৩০ নভেম্বর ২০২৩, ১৫ অগ্রহায়ন ১৪৩০, ১৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৫ হিজরি
`

শুরু হলো অমর একুশে গ্রন্থমেলা

মাহমুদুল হাসান
-

প্রতীক্ষার অবসান শেষে দেশের লেখক-প্রকাশক-পাঠকদের নিয়ে সবচেয়ে আয়োজন অমর একুশের গ্রন্থমেলার উদ্বোধন হয়েছে গত রোববার। মহান রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের স্মৃতিজড়িত মাস ফেব্র“য়ারির দ্বিতীয় দিনের বিকেলে বাংলা একাডেমি চত্বরে মেলার উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষে তার স্মৃতির প্রতি উৎসর্গ করা হয়েছে এবারের বইমেলা। আয়তনের দিক থেকে এবারের মেলা হবে বৃহৎ আয়োজন।
গতকাল সকালে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে মিলল বর্ণিল সাজে সেজেছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এবং বাঙালির মননের প্রতীক বাংলা একাডেমিও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি প্রাঙ্গণ থেকে দোয়েল চত্বর পর্যন্ত উৎসবের আমেজ। এবার বইমেলার একটি নতুন থিম নির্ধারণ করা হয়েছে। আর তা হলো ‘বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ’। স্থপতি এনামুল করিম নির্ঝর বঙ্গবন্ধুকে কেন্দ্র করে মেলার আঙ্গিক ও সামগ্রিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছেন। দেখা গেল জাতির পিতাকে সম্মান জানাতে শোভা পাচ্ছে বঙ্গবন্ধুর ছবিসংবলিত ফেস্টুন, পোস্টারসহ নানা কিছু। মেলার বিন্যাসে নান্দনিকতার ছাপ। বৃহৎ পরিসর হওয়ায় বইপ্রেমীরা এবার স্বাচ্ছন্দ্যে মেলায় ঘুরতে এবং পছন্দের বই কিনতে পারবেন বলে আশা করছেন আয়োজকরা। বইমেলা আগামী ২৯ ফেব্র“য়ারি পর্যন্ত ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। ছুটির দিন বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা এবং ২১ ফেব্র“য়ারি সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত মেলা চলবে।
এবারের মেলার সার্বিক পরিকল্পনা তুলে ধরে মেলা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এবার একুশে গ্রন্থমেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে সাড়ে আট লাখ বর্গফুট জায়গায়। একাডেমি প্রাঙ্গণে ১২৬টি প্রতিষ্ঠানকে ১৭৯টি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৪৩৪টি প্রতিষ্ঠানকে ৬৯৪টি ইউনিটসহ মোট ৫৬০টি প্রতিষ্ঠানকে ৮৭৩টি ইউনিট এবং বাংলা একাডেমিসহ ৩৩টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে ৩৪টি প্যাভিলিয়ন বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এবার লিটল ম্যাগাজিন চত্বর স্থানান্তরিত হয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে। ১৫২টি লিটলম্যাগকে স্টল বরাদ্দ এবং ৬টি উন্মুক্ত স্টল দেয়া হয়েছে। একাডেমি প্রাঙ্গণ এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে বাংলা একাডেমির দু’টি প্যাভিলিয়ন, চার ইউনিটের দু’টি, একাডেমির শিশু-কিশোর উপযোগী বইয়ের জন্য একটি এবং একাডেমির সাহিত্য মাসিক ‘উত্তরাধিকার’-এর একটি স্টল থাকবে। এবারও শিশুচত্বর মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে। এই কর্নারকে শিশু-কিশোরদের বিনোদন ও শিক্ষামূলক উপকরণে সজ্জিত করা হয়েছে। মাসব্যাপী গ্রন্থমেলায় এবারো ‘শিশুপ্রহর’ থাকছে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা থাকছে। গ্রন্থমেলার প্রচার কার্যক্রমের জন্য তথ্যকেন্দ্র থাকবে বর্ধমান ভবনের পশ্চিম বেদিতে এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। এ ছাড়া মেলায় আসা মানুষের বসার স্থান তৈরি করা হয়েছে। থাকছে ফুড কোর্টসহ বইপ্রেমী ও দর্শনার্থীদের জন্য নানা আয়োজন।
গ্রন্থমেলায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে প্রবেশের জন্য তিনটি, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য ছয়টি পথ থাকবে। বিশেষ দিনগুলোতে লেখক, সাংবাদিক, প্রকাশক, বাংলা একাডেমির ফেলো এবং রাষ্ট্রীয় সম্মাননাপ্রাপ্ত নাগরিকদের জন্য প্রবেশের বিশেষ ব্যবস্থা করা হবে।
আগামী ২৯ ফেব্র“য়ারি পর্যন্ত প্রতিদিন বিকেল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে বাংলা একাডেমি প্রকাশিত বঙ্গবন্ধুবিষয়ক ২৫টি নতুন বই নিয়ে আলোচনা করা হবে। একুশে ফেব্র“য়ারি অনুষ্ঠিত হবে ঐতিহ্যবাহী একুশে বক্তৃতা। এ ছাড়া মাসব্যাপী প্রতিদিন সন্ধ্যায় থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রতিদিনই রয়েছে কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ এবং আবৃত্তি। অমর একুশে গ্রন্থমেলা উপলক্ষে বাংলা একাডেমি শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন, সাধারণ জ্ঞান ও উপস্থিত বক্তৃতা এবং সঙ্গীত প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে।
আয়োজক সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছরের মতো এবারো হুইল-চেয়ার সেবা থাকবে। তবে গতবারের চেয়ে বেশি সংখ্যায় স্বেচ্ছাসেবী এ কাজে নিয়োজিত থাকবেন। এবার হুইল চেয়ারের সংখ্যা বাড়বে। গ্রন্থমেলার প্রবেশ ও বের হওয়ার পথে পর্যাপ্তসংখ্যক আর্চওয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মেলার সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবেন বাংলাদেশ পুলিশ, র্যাব, আনসার, বিজিবি ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নিরাপত্তাকর্মীরা। মেলার নিরাপত্তার জন্য মেলার এলাকাজুড়ে তিন শতাধিক ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বইমেলা ১৯৭২ থেকে ২০২০
বইমেলা শুধু বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি পরিণত হয়েছে বাঙালির প্রাণের মেলা, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যের মেলায়। প্রতি বছর ফেব্রয়ারি মাসে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জমে বইপ্রেমীদের এই মিলনমেলা। লাখ লাখ মানুষ সমাবেত হয় এখানে। জমে ওঠে লেখক, পাঠক ও প্রকাশকদের জমজমাট আড্ডা।
১৯৭২ সালের ৮ ফেব্র“য়ারি বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউসের সামনের বটতলায় চটের ওপর কলকাতা থেকে আনা ৩২টি বই সাজিয়ে বিক্রি শুরু করা সেই শ্রী চিত্তরঞ্জন সাহা আজ নেই। তিনিই আমাদের প্রাণের এই মেলার প্রারম্ভক। শুরুতে বইমেলা মাসব্যাপি হত না। ১৫ ফেব্র“য়ারি পর্যন্ত সীমাদ্ধ ছিল। ১৯৭৩ সালে বাংলা একাডেমি বইমেলা উপলক্ষে ১৫ ফেব্র“য়ারি থেকে ২১ ফেব্র“য়ারি পর্যন্ত বিশেষ হ্রাসকৃত মূল্যে বাংলা একাডেমি প্রকাশিত বই বিক্রির ব্যবস্থা করে। বাংলা একাডেমির পাশাপাশি মুক্তধারা প্রকাশনী, স্টান্ডার্ড পাবলিশার্স এবং আরো কয়েকজন বাংলা একাডেমির মাঠে নিজেদের প্রকাশিত বই বিক্রি শুরু করে।
১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্বে নেন ড. আশরাফ সিদ্দিকী। তিনি বইমেলাকে বাংলা একাডেমির সাথে সম্পৃক্ত করেন। তার পর ১৯৭৯ সালে মেলার সাথে যুক্ত হয় চিত্তরঞ্জন সাহা প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি।
১৯৮৪ সালে পাঠক এবং প্রকাশকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বইমেলার সময়কাল বাড়িয়ে পুরো মাসব্যাপী করার সিদ্ধান্তও গ্রহণ করে বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ। ২০১৪ সাল থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে রূপান্তরিত করে বিশাল আয়তনে বইমেলার আয়োজন করে চলেছে।


আরো সংবাদ



premium cement