২১ অক্টোবর ২০২০

অসহনীয় ঢাকার বাতাস

-

বায়ুদূষণের কারণে ঢাকা শহরে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাস বিঘিœত হওয়ার পাশাপাশি শারীরিক নানা জটিলতা দেখা দিচ্ছে। চিকিৎসকরা বলছেন, বাতাসে ভারী ধাতু ও সূক্ষ্ম বস্তুকণা বেড়ে গেলে ক্যান্সার, শ্বাসকষ্ট, স্নায়ুজনিত সমস্যা বেড়ে যায়, বুদ্ধিমত্তা কমে যায়।
বাংলাদেশে বায়ুদূষণের উৎস নিয়ে চলতি বছরের মার্চে একটি গবেষণা প্রকাশ করে পরিবেশ অধিদফতর ও বিশ্বব্যাংক। তাতে দেখা যায়, দেশে বায়ুদূষণের প্রধান তিনটি উৎস হচ্ছে ইটভাটা, যানবাহনের কালো ধোঁয়া ও নির্মাণকাজ। আট বছর ধরে এ তিন উৎস ক্রমেই বাড়ছে।
ঢাকার বায়ু ও শব্দদূষণ নিয়ে বন ও পরিবেশমন্ত্রী শাহাব উদ্দিন জানিয়েছেন, ঢাকা সিটিতে বায়ুদূষণের বিভিন্ন কারণ রয়েছে। তার মধ্যে তিনটি কারণ প্রধান। যাতে ঢাকাসহ সারা দেশে বায়ুদূষণের মাত্রা বাড়ছে। সেগুলো হলো ইটভাটা, মোটরযানের কালো ধোঁয়া ও যথেচ্ছ নির্মাণকাজ।
সরকারি-বেসরকারি অবকাঠামো ও বিভিন্ন কাজে সমন্বয় করা প্রয়োজন উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ইউটিলিটি সার্ভিসের কাজের জন্য সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় করতে হবে। এলিভেটেড এক্সপ্রেস-হাইওয়েসহ বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। শহরের বিভিন্ন স্থানে ভবন নির্মাণের সময় পানি ছিটানো, যন্ত্রপাতি যেখানে সেখানে ফেলে না রাখা ও নির্মাণের ক্ষেত্র নির্ধারিত বেষ্টনীর মধ্যে আছে কি না, তা দেখতে হবে। আর এ সমস্যা রোধে মূল দায়িত্ব পরিবেশ অধিদফতরের।
ঢাকা সিটি করপোরেশনের অভ্যন্তরে বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী অর্থাৎ মাটি ও বালুর একটি অংশ রাস্তায় পড়ে যাচ্ছে, যা পরে বায়ুদূষণ সৃষ্টির জন্য বিশেষভাবে ভূমিকা রাখছে। যেখানে সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। এসব বর্জ্য ও ময়লা-আবর্জনার ওপর দিয়ে যানবাহন চলাচলের ফলে বায়ুদূষণের সৃষ্টি হচ্ছে।
উন্নয়নকাজ উন্মুক্তভাবে করার ফলে শহরের বাতাসে ধুলার পরিমাণ বাড়ছে। বড় বড় অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পগুলো অর্থাৎ এলিভেটেড এক্সপ্রেস-হাইওয়ে, মেট্রোরেলসহ অন্যান্য প্রকল্প কার্যকর পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা প্রতিপালন, সময়মতো রাস্তাঘাট সংস্কার ও মেরামত এবং বিভিন্ন প্রকল্পে নিয়মিত পানি ছিটানোসহ দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।
রাজধানীর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত পাঁচ বছরের তুলনায় এখন রোগীর সংখ্যা দুই থেকে তিন গুণ বেড়েছে। শুষ্ক মৌসুমে রোগীর চাপ বাড়ে। এর একটি বড় কারণ বায়ুদূষণ বলে মনে করছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। বায়ুদূষণজনিত রোগে দেশে কত সংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, তার কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নেই। তবে চিকিৎসকেরা বলছেন, বায়ুদূষণজনিত রোগ বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে বেশি ঝুঁকির শিকার গর্ভবতী মা ও শিশুরা। অটিস্টিক শিশুর জন্ম হওয়ার একটি কারণ দূষিত বায়ু। শিশুদের জন্মকালীন ওজন কম হওয়ার একটি কারণও বায়ুদূষণ। বায়ুদূষণের কারণে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। হাঁচি-কাশি, ব্রঙ্কাইটিস, শ্বাসকষ্ট থেকে শুরু করে হতে পারে ফুসফুসের ক্যান্সার। এই ক্যান্সারের বড় কারণ দূষিত বায়ু। এ ছাড়া কিডনি ও হৃদরোগের কারণও হতে পারে বায়ুদূষণ।
পরিবেশ অধিদফতরের বায়ুমান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্যে দেখা যায়, গত চার বছর ধারাবাহিকভাবে দূষণের সময় বা দিন বাড়ছে। সাধারণত নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত রাজধানীর বাতাসে দূষণের মাত্রা বেড়ে অস্বাস্থ্যকর হয়ে ওঠে। সবচেয়ে বেশি দূষণ থাকে ডিসেম্বর থেকে ফেব্র“য়ারি পর্যন্ত। কিন্তু দুই বছর ধরে দেখা যাচ্ছে, মার্চ ও এপ্রিলের বাতাসও জানুয়ারি-ফেব্র“য়ারি মাসের মতো খারাপ থাকছে।
বছরের এই শুষ্ক মৌসুমে বক্ষব্যাধিও বাড়ে। জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক শাহেদুর রহমান খান জানিয়েছেন, কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে, শীতের সময় ছাড়া অন্য সময়েও রোগী বাড়ছে। এখন প্রতিদিন গড়ে ৮০০ থেকে এক হাজার রোগী আসছে বহির্বিভাগে। পাঁচ বছর আগে গড়ে প্রতিদিন ২০০-৩০০ জন রোগী আসত। বায়ুদূষণের কারণে নানা ধরনের রোগব্যাধি হয়। প্রাথমিকভাবে হাঁচি, কাশি, নাক-চোখ জ্বালা হতে পারে। বক্ষব্যাধির অনেক রোগ বায়ুর সাথে সম্পৃক্ত। বোঝা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে রোগী বেড়ে যাওয়ার একটি বড় কারণ বায়ুদূষণ। এ সময়টাতে বিশেষ করে শহরে ধুলাবালু বেড়ে যায়, বায়ুদূষণ বাড়ে।
বৈশ্বিক বায়ুদূষণের ঝুঁকিবিষয়ক ‘দ্য স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার-২০১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্বের যে পাঁচটি দেশের শতভাগ মানুষ দূষিত বায়ুর মধ্যে বসবাস করে, তার একটি বাংলাদেশ।


আরো সংবাদ