০৯ এপ্রিল ২০২০

সীমানা ছাড়িয়ে সীমান্তের টার্গেট অলিম্পিক

‘এসএ গেমসের ক্যাম্প করেছি চার-পাঁচ মাস। তাতেই স্বর্ণ জিততে পেরেছি। যদি দুই বছর ক্যাম্প করার সুযোগ পাই, তাহলে যে কোনো প্রতিযোগিতাতেই পদক এনে দিতে পারব। আমার পরবর্তী টার্গেট অলিম্পিক।’ এসএ গেমসে ভালোত্তলনে ৭৬ কেজিতে স্বর্ণ জয়ের এমন টার্গেট বাণী শুনালেন মাবিয়া আক্তার সীমান্ত।

সাথে অরো যুক্ত করলেন, ‘কথা রেখেছি। এখন কর্মকর্তারা কথা রাখলেই হয়। আমি বার বার বলেছি আমদেরকে পর্যাপ্ত সুযোগ দিলে আরো বেশি পদক উপহার দিতে পারবো। ভারোত্তোলনে অনেক প্রতিভা আছে। কাজে লাগানোর জন্য যথেস্ট পরিকল্পনা এবং লজিস্টিক সাপোর্ট নেই। ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ যদি এদিকটায় মনোযোগ দেয় তাহলে আরো পদক জিতবে ভারোত্তোলন।’

২০১৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ভারতের গৌহাটির ভোগেশ্বরী ফুকানানি ইনডোর স্টেডিয়ামে এসএ গেমসে ভারোত্তোলনে মেয়েদের ৬৩ কেজি ওজন শ্রেণীতে স্বর্ণপদক জিতেছিলন মাবিয়া। কাকতালীয় ব্যাপার, আরেকটি ৭ তারিখে একই আসরে স্বর্ণজয় করলেন তিনি। সাথেই ছাড়িয়ে গেল গতআসরের চার স্বর্ণেও প্রাপ্তি। মাবিয়ারটি নিয়ে হলো পাচটি। ৭৬ কেজি ওজন শ্রেণিতে মাবিয়া স্ন্যাচে ৮০ কেজি এবং ক্লিন অ্যান্ড জার্কে ১০৫ কেজি, মোট ১৮৫ কেজি ভার তুলে নিজেকে নিয়ে যান সবার ওপরে। এর ফলে মাবিয়া পেছনে ফেলেন শ্রীলঙ্কার বিসি প্রিয়ান্থি (স্ন্যাচে ৮৩ কেজি ও ক্লিন এ্যান্ড জার্কে ১০১ কেজিসহ মোট ১৮৪ কেজি) এবং নেপালের তারা দেবীকে (স্ন্যাচে ৭৫ কেজি ও ক্লিন এ্যান্ড জার্কে ৯৭ কেজিসহ ১৭২ কেজি)। ২০১৬ এসএ গেমসে মাবিয়া স্বর্ণ জিতেছিলেন ৬৩ কেজি ওজন শ্রেণিতে ১৪৯ কেজি ভার তুলে। ১১০ কেজির জন্য দুবার ট্রাই করে পারেননি। তাহলে নতুন একটা রেকর্ড হয়ে যেত।

বাংলাদেশের দ্বিতীয় মহিলা অ্য্যাথলেট হিসেবে এসএ গেমসের টানা দুই আসরে স্বর্ণজয়ের কৃতিত্ব দেখালেন মাবিয়া। এর আগে এসএ গেমসে বাংলাদেশী মহিলাদের মধ্যে টানা দুই আসরে স্বর্ণ জিতেছিলেন শূটার কাজী শাহানা পারভীন (শূটিংয়ের স্ট্যান্ডাড রাইফেল ইভেন্টে)। 

প্রতিক্রিয়ায় মাবিয়া বলেন, ‘আত্মবিশ্বাস ছিল। কোচ ও ফেডারেশন আমার প্রতি বিশ্বাস রেখেছে। নিজের প্রতি আমার যা বিশ্বাস ছিল, তার চেয়ে বেশি বিশ্বাস আমার প্রতি ছিল ফেডারেশন ও কোচদের। এই পদক আমি তাদের উৎসর্গ করছি। তাদের আশা পূরণ করতে পেরেছি। দেশের সবার প্রত্যাশা ছিল আমাকে নিয়ে। সেটা পূরণ করতে পেরেছি।’

বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব সৈয়দ শাহেদ রেজা বলেন, ‘মাবিয়ার প্রতি আমাদের বিশ্বাস ছিল। সে প্রত্যাশা মিটিয়েছে। আমরা খুবই খুশি। তার উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করছি।’

মাবিয়া সচরাচর যে ওজন শ্রেণিতে খেলে থাকেন, এবার সেই ওজনে খেলেননি। ওজন শ্রেণী বদলে যাওয়ার পর এটা কতটা চ্যালেঞ্জ ছিল? মাবিয়ার ভাষ্য, ‘হ্যাঁ, একটু চ্যালেঞ্জ তো ছিল বটেই। চার বছরের ব্যবধানে বয়সের সাথে সাথে ওজনও বাড়াটা স্বাভাবিক। এটা আমার কাছে রিস্ক মনে হয়নি। রিস্ক মনে হয়েছে দেশকে ঠিকমতো প্রতিনিধিত্ব করতে পারবো কি না, দেশকে সাফল্য এনে দিতে পারবো কি না।’

ভারত এবার ভারোত্তোলনে অংশ নেয়নি। এতেই সোনা জেতাটা অনেক সহজ হয়েছে বলে মনে করছেন কি না। জবাবে মাবিয়া বলেন, ‘না, এমনটা মনে করছি না। আমরা সবাই ভারতকে নিয়ে মাথা ঘামালেও শ্রীলঙ্কা কিন্তু অনেক ভাল খেলেছে, তারা কিন্তু মোটেও পিছিয়ে নেই। তাদের হারিয়েই আমাকে জিততে হয়েছে। তাদেরকে মোটেও গোণার বাইরে রাখা যাবে না। অসাধারণ খেলেছে তারা।’

‘কষ্ট’ শব্দটার সঙ্গে সীমান্তর পরিচয় শৈশব থেকেই। ভারোত্তোলন ফেডারেশনের সেক্রেটারি উইং কমান্ডার মহিউদ্দিন আহমেদ প্রতিদিন মাবিয়াকে আসা-যাওয়ার ভাড়া দিতেন নিজের পকেট থেকে। টাকার অঙ্কটি খুবই ক্ষুদ্র, মাত্র ৫০ টাকা! কিন্তু মাবিয়ার জন্য সেটাই ছিল অনেক বড় কিছু। দোকানি বাবা কী যে কষ্ট করে তাদের তিন ভাইবোনকে বড় করেছেন, সেটা ভেবে আজও শিউরে ওঠেন এই মহিলা ভারোত্তোলক। ‘খেলাটিতে শরীর থেকে যে প্রাণশক্তি ক্ষয় হয়, সেটা পোষাতে রোজ খাদ্য-তালিকায় আমিষের উপস্থিতি দরকার। দুপুরে মাছ হলে রাতে মাংস, কিংবা দুপুরে মাংস হলে রাতে মাছ। সকাল-বিকেল দুধ-ডিমের খরচ তো আছেই। বাবা কষ্ট হলেও এগুলো জুগিয়ে গেছেন।’

এগুলো মোকাবেলা করেই সীমান্ত আজ এই অবস্থানে। আর্থিক প্রতিকূলতায় একসময় বন্ধ হয়ে যায় সীমান্তর লেখাপড়া। মামা বক্সিং কোচ শাহাদাত কাজী জোর করেই ভাগ্নীকে ভারোত্তোলন অনুশীলন করাতে শুরু করেন।  সেই ভারোত্তোলন পাল্টে দিয়েছে সীমান্তর জীবন। রক্ষণশীল সমাজ ব্যবস্থায় মেয়েদের খেলাধুলাকে নিরুৎসাহিত করার যে প্রবণতা আছে, সব মোকাবেলা করেই প্রচ্ছদে এসেছেন মাবিয়। আজ তিনি স্বর্ণকন্যা। স্বপ্ন দেখছেন অলিম্পিকের। হয়তো পূর্ণ করতে পারেন এই সাধও !


আরো সংবাদ