০৯ মার্চ ২০২১
`

‘নতুন’ মধ্যপ্রাচ্য : প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সামনে অগ্নিপরীক্ষা

‘নতুন’ মধ্যপ্রাচ্য : প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সামনে অগ্নিপরীক্ষা - ছবি : সংগৃহীত

‘বন্ধুগণ, এখন সময় পরীক্ষার’ - বুধবার অভিষেক উপলক্ষে দেয়া ভাষণে তার সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো একেক করে বলতে গিয়ে এই সাবধান-বাণী শোনান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন।

চ্যালেঞ্জের ওই তালিকা তিনি শেষ করেন “বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রে ভূমিকা“ দিয়ে। বাইডেনের ওই পরীক্ষার সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলো আসবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।

জো বাইডেনের কূটনীতি ও পররাষ্ট্র সামলানোর দায়িত্ব যারা পেয়েছেন তাদের অনেকেই ওবামা সরকারে ছিলেন। তাদের সময় যেসব সমস্যার সমাধান তারা দিয়ে যেতে পারেননি, ওই দিকে নজর দিতে গিয়ে তারা দেখবেন বাস্তবতা গত চার বছরে অনেক বদলে গেছে।

সবচেয়ে বড় ধাক্কা তারা খাবেন যখন দেখবেন যেসব নীতি তারাই প্রণয়ন করেছিলেন, তার অনেকগুলোও উধাও হয়ে গেছে বা জটিল চেহারা নিয়েছে। কিন্তু অনেক আবার মনে করছেন, নতুন এই বাস্তবতার মধ্যে সুযোগও তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা প্রতিষ্ঠান কার্নেগী এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের গবেষক কিম ঘাতাস বলেন, ‘নতুন প্রশাসনের লোকজন বুঝতে পারছেন যে মধ্যপ্রাচ্যে ওবামা সরকারের নীতিতে গলদ কোথায় ছিল।’

সম্প্রতি সৌদি-ইরান শত্রুতা নিয়ে ব্ল্যাক ওয়েব নামের একটি বইয়ের লেখক মিজ ঘাতাস বলেন, ‘বাইডেনের প্রশাসন হয়তো নতুন পথে হাঁটবেন, কারণ তারা অতীতে তাদের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়েছেন। তাছাড়া, চার বছর আগের তুলনায় মধ্যপ্রাচ্য এখন অনেকটাই ভিন্ন।’

ফাইলের প্রথম পাতায় ইরান
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রশাসনের বিদেশ নীতির ফাইলে প্রথমেই রয়েছে ইরান।

২০১৫ সালে ইরানকে পারমানবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখতে ওবামা প্রশাসনের উদ্যোগে যে ঐতিহাসিক চুক্তি হয়েছিল ডোনাল্ড ট্রাম্প তা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে আনার পর চুক্তিটি এখন সুতোয় ঝুলছে। যেকোনো সময় ছিঁড়ে পড়তে পারে। একইসাথে ইয়েমেনে চলমান গৃহযুদ্ধ বন্ধ বাইডেন সরকারের অন্যতম লক্ষ্য, যদিও ইরানের সাথে চুক্তির ফলে ক্রদ্ধ সৌদি আরবকে শান্ত করতে বারাক ওবামা শুরুর দিকে ইয়েমেনের যুদ্ধকে সমর্থন করেছিলেন।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্ষমতা নিয়ে তার প্রথম বিদেশ সফরে সৌদি আরব গিয়েছিলেন।

ওই সফরে তিনি ১১০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির চুক্তি করেন যা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অস্ত্র চুক্তি। তখন থেকে শুরু হয় সৌদি আরবের প্রতি প্রশ্নাতীত আনুগত্য এবং ইরানকে যতটা সম্ভব চাপে রাখার নীতি। ওই নীতির পথ ধরেই ইসরাইল এবং উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর মধ্যে হালে নতুন এক জোট তৈরি হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সাময়িকী নিউজলাইনের সম্পাদক হাসান বলেন, ‘ওবামা প্রশাসনে যে মানুষগুলো ছিলেন তাদের কয়েকজনকে এখন খুবই উদ্যমী ভূমিকা রাখতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের জন্য এখন এটাই সবচেয়ে প্রয়োজনীয়। আরব দেশগুলো মনে করতো যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব ছাড়াই তারা এই অঞ্চলের মানচিত্র নিজেরাই নতুন করে তৈরি করে নিতে পারবে। কিন্তু গত পাঁচ বছর ধরে ওই চেষ্টা করার পর তারা এখন বুঝতে পারছে লিবিয়া, ইরান এমনকি কাতারের ব্যাপারেও তাদের ক্ষমতা সীমিত।’

পুরনা মিত্রদের সাথে নতুন সম্পর্কের সূচনা যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রশাসনের অগ্রাধিকারের শুরুর দিকে রয়েছে। নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন বলেন, ‘শুরুতেই এই অঞ্চলে আমাদের মিত্রদের সাথে সম্পর্ক জোরদার করতে তাদের সাথে কথা শুরু খুবই প্রয়োজন। এই মিত্রদের মধ্যে যেমন ইসরাইল রয়েছে তেমনি উপসাগরীয় দেশগুলোও রয়েছে।’

চার ঘণ্টা ধরে চলা এই শুনানির সময় তিনি বার বার গুরুত্ব দিয়ে ইরানের প্রসঙ্গ টেনেছেন।

ব্লিনকেন অনেক দিন ধরে ওবামা ও বাইডেনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি বলেন, পরমাণু কর্মসূচি ছাড়াও ইরানের ‘অস্থিরতা তৈরির তৎপরতা’ এবং তাদের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে নতুন মীমাংসা প্রয়োজন। পশ্চিমা দেশগুলোরও একই মতামত।

তবে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ২০১৫ সালে করা চুক্তি যেটিকে বহুপাক্ষিক কূটনীতির বিরল একটি সাফল্য হিসেবে দেখা হয়। তা ঝেড়ে ফেলে দিতে চাইবে না বাইডেন প্রশাসন।

বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক ইউরোপীয় কাউন্সিলের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিভাগের উপ-পরিচালক এলি জেরানমায়ে বলেন, ‘আপনি যদি বাইডেনের পররাষ্ট্র নীতি, পারমানবিক নিরস্ত্রীকরণ এবং অর্থনীতি পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়া লোকগুলোর দিকে তাকান, দেখবেন তাদের অনেকেই ইরানের সাথে করা পরমাণু চুক্তি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের সাথে সরাসরি যুক্ত ছিলেন।’

‘বাইডেন শিবির ও ইরানের নেতৃত্ব উভয়েই একমত যে এই চুক্তির সব পক্ষকে একত্রিত করে চুক্তির শতভাগ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এ কাজটি তাদের দ্রুত করতে হবে।’

চুক্তি থেকে ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেরিয়ে যাওয়া ও ইরানের ওপর সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর থেকে তেহরান পারমাণবিক চুক্তিতে করা প্রতিশ্রুতি থেকে ধীরে ধীর দূরে সরে যাচ্ছে।

সম্প্রতি তেহরান ইউরেনিয়াম শোধনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়ার কথা জানিয়েছে। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র ও উরোপীয় দেশগুলো। ইরানের নেতারা অবশ্য ক্রমাগত বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করে তারাও চুক্তি অনুসরণ করবে।

ইরান চায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চাপানো সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। একইসাথে গত চার বছরে ইরানের অভ্যন্তরে পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক স্থাপন নিয়ে ভরসা কমেছে।

বাইডেন প্রশাসন দেশের ভেতরও ওজর-আপত্তির মুখোমুখি হতে পারে।

নতুন নির্বাচিত কংগ্রেসদের মধ্যে পররাষ্ট্র নীতির অনেক অভিজ্ঞ লোকজন এখন রয়েছেন, তারা বিদেশ নীতিতে অধিকতর মতামতের অধিকার চাইছেন। তবে ইরান-বিরোধী লোকজন কংগ্রেসে ভর্তি।

খাসোগজি ও সৌদি আরব
ইরান ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যে আরো যেসব বিষয়ের দিকে বাইডেন প্রশাসন নজর দেবে তার মধ্যে রয়েছে ইয়েমেনের যুদ্ধ বন্ধ করা, ইসরাইল-আরব শান্তি চুক্তি, সৌদি আরবে মানবাধিকার, বিরোধী মতাবলম্বীদের ওপর নির্যাতন ও সাংবাদিক জামাল খাসোগজি হত্যাকাণ্ড।

কিন্তু ইরানের সাথে কী চুক্তি হবে তার প্রভাব এসব বিষয়ের ওপর গিয়েও পড়বে।

বাইডেন যাকে তার জাতীয় গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ করেছেন কংগ্রেসে তার নিয়োগের শুনানির সময় তাকে প্রশ্ন করা হয়, ট্রাম্প সরকারের ‘বেআইনি তৎপরতা’ তিনি বন্ধ করবেন কিনা এবং সাংবাদিক খাসোগজি হত্যার পূর্ণাঙ্গ একটি রিপোর্ট তিনি কংগ্রেসকে দেবেন কিনা।

উত্তরে আভরিল হেইনস বলেন, ‘হ্যাঁ সিনেটর, অবশ্যই। আমরা আইন অনুসরণ করবো।’

গোয়েন্দা সূত্রের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক নির্ভরযোগ্য মিডিয়া বলে আসছে, সিআই-এর কাছে বেশ জোরালো প্রমাণ রয়েছে যে সৌদি যুবরাজ মোহামেদ বিন সালমানই জামাল খাসোগজির হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সৌদি যুবরাজ অবশ্য সবসময় এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

কিন্তু বাইডেন কী এ নিয়ে সৌদি যুবরাজকে শায়েস্তা করতে পারবেন?

সৌদি লেখক ও বিশ্লেষক আলি শিহাবি বিবিসিকে বলেন, ‘আমেরিকানদের উচিৎ যুবরাজকে তাদের সন্দেহের দৃষ্টি থেকে সরানো, কারণ সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ এ ব্যাপারে নেই। সিআইএ হোক আর পেন্টাগন হোক বা পররাষ্ট্র দফতর হোক, সৌদি আরব যে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই বাস্তবতা তাদের বুঝতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যে যেকোনো কিছু করার জন্য সৌদি আরবকে তাদের দরকার।’

তবে অনেক বিষয়ে সৌদি ও যুক্তরাষ্ট্রের নীতির মধ্যে ঐক্যমত্য হওয়া সম্ভব। যেমন, ইয়েমেনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বন্ধ। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের অন্য অনেক বিষয়ের মতো এই সমস্যারও সহজ কোনো সমাধান নেই।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইয়েমেন বিশেষজ্ঞ পিটার স্যালসবেরি বলেন, ‘সৌদি আরবের জন্য সামরিক সহযোগিতা বন্ধ অতটা সহজ নয়। যুক্তরাষ্ট্র যদি সেখানে শান্তি চায় তাহলে কূটনৈতিকভাবে তাদের আরো তৎপর হতে হবে।’

কূটনৈতিক ওই তৎপরতায় অপ্রীতিকর অনেক বিষয় উঠে আসবেই, বিশেষ করে মানবাধিকারকে যখন বাইডেন প্রশাসন তাদের এজেন্ডায় জায়গা দিয়েছেন।

তার অর্থ, রিয়াদ থেকে শুরু করে তেহরান, কায়রো বা অন্যত্র কথাবার্তা বলার সময় জটিল এবং অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সামলাতে হবে।

অনেকেই নজর রাখবেন এইসব কথা-বার্তা শুধুই কী ফাঁকা বুলি নাকি যুক্তরাষ্ট্র এসবের বাস্তবায়নকে গুরুত্ব দেবে।

মধ্যপ্রাচ্যের নতুন বাস্তবতা
তবে নতুন নীতি নিয়ে এগুলেও, বাইডেনকে তার পূর্বসূরীর অনেক পদক্ষেপকে মেনে নিয়েই কাজ করতে হবে।

যেমন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের তথাকথিত আব্রাহাম চুক্তি অর্থাৎ ইসরাইলের সাথে কয়েকটি আরব দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের চুক্তির প্রশংসা বিভিন্ন মহলে হচ্ছে। বাইডেনও এই সম্পর্কে অভিনন্দন জানিয়েছেন। কিন্তু নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিনকেন বলেছেন, ওই সব চুক্তির শর্তগুলোকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে।

ইউএই‘র কাছে অস্ত্র বিক্রি বা বিতর্কিত ওয়েস্টার্ন সাহারা অঞ্চলে মরক্কোর সার্বভৌমত্ব মেনে নেয়ার প্রতিশ্রুতির দিকে তিনি ইঙ্গিত করেছেন।

ইরাক, সিরিয়া ও ইসরাইল-ফিলিস্তিন সঙ্কট, আল কায়দা ও ইসলামিক স্টেটের অব্যাহত তৎপরতার দিকেও নজর দিতেই হবে জো বাইডেনকে, যিনি নিজের দেশেই নতুন করে উগ্রবাদের উত্থান নিয়ে উদ্বিগ্ন।

কিম ঘাতাস বলেছেন, ’আমি মনে করি নতুন সুযোগ হাজির হয়েছে, কঠিন হবে, কিন্তু বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ও মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে নতুন চিন্তার সুযোগ তৈরি হয়েছে।’

সূত্র : বিবিসি



আরো সংবাদ