাত কতদূর গড়ায় তার ওপর।

সূত্র : বিবিসি


আরো সংবাদ