১০ এপ্রিল ২০২০
গণহত্যার জবাবদিহিতায় অবজ্ঞা দেখাতে পারে মিয়ানমার

চীনের বিশাল বিনিয়োগ চুক্তি রাখাইনে

গণহত্যার জবাবদিহিতায় অবজ্ঞা দেখাতে পারে মিয়ানমার - ছবি : সংগৃহীত

রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচারে আন্তর্জাতিক মহল সোচ্চার হলেও মিয়ানমারের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়ে রাখাইনে গভীর সমুদ্রবন্দর ও অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠাসহ কয়েক শ’ কোটি ডলার প্রকল্পের চুক্তি সই করেছে চীন। এমন এক সময় চীন বিনিয়োগ চুক্তিগুলো করল যখন আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার শুরু হয়েছে। অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে বলীয়ান চীনের নতুন বিনিয়োগে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কোনঠাসা হয়ে পড়া মিয়ানমার গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের জবাবদিহিতার জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের দাবির প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনে উৎসাহিত হবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা।

এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ও রোহিঙ্গাসহ অন্যান্য উদ্বাস্তুবিষয়ক গবেষক ড. সি আর আবরার গতকাল শনিবার নয়া দিগন্তের সাথে আলাপকালে বলেন, চীন নিজ দেশেই মুসলিম সংখ্যালঘু উইঘুর সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন চালানোর অভিযোগে আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে রয়েছে। এ অবস্থায় তারা মিয়ানমারের মুসলিম সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের প্রতি সংবেদনশীল হয়ে কোনো অবস্থান নেবেÑ এমনটা আশা করা যায় না। ভারতের সাথে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার কারণে মিয়ানমারে বড় আকারের বিনিয়োগের তাগিদ অনুভব করেছে চীন। তাই মিয়ানমারের সাথে সুসম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে চীন নিজ ভূমিবেষ্টিত প্রদেশগুলোর জন্য সমুদ্র যোগাযোগব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণসহ নানাবিধ অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করছে।
সি আর আবরার বলেন, চলমান ঘটনাপ্রবাহে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি দুর্বলতা ফুটে উঠে। চীন ও ভারতকে আমরা বন্ধুভাবাপন্ন দেশ হিসেবে দাবি করি। কিন্তু রোহিঙ্গা ইস্যুতে এই দুই দেশের কোনোটিকেই বাংলাদেশ পাশে পেল না। এ ক্ষেত্রে সরকার জোরালো দূরের কথা, দেশ দু’টি থেকে ন্যূনতম সমর্থনও আদায় করতে পারেনি। রোহিঙ্গা সঙ্কট মোকাবেলায় বাংলাদেশ কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যে রয়েছে। এটা উদ্বেগজনক।

চীন নিজ স্বার্থেই মিয়ানমারে বড় আকারের বিনিয়োগ করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতাধর স্থায়ী সদস্য হিসাবে আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা চীনের দায়িত্ব। কিন্তু মিয়ানমারের সাথে সই হওয়া বিনিয়োগ চুক্তিগুলো থেকে আবারো প্রমাণিত হল চীন তাদের ক্ষুদ্র জাতীয় স্বার্থকেই প্রাধান্য দিচ্ছে।

সি আর আবরার বলেন, গণহত্যার অভিযোগ পাশ কাটাতে মিয়ানমার বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে যতটা সম্ভব সম্পৃক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাবে। চীনের নতুন বিনিয়োগে রোহিঙ্গা গণহত্যার মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের জবাবদিহিতার জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের দাবির প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনে মিয়ানমার উৎসাহিত হবে।
দুই দিনের সফরে গত শুক্রবার মিয়ানমার গেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং। এটি ১৯ বছর পর চীনের কোনো প্রেসিডেন্টের মিয়ানমার সফর। তাই আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মানবাধিকার নিয়ে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে থাকা মিয়ানমার সফরটিকে খুবই গুরুত্বের সাথে নিয়ে শি জিন পিংকে সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করছে। জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদ, সাধারন পরিষদ, মানবাধিকার কাউন্সিলসহ আন্তর্জাতিক ফোরামে রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের পক্ষে প্রকাশ্য অবস্থান নিয়েছে চীন।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং এবং মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন দলের প্রধান ও রাষ্ট্রীয় পরামর্শক অং সান সু চির উপস্থিতিতে গতকাল শনিবার চীনের ভূমিবেষ্টিত উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকার সাথে ভারত মহাসাগরের রেল যোগাযোগ স্থাপন, রাখাইনে গভীর সমুদ্রবন্দর ও অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা, মিয়ানমারের বাণিজ্যিক রাজধানী ইয়াঙ্গুনের কাছে নতুন শহর নির্মাণসহ ৩৩টি চুক্তি সই করেছে। এর মাধ্যমে চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর বাস্তবায়ন করা হবে, যা দেশটির বহুল আলোচিত বেল্ট অ্যান্ড রোডের অংশ।


চীন-মিয়ানমার ৩৩ চুক্তি সই

রয়টার্স জানিয়েছে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের মিয়ানমার সফরে উভয় দেশ ৩৩টি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। গতকাল উভয় দেশ অবকাঠামোগত প্রকল্প গতিশীল করতে এসব চুক্তি স্বাক্ষর করে। তবে চীনা প্রেসিডেন্টের দুই দিনের সফরে নতুন কোনো প্রকল্প স্বাক্ষর হয়নি।

১৯ বছরের মধ্যে প্রথম কোনো চীনা প্রেসিডেন্ট হিসেবে মিয়ানমার সফর করলেন জিন পিং। চীনা প্রেসিডেন্টের এই সফরকে চীনের গ্লোবাল বেল্ট ও রোড উদ্যোগের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত শুক্রবার মিয়ানমারে অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে সু চি চীনকে আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি ও বিশ্ব অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী মহান দেশ হিসেবে উল্লেখ করেন।
মিয়ানমারে মূল নেত্রী অং সান সু চি ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং। বিলিয়ন ডলার মূল্যের চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর বাস্তবায়ন দ্রুত করতে সম্মত হয়েছেন।

এসব চুক্তির মধ্যে রয়েছে চীন থেকে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, সহিংসতাকবলিত রাখাইনে গভীর সমুদ্রবন্দর ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা। তবে শি জিন পিংয়ের সফরে ৩৬০ কোটি ডলারের বিতর্কিত বাঁধ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। ২০১১ সাল থেকেই প্রকল্পটির কাজ থেমে আছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইয়াঙ্গুনভিত্তিক বিশ্লেষক রিচার্ড হর্সে বলেন, বিভিন্ন সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও নতুন বড় কিছু নেই। পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে বিশেষ করে সামনে নির্বাচন থাকায় চীনা বিনিয়োগের বিষয়ে মিয়ানমার সতর্কতা অবলম্বন করছে।
রাখাইনে মিয়ানমারের গণহত্যার অভিযোগ এনে দেশটিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) দাঁড় করিয়েছে গাম্বিয়া। এমতাবস্থায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনেক চাপে রয়েছে মিয়ানমার। সেই মুহূর্তে প্রেসিডেন্টের এই সফর দেশটির পাশে দাঁড়ানোরই শামিল চীনের।

গত বছরের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক আদালতে গাম্বিয়ার মামলার পর মিয়ানমার চীনের সাথে আরো সম্পর্ক জোরদার করতে থাকে। জিনপিংয়ের এই সফরে রোহিঙ্গা ইস্যুতে কোনো আলোচনা হবে কি না তা জানা যায়নি। তবে রাখাইনে গভীর সমুদ্রবন্দর ও পূর্ব থেকে পশ্চিমে দ্রুতগামী ট্রেন চলাচলের মাধ্যমে মিয়ানমারের চেহারা বদলে যেতে পারে।

চীনের প্রভাব রাখাইন সঙ্কট নিরসনে কাজে লাগাতে মালয়েশিয়ার আহ্বান : এ দিকে মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইফুদ্দিন আবদুল্লাহ বলেছেন, রাখাইনে চীনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। মিয়ানমারের সাথে দেশটির রয়েছে শক্তিশালী দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক। এই প্রভাব কাজে লাগিয়ে রাখাইন সঙ্কট নিরসনে চীন কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ নিতে পারে। গত শুক্রবার ভিয়েতনামে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন। মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সঙ্কটের দীর্ঘমেয়াদি সুরাহায় রাখাইনে গৃহযুদ্ধ অবসানে আসিয়ানকে ভূমিকা রাখতে হবে। বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। সঙ্কট সুরাহার জন্য প্রথমে রাখাইনে অবস্থানরত পাঁচ লাখ রোহিঙ্গার নাগরিকত্ব মিয়ানমারকে নিশ্চিত করতে হবে।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে গত ২২ আগস্ট রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর দিন নির্ধারিত ছিল। কিন্তু রোহিঙ্গাদের আপত্তির কারণে প্রত্যাবাসন শুরু করা যায়নি। তারা মিয়ানমারের নাগরিকত্বসহ পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরে স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসনে অস্বীকৃতি জানান। এ সময় কক্সবাজারে মাঠ পর্যায়ে চীন ও মিয়ানমার দূতাবাসের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তারা সার্বিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন। ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বর একই কারণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ভণ্ডুল হয়ে যায়।

মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জাতিসঙ্ঘের গণহত্যা সনদ লঙ্ঘনের অভিযোগে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) সমর্থনে মামলা করা গাম্বিয়া একই সাথে রোহিঙ্গাদের বিচারবহির্ভূত হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, জীবিকা ধ্বংস ও নিপীড়ন বন্ধে আন্তর্জাতিক এ আদালতের কাছে অন্তর্বর্তীকালীন পদক্ষেপ চেয়েছে। আগামী ২৩ জানুয়ারি আইসিজে অন্তর্বর্তীকালীন পদক্ষেপের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেবে।


আরো সংবাদ