২৫ নভেম্বর ২০২০

মোস্তাকের মা

মোস্তাকের মা - প্রতীকী ছবি

নম্র স্বভাব আর ভালো ব্যবহারের কারণে গ্রামের মানুষ ‘আহাম্মদ সুফি’ বলে ডাকেন। মূল নাম আহাম্মদ। ‘আহাম্মদ সুফি’ উচ্চারণে কঠিন হওয়ায় অনেকে ‘আহাম সুফি’ বলেই তাকে সম্বোধন করে থাকেন। তবে সবাই সম্মানের সাথে এ নামে ডাকেন। পেশায় একজন কৃষক ও ব্যবসায়ী হলেও তার সামাজিক ও ইসলামিক জ্ঞান ও বাস্তব জীবনে তা অনুসরণের কারণে এলাকার মানুষ মুগ্ধ। মানুষের প্রয়োজনে সাধ্যমতো পাশে দাঁড়ানো তার অন্যতম গুণ। নিজের ধর্ম পালনেও আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি ছিল না তার। অনেক বড় জায়গা নিয়ে বাড়ি ছিল তার। বাইর উঠানে ১০ টিনের একটি ছাপরা। প্রতিবেশী বা অতিথি এলে সেখানে বসেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জামাত হয় এখানে। খানকাঘর বলেই জানে সবাই।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তাগড়া জওয়ান সুফি সাহেব। কৃষিকাজের পাশাপাশি ছোট আকারে কাপড়ের ব্যবসায় করেন। পরিশ্রম ও সততার পুরস্কার হিসেবে পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতা এবং অসহায় মানুষকে সহায়তা করার সৌভাগ্য পান তিনি। সুফি সাহেবের উন্নতি গ্রামের কিছু দুষ্ট লোকের চোখের পীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মুখে দাড়ি ও শরীরে ভদ্র পোশাক থাকায় সুফি সাহেবকে সহ্য করতে কষ্ট হতো কুচক্রী মহলের। সুফি সাহেবের বাড়ির হাঁড়ির ভাতে ক্ষুধা মিটেছে অসংখ্য অনাথের। এটা নিজের সৌভাগ্য মনে করতেন তিনি। কর্মহীন অনেক যুবককে নিজের বাড়িতে কাজের ব্যবস্থা করতেন সুফি।

সুফি সাহেবের সংসার বেশ বড়। প্রায় দুই ডজন নাতি-নাতনি। বড় ছেলে আব্দুর রশিদ। লেখা পড়ার পাশাপাশি বাবার কাজের সহযোগী। আব্দুর রশিদ ছিলেন গ্রামের মানুষের সেবায় নিবেদিতপ্রাণ। গ্রামের বাজারের ডাক্তার। ব্যবহার খুবই সরল। সব ধর্মের মানুষ তার গ্রাহক।

রোগীর প্রয়োজনে দিন-রাত এক করে সেবা দেন। অনেকে তো এমন আছে যাদের ডাক্তারি ফি তো দূরের কথা ওষুধ কেনার টাকাও থাকত না। এমন রোগী থেকে টাকা নিতেন না তিনি। ফ্রি চিকিৎসা দিয়ে বিনামূল্যে ওষুধ তুলে দিতেন হাতে। যা রোগী বা তার স্বজনরা অনেক সময় কল্পনাও করতে পারত না। অনেকে তো ডাক্তার আব্দুর রশিদের এমন আচরণে আবেগাপ্লুত হয়ে নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। হাউমাউ করে কেঁদে দিয়েছেন ডাক্তারকে জড়িয়ে ধরেছে। বাড়ির পালানের পেঁপে গাছ থেকে বড় পেঁপেটি নিয়ে ডাক্তারের দোকানে হাজির হতেন অনেকে।

এক দিনের ঘটনা : অবেলায় রামসুন্দরের পেঁপে নিয়ে হাজির হওয়ার কারণ বুঝতে মোটেও বেগ পাননি  ডাক্তার। রামসুন্দর দোকানে আসার সাথে সাথে ডাক্তার বললেন, ‘ভেতরে আসুন দাদা। ওখানটাতে বসুন।  বাচ্চা রোগীটার ওষুধ দিয়ে আপনার সাথে কথা বলছি।’

‘ডাক্তার বাবু, আমার গাছের পেঁপে। আপনি এটা রাখলে খুব খুশি হবো। ওষুধের দাম তো দিতে পারলাম না।’ অতি সঙ্কোচে কথাগুলো বলে বড় একটি শ্বাস নিলেন রামসুন্দর। ‘এমন করে বলছেন কেন দাদা? টাকার কথা কি কেউ বলেছে আপনাকে? সে যা হোক, আপনার নাতির শরীর এখন কেমন?’ জিজ্ঞাস করলেন ডাক্তার। ‘অনেকটাই ভালো, উপর ওয়ালার ইচ্ছায় ভালো হয়ে যাবে আশা করি। সন্ধ্যে হতে বাকি নেই, ডাক্তার বাবু আমি এখন আসি।’ বলেই উঠতে চাইলেন রাম। কিন্তু ডাক্তার চিন্তা করলেন যাদের ওষুধ কেনার টাকা নেই তার গাছের পেঁপে আমি এভাবে খেতে পারি না। ‘রাম দাদা, আপনি কিছু মনে করবেন না, আপনার পেঁপে আমি রাখলাম; তবে নাতির জন্য মুখরোচক কিছু একটা কিনে নেবেন। নাতির মুখে এখন রুচি কম।’ এ কথা বলতে বলতে রামসুন্দরের হাতে মধ্যে কিছু একটা গুঁজে দিলেন ডাক্তার। আর কথা বাড়াতে পারলেন না রামসুন্দর। হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় অশ্রুসিক্ত নয়নে ডাক্তারের চোখে একবার তাকিয়ে বিদায় নিলেন। ভেজা চোখে মানুষ কী ভাববে; এই ভেবে গামছা দিয়ে তাড়াতাড়ি চোখ মুছে বাড়ির দিকে হাঁটলেন রাম।

রামসুন্দরের চোখের পানিতে আনন্দের অনুভূতি দেখলেন ডাক্তার আব্দুর রশিদ। নিজের অজান্তেই চোখ ভারি হয়ে এলো তার। ‘আল্লাহু আকবার... আল্লাহু আকবার’ মাগরিবের আজানের ধ্বনি। নিজেকে সামলে নিয়ে মসজিদে রওনা হলেন ডাক্তার।

গ্রামের মানুষের সব ধরনের বিপদাপদে পাশে দাঁড়ানো নিজের কর্তব্য মনে করতেন তিনি। বিংশ শতাব্দীর শেষ দশকে এবং একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে এলাকায় সন্ত্রাসীদের আনাগোনা বেড়ে যায়। পুকুরের মাছ চুরি, খামার থেকে গরু চুরি, বাগানের ফল চুরি, অমুকের মেয়েকে জোর করে বিয়ে, মা-বোনের সর্বনাশ, অন্যের জমি দখল, রাতের আঁধারে ডাকাতি, চাঁদাবাজিসহ অনেক অপরাধ বিস্তার লাভ করে গ্রামে। আশপাশের কয়েক এলাকার সন্ত্রাসী একজোট হয়ে এসব করে চলছে। অতিষ্ঠ গ্রামবাসী এসব থেকে মুক্তির কোনো উপায় পাচ্ছে না। ঘটনা ঘটার একদিন পর পুলিশ আসে গ্রামে। অভিযোগ পেলেও তেমন কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না।

কোনো উপায় না দেখে গ্রামের মানুষ এলেন ডাক্তারের কাছে। ‘একটা কিছু করা দরকার। এভাবে চলতে পারে না। আমরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় আছি।’ উদ্বেগের সাথে কথাগুলো একদমে বললেন নাসিরের বাবা। অনেক কথার পর গ্রামের অন্যান্য প্রধানদের নিয়ে বৈঠক ডাকার পরামর্শ দিলেন ডাক্তার। বৈঠকে অনেক আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হলো; প্রথমে পরিচিত সন্ত্রাসীদের সাথে বৈঠক করবে এলাকার প্রধানরা। তাদেরকে এসব বাদ দিয়ে গ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে এগিয়ে আসতে বলা হবে। কিন্তু কে শোনে কার কথা। প্রধানদের কথায় কান দেয়নি ভবঘুরের দল। সপ্তাহ খানেক যেতে না যেতেই বাইরের সন্ত্রাসীদের নিয়ে নিয়মিত তসরূপ শুরু। আবার গ্রামে বৈঠক হলো। এবার সিদ্ধান্ত হলো, রাত জেগে গ্রাম পাহারা দেবে মহল্লার লোকেরা। প্রতি মহল্লায় একটি করে টিম। কোথাও কোনো সমস্যা দেখলেই ‘আল্লাহু আকবার’ বলে ধ্বনি তুলবে। ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি শুনে অন্য মহল্লার পাহারাদাররা ছুটে যাবে সেদিকে। এভাবে চলতে লাগল কিছু দিন। সন্ত্রাসীরা বুঝে নিলো এভাবে চলতে থাকলে তারা আর অন্যায় করতে পারবে না।

আশপাশের এলাকার সন্ত্রাসীরা বৈঠক করে সিদ্ধন্ত নিলো আগামী সপ্তাহে গ্রামে হামলা করা হবে। পশ্চিম পাশের মেঠো পথে ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি তুলে গ্রামে প্রবেশ করবে সন্ত্রাসীদের একটি দল। ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি শুনে গ্রামের পাহাড়াদার টিম সবাই আমাদের দিকে এগিয়ে আসবে এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তাদের উপর তান্ডব চলবে। সন্ত্রাসীদের আলোচনায় সিদ্ধান্ত হলো, মূল টার্গেট ডাক্তার আব্দুর রশিদ ও তার ছোট ভাই আব্দুর রউফ। কারণ গ্রাম পাহাড়া দেয়ার উদ্যোগ ও চিন্তা আব্দুর রশিদের মাথা থেকেই এসেছে। তাকে না সরাত পারলে আমরা গ্রামে রাজত্ব করতে পারব না। আর থানা পুলিশের সাথে আব্দুর রউফের ভালো যোগাযোগ থাকায় আমরা ইদানিং থানায় কাজ করতে পারছি না। চক্রান্তের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে বৈঠক শেষ করলো সন্ত্রাসীরা। সিদ্ধান্ত হলো এই তথ্য কেউ কাউকে জানাবে না। হামলা হবে হঠাৎ। কিন্তু সন্ত্রাসীদের কেউ একজন গ্রামের এক সয়স্ক লোকের কাছে বলে ফেলেছে ‘গ্রামে সন্ত্রাসী হামলা হতে পারে। চাচা, সাবধানে থাকবেন।’

ঘটনাক্রমে সন্ত্রাসী হামলা পরিকল্পনার সংবাদ পৌঁছে যায় গ্রামের প্রধানদের কাছে। গোাপনে গোপনে খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেল অক্টোবর মাসের ১১ তারিখ দিবাগত রাতে হামলা করার পরিকল্পনা তাদের। গ্রামের প্রধানরা বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিলেন, হামলা প্রতিহত করা হবে। এ জন্য থানা থেকে পুলিশ সহায়তা চাওয়া হবে। কথা হলো থানায়। হামলা প্রতিহত করতে থানা থেকেও সাহায্যের কথা বলা হলো। এদিকে বৈঠকে সহমত দিলেও কিছু প্রধান ভয় পেয়ে সেদিনের হামলা প্রতিহত করার অভিযানে অংশ নেননি। গ্রাম থেকে পালানোর নানা অজুহাত খুঁজতে লাগলেন অনেকে। কেউ অসুস্থতা দেখিয়ে শহরে চলে গেলেন, কেউ অত্মীয় বাড়ি। শেষমেষ গ্রামের যুবক শ্রেণির সহায়তায় মোটামুটি ভালো একটি দল সাজানো হলো। সন্ত্রাসীদের হাত থেকে গ্রাম রক্ষা করতে কাজ করবে তারা।

১১ অক্টোবর সকাল থেকেই আনাগোনা গ্রামজুড়ে। সবাই সন্ধ্যার অপেক্ষায়। থানায় রীতিমতো যোগাযোগ চলছে। সন্ধ্যার পরপরই থানা থেকে পুলিশ আসবে গাড়ি নিয়ে। গ্রামের মানুষ প্রস্তুত। বিকেল গড়াতেই থানার পথে রওনা হলেন ডাক্তার আব্দুর রশিদের ছোট ভাই আব্দুর রউফ। পুলিশ জনতা মিলে সন্ত্রাসীদের রুখে দেয়া হবে। মাগরিবের আজান হলো। সুফি সাহেবের বাড়ির খানকায় নামাজ আদায় করে সবাই অপেক্ষায় পুলিশ কখন আসবে। গ্রামের পশ্চিম প্রান্ত থেকে খবর এলো এখনো সন্ত্রাসীদের কোনো আভাস পাওয়া যাচ্ছে না। সন্ত্রাসীরা আসবে কি আসবে না এমন একটা চিন্তা ঢুকে গেল সবার মাথায়। এলোমেলো চিন্তা করতে করতে এশার আজান হলো। জামায়াতের সাথে নামাজ আদায় হলো। পুলিশ নিয়ে এখনো ফেরেননি আব্দুর রউফ। কিছুক্ষণের মধ্যে পশ্চিম পাড়া থেকে ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি শোনা গেল। পরিস্থিতি আন্দাজ করতে বাকি রইলো না কারো। ‘পুলিশ হয়তো রাস্তায় আছে, আমরা হামলা প্রতিহত করতে আগাতে থাকি।’ বললেন এক প্রবীণ।

গ্রামের সাধারণ মানুষকে সন্ত্রাসী অত্যাচার থেকে রক্ষার এই অভিযানে সপরিবারে অংশ নেন সুফি সাহেব। সুফি সাহেব নিজে, বড় ছেলে আব্দুর রশিদ, আব্দুর রশিদের বড় ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক, মেজো ছেলে মাহফুজ, আব্দুর রশিদের বোনের ছেলে দেলোয়ার, ভগ্নিপতি শাহজাহান, সুফি সাহেবের স্ত্রী, পাশের বাড়ির সাঈদের আম্মা, চাঁদ মিয়ার মা, চাঁদ মিয়া, নাসিরসহ অনেকে। পশ্চিম পাড়া দিয়ে প্রবেশ করে সন্ত্রাসীরা ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি দিলে গ্রামের অনেক সরল মানুষ রাস্তায় বেরিয়ে আসে।
সন্ত্রাসীরা যাকে সামনে পেয়েছে সবাইকে আঘাত করতে থাকে। এভাবে সাধারণ মানুষের কান্নার আওয়াজে আর ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনিতে গ্রামের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। এদিকে পুলিশের কোনো খবর নেই। এখনো ফেরেননি আব্দুর রউফ। তাই ধরে নেয়া হলো, হয়তো পুলিশ আসবে না। যা করার গ্রামবাসীকেই করতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে ডাক্তার আব্দুর রশিদের নেতৃত্বে সন্ত্রাসী বিরোধী অভিযানে যোগ দেয় গ্রামের সাধারণ মানুষ। কারো হাতে বটি, কেউ কুড়াল, কেউ বড় লাঠি। যার হাতের কাছে যা আছে তাই নিয়ে গ্রাম রক্ষায় ঝাঁপিয়ে পড়েন সবাই।

রান্নায় ব্যস্ত ছিলেন আব্দুর রশিদের আম্মা। সন্ত্রাসী হামলার খবরে চুপ থাকতে পারেন নি তিনি। হাতে থাকা লাকড়ি (চুলায় আগুন জ্বালানোর কাজে ব্যবহৃত হয়) নিয়ে ছেলের পিছু নিয়েছেন তিনি। হাতে অস্ত্র না থাকলেও জালিমের হাত থেকে গ্রামের মানুষকে রক্ষায় মনের সাহসেই এগিয়ে যাচ্ছেন। তার দেখাদেখী পতিমধ্যে আব্দুল করিম চাচার স্ত্রীও হাতে এক ফালটা বাঁশ নিয়ে যোগ দেন অভিযানে। এভাবে নাম না জানা অনেকে ঘরে বসে থাকতে পারেননি সেদিন।

চার দিকে অন্ধকার। ছোট ছোট টর্চ জ্বালিয়ে সাবধানতার সাথে এগুচ্ছে গ্রামবাসী। দুই দিক থেকে অগ্রসর হচ্ছে দুই দল। পুষ্পপাড়া গ্রামের প্রাইমারী স্কুলের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে একটি সরু পানির ক্যানাল। স্থানীয় ভাষা এটিকে জুলা বলা হয়। এই জুলার ওপরে একটি ছোট সেতু আছে। প্রায় সেতুর দুই প্রান্তে পৌঁছে গেছে দু’দল। পশ্চিম পাড়া থেকে ভেসে আসছে কান্নার আহাজারি।

কিছু বুঝে ওঠার আগেই বড় বড় বিদেশী টর্চ লাইটের আলো ডাক্তার আব্দুর রশিদদের চোখ বরাবর ধরে সন্ত্রাসীরা। এতে কিছু সময়ের জন্য চোখের আলো হারিয়ে ফেলে তারা। এই সুযোগে হামলে পড়ে সন্ত্রাসীরা। শুরুতেই এলোপাথাড়ি গুলি চালায় সন্ত্রাসীর দল। চোখে অন্ধকার নিয়েই চার দিকে ছড়িয়ে পরে গ্রামবাসী। বেশি কিছু সময় ধরে চলে চরম যুদ্ধ। জুলার পানিতে নেমে পজিশন নেয় আব্দুর রশিদ। একটা সন্ত্রাসী তার কাছে এগিয়ে আসতেই হাতে থাকা অস্ত্রটি ঢুকিয়ে দেয় সন্ত্রাসীর শরীরে। মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সন্ত্রাসী। এভাবে বেশ কয়েকটা সন্ত্রাসীকে আঘাত করে নিজেও আঘাত প্রাপ্ত হয় ডাক্তার আব্দুর রশিদ। আহত অবস্থায় পড়ে থাকেন তিনি। সন্ত্রাসীরা ভাবে মারা গেছে।

আব্দুর রশিদের বড় ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক। উঠতি বয়স মাত্র। উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্র। শক্তি দিয়ে আঘাত করে চলছে সন্ত্রাসীদের। হঠাৎ একটি আঘাত লাগে মোস্তাকের মাথায়। দুর্বল হয়ে পড়ে মোস্তাক। অন্ধকারে সন্ত্রাসীরা ভাবে এটাই আব্দুর রউফ। আব্দুর রউফ ভেবে এলোপাথাড়ি আঘাত করতে থাকে মোস্তাকের উপর। নিজের সর্বশক্তি দিয়ে আঘাত প্রতিহত করতে থাকে মাথায় আঘাত প্রাপ্ত মোস্তাক। অস্ত্রের আঘাত ঠেকাতে গিয়ে দুই হাতের অধিকাংশ আঙ্গুল কেটে যায় মোস্তাকের। সন্ত্রাসীরা মৃত্যু নিশ্চিত করতে মোস্তাকের দুই পায়ের রগ কেটে দেয়। জুলার পাড়ে কাশবনের ভেতর একটি সজিনা গাছের গোড়ায় হেলান দেয়া অবস্থায় পড়ে রয় মোস্তাক।

মারাত্মক আহত হয় সুফি সাহেব। লড়াইয়ের এক পর্যায়ে মাটিতে উপর হয়ে পড়ে যান তিনি। সন্ত্রাসীরা আঘত করতে থাকে তার পিঠে। নিজেকে জীবন মৃত্যুর মুখোমুখি দেখে উচ্চ স্বরে কালেমা পড়তে শুরু করেন তিনি। তার কালেমা পড়ার শব্দে সন্ত্রাসীরা ভাবে সে হয়তো মারা যাচ্ছে। আঘাত করা বন্ধ করে পালিয়ে যায় তারা। মাটিতে আহত অবস্থায় উপর হয়ে পড়ে আছেন সুফি সাহেব।

জীবন রক্ষার্থে পাশের বাড়িতে আশ্রয় নেয় ছোট মাহফুজ। কিন্তু সন্ত্রাসীদের হাতে বাবা আর বড় ভাইকে ছেড়ে শান্তি পায়নি সে। আবার ফিরে আসে লড়াইয়ের ময়দানে। দেলোয়ার লড়াই করতে করতে এক পর্যায়ে জুলার পানিতে ঝাঁপিয়ে জীবন রক্ষা করেন। সন্ত্রাসীরা নিশ্চিত হয়েছে আব্দুর রশিদ ও আব্দুর রউফ দু’জনই শেষ। ঘটনাস্থল ত্যাগ করে নিজেদের লাশ ও আহতদের নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। পড়ে থাকে আহত সুফি সাহেব, আব্দুর রশিদ, মোস্তাক ও আব্দুস সালামসহ অনেকে।

সন্ত্রাসীরা স্থান ত্যাগ করার পর যুদ্ধের ময়দানে বাবা আর ভাইকে খুঁজছে ছোট মাহফুজ। প্রথমেই খুঁজে পায় অল্প আহত দেলোয়ারকে। এরপর দু’জন মিলে খুঁজে পায় বড় ভাই মোস্তাককে। সজিনা গাছের সাথে হেলান দিয়ে বসা মোস্তাক। মাথার আঘাত দিয়ে ঝড়ছে রক্ত। পুরো শরীর রক্তাক্ত। ভাইকে বাঁচানোর চেষ্টায় মাহফুজ ও দেলোয়ার। প্রথম দর্শনে মোস্তাক শুধু একটি কথা বলেছে ‘ভাই কান্না করিস না’। মোস্তাকের হাত ধরে উঠানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় তারা। কারণ মোস্তাকের পরেয় রগ কাটা ছিল। আহত মোস্তাককে অনেক কষ্টে কাঁধে করে বাড়ি নিয়ে আসে দেলোয়ার। মোস্তাক পতিমধ্যে একবার বমি করে। রাস্তায় রক্তের ছাপ। ঘটনাস্থল থেকে বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা এভাবে রাতুল হয় মোস্তাকের পবিত্র রক্তে। অন্যান্যদের সহযোগিতায় আহত সবাইকে বাড়ি নিয়ে আসা হয়। দ্রুত হাসপাতালে নেয়ার ব্যবস্থা হয়। রাত গভীর হওয়াতে গড়ি জোগাড় করতে বেগ পেতে হয় তাদের।

আহতরা যখন বাড়িতে তখন কয়েকজন পুলিশ নিয়ে গ্রামে পৌঁছেন আব্দুর রউফ। সে জানায়, থানায় কোনো পুলিশ ছিল না। বিভিন্ন অযুহাতে আমাকে থানায় বসিয়ে রাখা হয়। দীর্ঘ অপেক্ষার পরে একটি গাড়ি বের করে কয়েকজন পুলিশ আমার সাথে পাঠানো হয়।

আহত মোস্তাককে নিয়ে মোস্তাকের মা ও চাচি রওনা হয় উপজেলা হাসপাতালে। পরে জেলা সদরে। প্রথমিক প্রচেষ্টায় ডাক্তার মোস্তাকের মাথা এবং পায়ের কাটা স্থান থেকে রক্ত বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়। রাত শেষে ১২ অক্টোবর দ্রুত পাঠিয়ে দেয় বিভাগীয় মেডিক্যাল কলেজে। এ্যাম্বুলেন্সে মায়ের কোলে শুয়ে বাড়ি থেকে শহরের হাসপাতালে এবং সেখান থেকে বিভাগীয় হাসপাতালে যায় মোস্তাক। মোস্তাকের চাচি মাঝে মাঝে কান্না করলেও মোস্তাকের মা ব্যতিক্রম। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত এক ফোটা কান্নাও করেননি তিনি। বিভাগীয় হাসপাতালেও তেমন কোনো উন্নতি হয়নি মোস্তাকের অবস্থার। ১২ অক্টোবর দুপুর ৩.১৫ মিনিটে মায়ের কোলে মাথা রেখে আল্লাহর ডাকে সাড়া দেয় শহীদ মোস্তাক। সেই যে প্রথমে বলেছিল ‘ভাই কান্না করিস না।’ এরপরে আর কোনো কথা বলেনি মোস্তাক। শাহাদাৎ বরণের আগে মায়ের কোলে তার শেষ উচ্চারিত আওয়াজ ছিলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’। কালেমা পরে মায়ের কোলে শুয়ে পৃথিবীকে বিদায় জানায় শহীদ মোস্তাক। শরীরে জালেমের আঘাতের চি‎হ্ন নিয়ে পৌঁছে যায় আল্লাহর দরবারে।

নিজের বড় সন্তানকে বিদায় দেন গর্ভধারিণী মা। আল্লাহ তাকে এমন ধৈার্য দিলেন যে, তিনি সন্তানের শাহাদাতে এক ফোটা কান্নাও করলেন না। আল্লাহর দরবারে উত্তম প্রতিদানের আশায় বুকে সান্তনার সঞ্চার করলেন। শহীদ মোস্তাকের লাশ নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে মোস্তাকের চাচিকে কান্না করতে নিষেধ করেন মোস্তাকের মা। বলেন, ‘আমার ছেলে আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হয়েছে। আমি যদি কান্না করি; তাহলে আল্লাহর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধাচারণ করা হবে। আল্লাহ আমার সন্তানকে তার রাস্তায় কবুল করেছেন। এটা আমার সৌভাগ্য।’ বাড়িতে এসেও গ্রামবাসী এবং আত্মীয়দের কান্নায় যখন আকাশ বাতাস ভাড়ি হচ্ছিলো, মোস্তাকের মা তাদেরকেও সান্তনা দিয়েছেন। বলেছেন, ‘তোমরা কান্না করে আমার ছেলে জান্নাতের পথ পিচ্ছিল করো না। আমার ছেলে মরেনি। সে শহীদ হয়েছে। সে জীবিত। তোমরা তার জন্য দোয়া করো। আল্লাহ যেন তাকে উত্তম প্রতিদানে গ্রাহণ করে নেন।’ শহীদ মোস্তাকের মায়ের কথা আর তার ধৈর্য অবাক করে দিয়েছে গ্রামবাসীকে।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শহীদ মোস্তাকে বাবা ডাক্তার আব্দুর রশিদ, দাদা সুফি সাহেবসহ অনেকে। বেশি অসুস্থ হওয়ায় দাদাকে মোস্তাকের জানানায় আনা সম্ভব হবে না তাই তাকে মোস্তাকের শাহাদাতের সংবাদও জানানো হয়নি। বাবা আব্দুর রশিদকে অন্য একটা কিছু বলে ছেলের জানাজায় উপস্থিত করা হয়। কিন্তু বাবার বুঝতে বাকি থাকে না তাকে এখানে আনার কারণ। যাই হোক বাবা আব্দুর রশিদ ছেলে জানা যায় উপস্থিত হয়ে কান্না করেননি। তিনিও মানুষকে বলেছেন, ‘আমার ছেলের পথ সঠিক পথ। এটাই আমাদের পথ।’

ছেলের শাহাদাতের পর থেমে যায়নি ডাক্তার আব্দুর রশিদের প্রচেষ্টা। সুস্থ হয়ে গ্রামে ফিরে তিনি আবারো গ্রামবাসী নিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ শুরু করেন। এভাবে আবারো তিনি জালিমদের সমস্যার করণ হয়ে দাঁড়ান। একদিন ডাক্তার আব্দুর রশিদকেও হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। ডাক্তার আব্দুর রশিদও ছেলে পথ ধরে শাহাদাৎ বরণ করেন। কিন্তু শহীদ ডাক্তার আব্দুর রশিদের স্ত্রী ও শহীদ মোস্তাকের মা ছেলের পর স্বামীর শাহাদাতেও কোনো কান্না করেননি। ফেলেননি এক ফোঁটা চোখের পানি। আল্লাহ যেপথের বিষয়ে সুসংবাদ দিয়েছেন সেপথে শাহাদাৎ বরণকারীদের মতো সৌভাগ্য সবার হয় না। হয়তো এ কারণেই শহীদ মোস্তাকের মায়ের চোখে কোনো পানি আসেনি। হয়তো তার কানে সন্তানের উচ্চারিত শেষ কথাটি সব সময় বাজে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’। যেকারণেই তার অন্তর কান্নার পরিবর্তে সুখ অনুভব করে।

লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক


আরো সংবাদ