০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৪ মাঘ ১৪২৯, ১৫ রজব ১৪৪৪
ads
`

আম্মু যখন ‘মিস’

আম্মু যখন ‘মিস’ -

আম্মু যে বছর মাস্টার্স শেষ করে চাকরিতে জয়েন্ট করলেন সে বছর আমি নার্সারিতে। আমি হয়ে গেলাম ছাত্রী, সেই সাথে লিখি আম্মু হয়ে গেলেন মিস। আম্মু আমাদের ক্লাস নিতেন কালেভদ্রে। স্কুলের ভেতর জুতার তলার আগা স্পর্শ করতেই আম্মুকে লিখি- মিস ছাড়া ভিন্ন কিছু ডাকার হিম্মত করিনি। কড়া নিষেধাজ্ঞা ছিল। আমার বা ছোট ভাইয়ের কোনো দুষ্টুমি কবজা করা হলেই আম্মুকে সালাম দেয়া হতো ক্লাসে। তিনি এসে ধরাম ধরাম করে হাতের তালুতে মেরে তক্তাফাই করে ফেলতেন! বাসায়ও আম্মুর শাস্তি জারি করা ছিল কান ধরে ৫০ বার উঠবস করা আর স্কেলের পিটুনি।
ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি স্কুল থেকে ফেরার সময় আম্মুর হাতে ব্যাগভরা আর্টপেপার-চার্ট পেপার-কালার পেপার ও সাইন পেন। সন্ধ্যা হলেই বসে যেতেন ক্লাসের জন্য রিলেভেন্ট ব্যানার বানাবেন বলে। বেগুনি রঙের বেগুন-কমলা রঙের গাজর আর সবুজ রঙের কাঁচামরিচের কাগজে রঙিন হয়ে থাকত ঘরের কালো মেঝে। কোনো দিন হয়তো থাকত মোটা হরফে ওয়ান টু। হাতের ছাপ-পায়ের ছাপ তো ডাল-ভাত; ঢেঁড়স, আলু, ঝিঙা, পটোল বাজারের কোনো সবজিই আম্মুর হাত থেকে নিস্তার পেত না। এগুলোকে এপাশ-ওপাশ করে চিড়ে রঙ মেখে কাগজে ছাপ দিয়ে দেখা হতো সুন্দর ডিজাইন বা অর্থপূর্ণ কিছু হলো কিনা। বিভিন্ন গাছের পাতা, ফুল, লাল মাটি, বীজ, মরা প্রজাপতি, কাঁটাচামচ- হেন বস্তু নেই যা দিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করে তারপর নার্সারির শিশুদের জন্য টিচিং ম্যাটারিয়াল বানানো হয়নি। হাতের কাছে যা আছে তা দিয়েই তিনি কিছু না কিছু একটা দারুণ বিষয় বানিয়ে ফেলতেন! একেক দেশের একেক রকম নার্সারি রাইম শিখতেন। গাইতেন। শেখাতেন শিশুদের। সব সময় এক প্রকার চিন্তার মধ্যে থাকতেন যে, পরের সপ্তাহে ক্লাসে অন্য রকম কী পড়ানো যায়। আমাদের ভাগ্যেও আম্মুর কাজের কিছু নমুনা থাকত। কেজি ওয়ান সময়কার স্কুলের খাতার ঘটনাটি এখনো মনে আছে। সমস্ত ক্লাসওয়ার্ক খাতার ওপর ছোট একটি বাংলাদেশের পতাকা আর সমস্ত হোমওয়ার্ক খাতার ওপর একটি ছোট টিনের ঘর আম্মু এঁকে দিয়েছিলেন যাতে আমি গুলিয়ে না ফেলি! আর আমাদের নতুন বই মানে পুরো বাসার সব পুরনো ক্যালেন্ডার দেয়াল থেকে নামিয়ে আনা আর তার উল্টো পাশের সাদা অংশ দিয়ে বই মলাট করে দেয়া। আম্মু আবার করতেন কি, রঙিন কাগজ দিয়ে ফুল কেটে মলাটের ওপর এঁটে দিতেন। সুন্দর বই দেখলে নাকি আমরা বেশি বেশি পড়ব! তখন আমাদের হতো খুশিতে কি একটা হুলস্থূল অবস্থা!
স্কুলের কোনো প্রতিযোগিতায় যদি আমি বা ভাই প্রতিযোগী থাকি তো আম্মু কখনোই সেখানকার বিচারকের প্যানেলে থাকতে চাইতেন না।
আম্মুকে শিশুরা মন দিয়ে ভালোবাসে। একদম শুরুর দিকে- সেই ২০-২২ বছরের আগের ছাত্রদের অনেকেই খুব মনে রেখেছে। এখনকার শিশুরা নার্সারি পাস করে বড় ক্লাসে চলে গেলেও নাকি ক্লাসের ফাঁকে নার্সারির ক্লাসে এসে ওদের লিখি মিসকে একটুখানি দেখে যায়। আম্মুর জীবনের মূল ঘটনাই আসলে আম্মুর লিখি মিস হওয়া। স্কুল টিচার হওয়া। এখনো আমরা শিশুদের গল্প শুনি। পিচ্চিগুলোর দুষ্টু দুষ্টু কথা- বছরের শুরুতে ক্লাসে না থেকে ওদের মায়ের কাছে যাওয়ার বাহানায় মাটিতে গড়িয়ে কান্না করা- ওদের মজার, আজগুবি আর সাংঘাতিক বুদ্ধিসম্পন্ন প্রশ্ন করা। এসব নিয়েই আমার আম্মুর জীবনের বড় অংশ। আর আম্মুর ‘লিখি মিস’ জীবন আমরা সন্তানরাও বেশ উপভোগ করি।

 


আরো সংবাদ


premium cement

সকল