০৭ জুলাই ২০২২, ২৩ আষাঢ় ১৪২৯, ৭ জিলহজ ১৪৪৩
`

চলমান অর্থনৈতিক সংকটের শিকড় কোথায়?

চলমান অর্থনৈতিক সংকটের শিকড় কোথায়? - ছবি : সংগৃহীত

চলিত বছরের শুরু থেকেই অর্থনৈতিক দিগন্তে দুর্যোগের আলো কমে এসে মেঘ জমতে শুরু করেছে। কারণ, স্বল্পমেয়াদি উন্নতির সম্ভাবনা কমে এসেছে, জ্বালানিসহ অন্যান্য জিনিসের দাম বেড়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য নেতিবাচকতার দিকে যাচ্ছে, রাজস্বের সাথে সরকারি ব্যয়ের তুলনামূলক হিসাব খারাপের দিকে।

অন্যদিকে ভারতীয় টাকার মূল্য কমেছে, সংস্থাগুলো আগের থেকে বেশি মাত্রায় সাবধান হয়ে পড়েছে, বাজার এক রকমের সংকট অবস্থায় বিরাজ করছে, সাধারণ ভোক্তারা নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির খুব ভাল করেই অনুভব করছেন।

এই সমস্ত কিছুরই সম্ভাব্য কারণ রয়েছে। তার মধ্যে কিছু কারণের শিকড় বিশ্ব অর্থনীতির মধ্যে প্রোথিত। কিন্তু এই সংকটের কারণ শুধু মাত্র সেখানে খুঁজা ব্যর্থ চেষ্টা। এর কারণ অনুসন্ধান করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতাগুলোর দিকে নজর দিতে হবে।

‘এনট্রপি’ বা কোনো ব্যবস্থার মধ্যে বিশৃঙ্খলা দিয়ে কিন্তু সর্বদা অর্থনৈতিক প্রবণতাসমূহকে বোঝা যায় না। তবে এর দ্বারা সাম্প্রতিক বিশৃঙ্খলার বিবরণ এবং খামখেয়ালি চরিত্রকে বোঝা যায়। যদিও সেই বিশ্লেষণে ঘটনাক্রমের দীর্ঘমেয়াদী চরিত্রকে খাপ খাওয়ানো সম্ভব নয়। সময়ের সাথে সাথে ‘এনট্রপি’ বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে যদি বোধ হয়, যেখানে অর্থনৈতিক প্রবণতাগুলো চক্রাকারে আবর্তিত হয়। কিন্তু সেই চক্র দীর্ঘ সময় ধরে চললে (যেমন রুশ অর্থনীতিবিদ নিকোলাই কোন্ড্রাটিয়েভ বর্ণিত ‘প্রযুক্তি চক্র’ অর্থাৎ প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের ফলে জাত অভিঘাতে পড়া পণ্যমূল্যের ওপরে ইতিবাচক প্রভাব অর্থনীতির অধোগতির পরেই দৃশ্যমান হয় এবং তা সাধারণত ৬০ বছর মতো স্থায়ী হয়) যে পার্থক্য হয়, তা কিন্তু বস্তুতান্ত্রিক নয়।

বিবর্ধিত অর্থনৈতিক ‘এনট্রপি’ বা বিশৃঙ্খলার মধ্যে যে জটিল বিন্যাস বিরাজ করে, তার ভিতর নিহিত থাকে বিবিধ বিষয়। এই বিষয়গুলোর মধ্যে প্রথমেই যেটি সামনে আসে, সেটি হল দূর্বল স্কন্ধে ভুবনায়নের গুরুভার চাপিয়ে দেয়া। এই কাণ্ডটি বিশ্বে ধনী-গরিব দেশ নির্বিশেষে ঘটতে দেখা যায়। এর সাথে থাকে জাতীয় ও বিশ্ব-স্তরে সেই সব ধনাঢ্যের জন্ম, যাদের সম্পদের পরিমাণের আঁচটুকু পর্যন্ত আগে থেকে পাওয়া সম্ভব হয়নি।
দ্বিতীয়ত, আকস্মিক ভাবে লভ্যাংশের সম্পদের এই নাটকীয় প্রকাশ ‘ফিনানশিয়াল ক্যাপিটালিজম’ (শিল্প ব্যতিরেকে অর্থনীতির অন্য ক্ষেত্র থেকে পুঁজির অধিকতর মাত্রায় জারণ)-এর আদর্শগত বিজয়কে সূচিত করে (২০০৮-এর অর্থনৈতিক সংকটের অন্যতম কারণ ছিল এটিই), তার অনুবর্তী হয়ে আসে ‘ভেঞ্চার ক্যাপিটালিজম’ (ন্যূনতম দায়বদ্ধতায় সেই সব সংস্থার ইক্যুইটিতে বিনিয়োগের প্রবণতা সম্পন্ন পুঁজিবাদ, যারা উন্নতির এক উজ্জ্বল সম্ভাবনা ব্যক্ত করছে) এবং তৃতীয় এবং এক সমান্তরাল স্তরে বৃহৎ প্রযুক্তি সংস্থার ক্ষমতায়ন ও প্রভাব বিস্তার দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

‘দ্য গ্রেট গ্যাটসবি যুগ’ (যে কালে এক প্রজন্মের হাতে সম্পদের কেন্দ্রীভবন ঘটে এবং তার পরবর্তী প্রজন্ম অর্থনীতির সারণীতে পূর্ববর্তী প্রজন্মকে ছাপিয়ে উঠে আসে)-এর পুনরাগমনের সাথে সাথে প্রকট হয় সর্বময় বিজেতা (বা মঞ্চের) বাণিজ্যের এবং তাদের অনাগত স্টার্ট-আপ ব্যবসার উদ্ভব, অস্থির অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তার দ্বারা নিশ্চিত জীবিকাগুলোর নিশ্চিহ্নকরণ এবং বাণিজ্যে মধ্যস্বত্বভোগীদের বিচ্ছিন্নকরণ। এর তিনটি উদাহরণ হলো ডিজিলাইজেশন এবং তথ্যভারে নুয়ে পড়া প্রথাগত অর্থনীতি, কোনো রকম মধ্যস্থতাবিহীন দূষিত বিষয়ে বৃহৎ প্রযুক্তি সংস্থার স্পনসরশিপের ফলে দীর্ণ গণমাধ্যম এবং ই-কমার্সের ফলে জন্ম নেয়া খুচরা ব্যবসার রমরমা।

এই চরিত্রগত পরিবর্তনগুলো, যা থেকে অর্থনৈতিক দিক থেকে শক্তিশালী এবং দরিদ্র শ্রমজীবী সমাজের মতো পরস্পর বিপরীত ভাগে বিভাজিত হয়ে যাওয়ার প্রবণতা প্রতীয়মান হয়ে ওঠে, সেগুলো এক চতুর্থ প্রবণতার দ্বারা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়। সেই প্রবণতাটি হলো বিশ্বের ধনী দেশগুলোতে (যেখানে এই গ্রহের এক-ষষ্ঠাংশ মানুষ বাস করেন) দরিদ্রতর দেশগুলো থেকে বিপুল সংখ্যক অভিবাসীর বলপূর্বক অনুপ্রবেশ।

পঞ্চমত, চীনের উত্থানের ফলে ক্ষমতাবিন্দুর স্থানাংক পরিবর্তন (ভারতের মতো কিছু ক্ষুদ্র অর্থনীতির দেশের উত্থানকেও মাথায় রাখতে হবে) পূর্বতন শক্তিসাম্যকে ঝেড়ে ফেলেছে কিন্তু নতুন কোনো ব্যবস্থার এখনো জন্ম দেয়নি।

এরসঙ্গ দিচ্ছে জৈব-সংকটের ক্রমপ্রবাহ ম্যাড কাউ ডিজিজ, সার্স, বার্ড ফ্লু, কোভিড-১৯ এবং নবাগত মাঙ্কিপক্সের মতো মহামারী। এ সবের পিছনে রয়েছে কোনো অলক্ষিত গবেষণাগারে বসে চালিয়ে যাওয়া মারাত্মক বিপজ্জনক কোনো গবেষণা অথবা পশুপাখির ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল’ স্তরে পালন তথা উৎপাদন (যার বিরুদ্ধে এই মুহূর্তে রীতিমতো প্রতিবাদ শুরু হয়েছে, যেখানে ম্যাকডোনাল্ডেরই অন্যতম অর্থলগ্নিকারী কার্ল আইকান সংস্থার তরফে সন্তানসম্ভবা শূকর পালনের পদ্ধতি নিয়ে ঘোরতর আপত্তি জানিয়েছেন)। এ সবের একটি ফল হলো সরবরাহকে নিরবচ্ছিন্ন রাখা এবং অন্যটি পর্যটন ব্যবসার ক্ষতিসাধন। এর ফলে এক দিকে পণ্য পরিবহন এবং গণপর্যটন বিপর্যস্ত হয়েছে।

পরিশেষের সাথে যুক্ত হয়েছে বিশ্ব উষ্ণায়নের মতো বিষয়, যা এখন আর কোনো বিশেষ শিল্পের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে না। বরং সামগ্রীক ক্ষেত্রের (শক্তি উৎপাদন,পরিবহন, উৎপাদন) দিকেই আঙুল তুলে হঠাৎ বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে বলতে চায়।

বিশৃঙ্খলার এই সব বহুবিধ এবং অগণিত উপাদানের কারণে ঘটিত অর্থনৈতিক ফলাফলগুলোকে সবসময় বোঝা যায় না। যেমন বুঝা যায়নি ২০০৮-এর অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে। অনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির চালিকাশক্তির সাথে উদগ্র রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা মিশ্রিত হয়ে আমেরিকায় অর্থনৈতিক ভাবে স্থবির আয়ের গোষ্ঠীগুলোকে আবাসনের ব্যবস্থা করে দিতে হয়। সামাজিক সমস্যার এই ‘সমাধান’ ইতিমধ্যেই সেখানে সরকারি ঋণের পর্বত তৈরি করেছে। যখন কোভিড-১৯ মহামারী এক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিল, তখন কিন্তু ‘স্বাভাবিকতা’র গণ্ডি লঙ্ঘন করে কোনো অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারিত হয়নি। পূর্বাবস্থায় অর্থনীতিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া নিয়ে বিতর্ক এখন আর স্থবিরতায় আটকে নেই। বরং তা মন্দায় পর্যবসিত হয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে আরো এক বিপজ্জনক মিশ্রণ, তা হল মুদ্রাস্ফীতি এবং শেয়ারবাজারে ধস।

রজনৈতিক-অর্থনীতি এই দুর্বোধ্যতাকে যেন আয়নায় প্রতিফলিত করে দেখাচ্ছে। অভিবাসী-বিরোধী ‘পলিটিক্যাল নেটিভিজম’ এবং পরিবর্ত সত্যকে ছড়িয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে প্রণীত অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ, যথা ব্রেক্সিট এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদাহরণ। এর সামনে আদর্শগত চ্যালেঞ্জের পথটি হল উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক পন্থায় বলীয়ান মানুষের শাসন প্রবর্তন। ক্ষমতার এই পরিবর্তনের (ঊর্ধ্ব ও নিম্ন উভয় ক্ষেত্রেই) আকাঙ্ক্ষা দেশের পর দেশে প্রতিরক্ষা খাতে খরচ বাড়াচ্ছে।

এই লক্ষণ মোটেই সুবিধার নয়। এই চক্র শেষ পর্যন্ত চীনের মহা উত্থান তত্ত্বে গিয়ে ঠেকতে পারে। তাতে ভারতের কিছু সুবিধা হয়তো হবে। ততক্ষণ এই বিশৃঙ্খলাকে বৃহত্তর বাস্তবতা হিসেবে স্বীকার করা ছাড়া সামনে অন্য কোনো পথ খোলা নেই।

সূত্র : আনন্দবাজার


আরো সংবাদ


premium cement
পদ্মা সেতুর নাট খোলা বায়েজিদের জামিন নামঞ্জুর ফরিদপুর জেলা ছাত্রদল সভাপতির বিরুদ্ধে হত্যা মামলা চিকিৎসার জন্য আবার ব্যাংককে রওশন এরশাদ সিলেটে আবারো বাড়ছে পানি, অবনতি বন্যা পরিস্থিতির লঞ্চে মোটরসাইকেল ১০ দিনের জন্য নিষিদ্ধ ব্রিটেনে ক্ষমতাসীন দলের ভেতরে বিদ্রোহ, কতক্ষণ টিকে থাকতে পারবেন বরিস জনসন ঢাবি অধ্যাপক ড. মোর্শেদের রিট খারিজ করায় উদ্বেগ আগস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে যাবে বাংলাদেশ ‘এ’ দল শিক্ষকদের ওপর হামলা মানে শিক্ষার ওপর হামলা : ইউনিসেফ মানিকনগরে উঠতি মাস্তানদের চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা রেকর্ড রাজস্ব আদায়ে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ভূরিভোজ করালেন মেয়র

সকল