১৫ আগস্ট ২০২০

বিলম্বিত হতে পারে পদ্মা সেতুর কাজ

বিলম্বিত হতে পারে পদ্মা সেতুর কাজ - ছবি : সংগৃহীত
24tkt

বহুল আলোচিত স্বপ্নের পদ্মা বহুমুখী সেতুর নির্মাণকাজকে বাধা যেন ছাড়ছে না। সর্বশেষ নোবেল করোনাভাইরাস এসে কাজের গতি চেপে ধরেছে। এতে কয়েক দফা পিছিয়ে নির্ধারিত ২০২১ সালের জুনে সেতুর কাজ সমাপ্তি না হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ২০০৯ সাল থেকে গত মে পর্যন্ত সাড়ে ১১ বছরে সেতু প্রকল্পে কাজের সার্বিক অগ্রগতি মাত্র ৭৯ শতাংশ। মূল সেতুতে গত মে পর্যন্ত খরচ হয়েছে ১০ হাজার ২৯২ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। ২০১৬ সাল থেকে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারছে না প্রকল্পের কাজ। পানি প্রবাহের প্রাকৃতিক গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করার ফলে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে পদ্মা নদী অত্যন্ত খরস্রোতা বিধায় সেতুর পিলারে ঘর্ষণের ফলে ঝুঁকির শঙ্কা রয়েছে বলে আইএমইডি বলছে। পদ্মা সেতু প্রকল্পের ওপর বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক সরেজমিন প্রতিবেদনে এই তথ্য পাওয়া গেছে।

পদ্মা বহুমুখী সেতুর প্রেক্ষাপট অনুযায়ী, ২০০৭ সালে ১০ হাজার ১৬১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়া হয়। যা ২০১৫ সালে সমাপ্ত করার কথা ছিল। বিশ্বব্যাংকের সাথে জটিলতার কারণে কাজটি পিছিয়ে যায়। পড়ে বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ সত্য প্রমাণিত না হওয়ায় সরকার নিজস্ব অর্থায়নে ২০১১ সালে প্রকল্পটি শুরু করার পদক্ষেপ নেয়। তখন প্রথম সংশোধনীতে ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়ে ২০ হাজার ৫০৭ কোটি ২০ লাখ টাকায় উন্নীত হয়। সেতুর কাজ ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে শেষ করার কথা। এরপর ২০১৬ সালে আবার ব্যয় বৃদ্ধির সাথে সাথে সময়ও বাড়ানো হয়। ব্যয় ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা এবং মেয়াদ ২০১৮ সালের ডিসেম্বর করা হয়। তাতেও কাজ শেষ না হওয়ায় ব্যয় বাড়িয়ে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি ১৯ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয় ২০১৮ সালে। পরে বিশেষ সংশোধনী এনে মেয়াদ আরো তিন বছর বাড়িয়ে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। 

আইএমইডির জুন মাসে দেয়া প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের মে পর্যন্ত প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ৭৯ শতাংশ। এখানে মূল সেতু ভৌত অগ্রগতি ৮৮ দশমিক ০৮ শতাংশ এবং আর্থিক ৮৫ শতাংশ। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯০ দশমিক ৪৮ শতাংশ। নদী শাসনের ভৌত কাজের অগ্রগতি ৭৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ করতে অর্থ ব্যয় হয়েছে ৫৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ। আর মাওয়া ও জাজিরা অ্যাপ্রোচ সড়ক এবং সার্ভিস এরিয়া-২ এর কাজ সমাপ্ত হয়েছে। প্রকল্পের উদ্দেশ্য পদ্মা নদীর ওপর মাওয়া-জাজিরা প্রান্তে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে রোড কাম রেল সেতু নির্মাণ করা। এখানে ৩ দশমকি ৬৮ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট যুক্ত হবে। ১৪ কিলোমিটার নদী শাসন, টোল প্লাজা ও জনসাধারণের সুযোগ-সুবিধার জন্য ভৌত স্থাপনাসহ ১২ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণ ও ভূমি অধিগ্রহণ। 

জানা গেছে, মূল সেতুর মূল্যবৃদ্ধি করা হয় তিন হাজার ৭৭২ কোটি ৩৩ রাখ টাকা, নদী শাসনের কাজের মূল্যবৃদ্ধি পায় পাঁচ হাজার ১২ কোটি ২৯ লাখ টাকা, মাওয়া প্রান্তে অতিরিক্ত ১.৩০ কিলোমিটার নদী শাসনের জন্য ৫০০ কোটি টাকা। কনস্ট্রাকশন সুপারভিশন পরামর্শক খাতে ব্যয় বেড়ে হয় ৫২১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। পুনর্বাসন ব্যয় ৯১ কোটি ৫৪ রাখ টাকা বৃদ্ধি পায়। মূল সেতুর পিলার নিরাপত্তা, ৪০০ কেভিএ বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণ, সার্ভিস এরিয়া-২ এবং সংযোগ সড়কের জন্য অতিরিক্ত ৩৬৪ কোটি ৯৪ হেক্টন জমি অধিগ্রহণ ও ড্রেজিংয়ের জন্য ৪০.৮৩ হেক্টর জমি রিকুইজিশন করার ফলে ব্যয় বাড়ে। 

পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৫ সাল থেকেই প্রতি বছর নদী শাসনের অগ্রগতি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম ছিল। ২০১৭ ও ২০১৮ সালে নদী শাসনকাজে অগ্রগতি কম। ঠিকাদারের ব্যবহৃত কর্মপদ্ধতি, রক ডাম্পিং বার্জগুলোর নিয়ন্ত্রণের জন্য ছোট এক্সকেভেটর ব্যবহার, ড্রেজার ডাম্পিং বার্জসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতির স্বল্পতার কারণে ২০১৭ সালে ৫৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৪ দশমকি ৭০ শতাংশ কম অগ্রগতি হয়। আর ২০১৮ সালে ৮৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৪২ দশমিক ০৫ শতাংশ কম অগ্রগতি হয় নদী শাসনে। ২০২০ সালে মে মাস পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রা ৯৭ দশমিক ৯৭ শতাংশের বিপরীতে অর্জন হয় ২২ দশমিক ১৩ শতাংশ কম। মে পর্যন্ত নদী শাসনে খরচ হয়েছে পাঁচ হাজার দুই কোটি টাকা। অর্জন না হওয়ার কারণগুলো হলোÑ ড্রেজার ঘন ঘন মেরামত, সিসি ব্লকের ভয়েড ফিলিংয়ে বিলম্ব, ব্লক ডাম্পিংয়ে যন্ত্রপাতির স্বল্পতা, মালামালের স্বল্পতা, অনভিজ্ঞতা, অমনোযোগী সাইট সুপারভাইজার এবং অদক্ষ শ্রমিক। এই কাজের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো করপোরেশন লিমিটেড। যাদের চুক্তি মূল্য ছিল আট হাজার ৭০৭ কোটি টাকা। তবে মোট ৪১টি স্প্যানের মধ্যে ৩৯টির সেগমেন্ট মাওয়া পয়েন্টে নিয়ে আসা হয়। এর মধ্যে মে পর্যন্ত ৩০টি স্প্যান বসানো হয়েছে। 

মূল সেতুর রেলওয়ের জন্য মোট দুই হাজার ৯৫৯টি স্লাব অংশ প্রয়োজন। মে পর্যন্ত এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি সবগুলোরই কংক্রিটিং সমাপ্ত হয়েছে। গত ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে রেলের এই স্লাব অংশ বসানোর কাজ শুরু হয়। আজো সেই কাজ চলছে। এ পর্যন্ত এক হাজার ৪৫টি বসানোর কাজ সমাপ্ত হয়েছে। তবে কাজের গতি আশনুরূপ নয় বলে মন্তব্য করেছে আইএমইডি। 

চলমান এই প্রকল্পের দুর্বলতা হলো- প্রয়োজন অনুযায়ী জনবল নিয়োগ না করা, খণ্ডকালীন বা ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ, অর্থ ছাড়ে বিলম্ব, কাজের তুলনায় অপর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ, মালামাল ক্রয়ে জটিলতা ও দীর্ঘ সময় ব্যয়। এ ছাড়া প্রকল্পের কার্যক্রম সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিহ্নত না করা, জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত জটিলতা, বিভাগ ও মন্ত্রণালয় থেকে নিয়মিত মনিটরিং না করা, ত্রুটিপূর্ণ ডিজাইন এবং স্পেসিফিকেশন ও পরিবেশগত ঝুঁকি। 

প্রকল্প পরিচালকের তথ্যানুযায়ী, মূল সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয় ২০১৪ সালের ২৬ নভেম্বর। আর এটা শেষ করার কথা ২০২১ সালের জুনে। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাস্তব অগ্রগতি সাড়ে ৮৬ শতাংশ। নদী শাসনের কর্মপরিকল্পনা নেয়া হয় ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে এবং ২০২০ সালের জুনে তা শেষ করার কথা। কিন্তু এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি বেশ পিছিয়ে। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত হয়েছে ৭০ শতাংশ বাস্তব এবং ৫২ দশমিক ৯৮ শতাংশ আর্থিক। জাজিরার অ্যাপ্রোস সড়ক ২০১৭ সালের ২ জুনে সমাপ্ত করার কথা। সেই কাজ শেষ হয়েছে। মাওয়া অ্যাপ্রোস সড়ক নির্মাণ ২০১৬ সালের ২৬ জুলাই সমাপ্ত করার কথা। সেটিও শেষ হয়েছে। সার্ভিস এরিয়া-২ এর কাজ ২০১৬ সালের ১১ জুলাই শেষ করার কথা ছিল। সেটিও সমাপ্ত হয়েছে। 

প্রকল্পের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, ২০১৪ সালে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে বহুল আলোচিত পদ্মা বহুমুখী সেতুর কাজ শুরু করা হয়। এটি নির্মাণে মোট ব্যয় তিন দফায় বেড়ে ধরা হয়েছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা। পদ্মা নদীর মাওয়া পয়েন্টে দেশের কেন্দ্রীয় অঞ্চলের সাথে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে সড়ক ও রেল যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে মুন্সিগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী ও ফরিদপুর জেলার সাথে উন্নয়নে সরাসরি ভূমিকা রাখবে এই সেতু। এই বহুমুখী সেতুটি দক্ষিণাঞ্চলের ১৯টি জেলার সাথে ঢাকাসহ পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ স্থাপন করবে। তা ছাড়া এটি এশিয়ান হাইওয়ের সাথে যুক্ত হবে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করবে। পদ্মা সেতু সম্পন্ন হলে বাংলাদেশের জিডিপি ১ দশমিক ২৩ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আইএমইডি বলছে, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত না হওয়া, সেতুর পাইল ডিজাইন পরিবর্তনের ফলে প্রকল্পের কার্যক্রম বাঁধাগ্রস্ত হওয়া, সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়া, অধিক রক্ষাবেক্ষণ ব্যয় প্রকল্পটির দুর্বল দিক। তবে প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সমাপ্ত হবে না। নদী শাসন কাজের জন্য জাজিরা প্রান্তে অবশিষ্ট জমি ঠিকাদারকে অবিলম্বে বুঝিয়ে দিতে হবে।


আরো সংবাদ