২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০ আশ্বিন ১৪২৯, ২৮ সফর ১৪৪৪ হিজরি
`

রাজুর বন্যা প্রস্তুতি

রাজুর বন্যা প্রস্তুতি -

ভারতের সীমান্তবর্তী বাংলাদেশের এক অন্যতম জেলার নাম সিলেট। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপরূপ স্থান। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে সবাই প্রকৃতির স্নিগ্ধ স্বাদ নিতে ছুটে আসেন এখানে। এই শহরের একদম প্রাণকেন্দ্র সিলেট সিটির খোজারখলা গ্রাম; এখানেই বাড়ি রাজুদের। তার বাবা একজন ব্যবসায়ী আর মা গৃহিণী। সে বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান; সবে পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র হলেও বুদ্ধিমত্তায় বড়দের ছাড়িয়ে! সব কিছুতেই তার পূর্ব প্রস্তুতি থাকে। এত নিপুণভাবে সে তা সম্পন্ন করে রাখে যা সব বড়রাও করতে পারবে না। শহরের প্রাণকেন্দ্র হওয়ায় সারা সিলেট ডুবে গেলেও এসব জায়গায় বন্যার পানি আসে না বললেই চলে। এখানে বন্যা হওয়ার মূল কারণই হলো ভারতের আসামের অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত। আসাম উঁচু হওয়ায় তাদের পানি স্বাভাবিকভাবেই পাহাড়ি ঢল হয়ে সিলেট চলে আসে। সর্বশেষ ২০০৪ সালে এই এলাকার মানুষ বন্যা দেখেছিল। এরপর যতই বন্যা হোক এদিকে পানি আসেনি কিন্তু এ বছর বাংলা ঋতুর শুরু থেকেই বন্যার আশঙ্কা করা হচ্ছিল। আগে অনেকবার এমন শুনলেও এদিকে পানি না আসায় কেউই তাতে কর্ণপাত করেনি। হঠাৎ শুরু হলো তুমুল বৃষ্টি, টানা কয়েকদিনের ভারী বর্ষণে দেখা দেয় বন্যা পরিস্থিতি। তবুও কারো টনক নড়ে না, ব্যতিক্রম ছিল কেবল রাজু। সে তার প্রয়োজনীয় সব কিছু গোছাতে শুরু করে। সবাই তাকে নিয়ে হাসাহাসি করে। মা-বাবাও হালকা বকা দেয়। পানির পরিমাণ বাড়তে থাকে, শুরু হয় বন্যার ভয়াবহতা; চারদিকে কান্নার রোল। ডুবে যায় পুরো সিলেট কিন্তু তাদের এলাকায় পানি প্রবেশ না করায় আবারো বেঁচে যায় তারা। ধীরে ধীরে সব কিছু স্বাভাবিক হতে শুরু হলো, মানুষ বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে যুদ্ধ করে যাচ্ছে। রাজুও তার সব কিছু আবার ঠিকঠাক করে ঘরে রাখল। সবার মুখ থেকে বন্যার কথা হারিয়ে যাচ্ছিল। ঠিক এমন সময় আচমকা আবার শুরু হলো অতিভারী বৃষ্টি, টানা তিন দিনের বৃষ্টিতে অবস্থা আগের চেয়েও ভয়াবহ হয়ে দাঁড়াল। যা কেউ ভাবেনি তাই হলো, পুরো সিলেট আবার বন্যায় তলিয়ে গেল। তখনো যেন মৃত্যুপুরীর আসল থাবা বাকি ছিল। শুক্রবার পানি ঢুকে গেল রাজুদের গ্রামে, চারদিকে মোটামুটি হাঁটু পানি; তবে সবার ঘরে উঠেনি। রাজু তার সব কিছু পুরোপুরি গুছিয়ে নেয়। কেউ কল্পনাও করেনি, আগামীকাল কী ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে। পরের দিন শনিবার মাত্র ৩ ঘণ্টার বৃষ্টিতে পানি দ্বিগুণ হয়ে গেল, প্রতিটি ঘরে পানি উঠল। রাস্তাঘাট কোমর থেকে বুক সমান পানিতে তলিয়ে যায়। মৃত্যু আর বিপদ কী জিনিস সবাই যেন নিজ চোখে দেখতে পারে। সব মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ে, নিজে বাঁচবে না সন্তানদের বাঁচাবে আর না খাবারের ব্যবস্থা করবে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বিদ্যুৎ নেই, নেটওয়ার্ক নেই; কারো ফোনে কল যায় না। যে যেদিকে পারে প্রাণ নিয়ে পালায়। আপনজনেরাও কেউ কাউকে চেনে না, সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। বুক পানি মাড়িয়ে পাশের বাড়ির খবর নেয়াও সম্ভব ছিল না। কেউ যদি মরে পড়ে থাকে তাও জানার কোনো উপায় নেই! মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখে রাজুর পরিবার। ছোট্ট এই শিশুর কাছ থেকে অনেক কিছুই শিখে নেন তারা। এতটুকু ছেলে দেখিয়ে দেয়, ধৈর্য কি? নিজ কাজের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কি? সময়ানুবর্তিতা কি? শেষমেশ যারা তাকে নিয়ে হাসাহাসি করেছিল, তারাই তাকে স্যালুট জানাতে থাকে আর নিজেদের প্রতি ধিক্কার দিয়ে বলে, ‘আজ যদি আমরাও তার মতো পূর্ব প্রস্তুতি নিতাম, তবে এতটা ক্ষতির সম্মুখীন হতে হতো না।’
পরিশেষে বলা যায়, শেখার শেষ নেই। ছোট বা বড়, যে কারো কাছ থেকেই শেখা যায় এবং কখনোই অন্যকেও হেয় করা, তার কাজকে ছোট করে দেখা উচিত নয়।

 


আরো সংবাদ


premium cement