০৭ জুলাই ২০২২, ২৩ আষাঢ় ১৪২৯, ৭ জিলহজ ১৪৪৩
`

এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

এক উজ্জ্বল নক্ষত্র -

আমাদের দেশ সবুজের দেশ, নদীর দেশ, ফসলের দেশ ও প্রকৃতির দেশ বলেই কবির দেশ। বাংলায় অনেক কবি রয়েছে তবে আমাদের জাতীয় কবি, বিদ্রোহী কবি, প্রেমের কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ, ইংরেজি ১৮৯৯ সালের ২৫ মে বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ফকির আহমদ ও মা জাহেদা খাতুনের ঘরে দুখুমিয়ার জন্ম। আট বছর বয়সে কবির বাবা মারা গেলে চাচার কাছে থাকেন। তার শিক্ষাজীবন শুরু হয় গ্রাম্য মক্তবের মধ্য দিয়ে। তার চাচাই তাকে আরবি ও ফারসি শেখান। আট বছর বয়সেই তিনি লেটো গানের দলে যোগ দেন। তারপর আসানসোলের এক রুটির দোকানে পাঁচ টাকা বেতনে কাজ নেন। সেখানে পরিচয় হয় ত্রিশালের এক দারোগার সাথে। তার প্রতিভার পরিচয় পেয়ে ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশালের এক দারোগা তাকে স্কুলে ভর্তি করে দেন। ১৯১৬ সালে কবি যখন আসানসোল হাইস্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্র তখন ইউরোপে প্রথম মহাযুদ্ধ শুরু হয়। কাউকে কিছু না বলে তিনি সেনা দলে যোগ দেন। বাংলাদেশকে স্বাধীন করার জন্য উৎসাহ জুগিয়েছে কবির গান ও কবিতা। তার গান কবিতায় মানুষের কথা আছে, সাম্যের কথা আছে, ইসলামের কথা আছে। তিনি তার কবিতা ও গানে জাতির মনের কথা ব্যক্ত করেছেন। অসহায় মানুষের মনে চেতনাবোধ জাগিয়ে তোলার জন্য তিনি বিদ্রোহী হয়েছিলেন। তিনি অনাচার, অবিচার ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে ছিলেন। তিনি প্রেম নিয়ে লিখেছেন অনেক কবিতা, গান। তাই কবিকে প্রেমের কবিও বলা হয়। জাতিকে দিয়েছেন বিদ্রোহী কবিতা, সাম্যের কবিতা। তাই তিনি জাতীয় কবি, বিদ্রোহী কবি, প্রেমের কবি। নজরুল শুধু শিল্পী-সুরকার, গীতিকার, কবি, উপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, শিশুসাহিত্যিক, সম্পাদক ও আপসহীন সৈনিকই নন।


তিনি ছিলেন সেকালের শক্তিধর এক কলমযোদ্ধা। তার লিখনীতে ফুটে ওঠেছে বিদ্রোহী মানুষের চাওয়া-পাওয়া। কবি তার ক্ষুরধার লিখনীর মাধ্যমে অন্যায়, জুলুম ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তোলেন; যা ভারতবর্ষে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি ও তাদের অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে ছিল বজ্রের ন্যায় কঠিন, ‘হিরার’ চেয়ে ধারালো। তিনি সর্বপ্রথম এই উপমহাদেশের মজলুম মানুষকে সরাসরি ব্রিটিশের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন। কলমযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। দৃপ্তকণ্ঠে তিনিই সর্বপ্রথম বাঙালি কলমসৈনিক যিনি উচ্চারণ করেছিলেন, ‘কারার ঐ লোহ কপাট/ভেঙে ফেল কর রে লোপাট/রক্ত জমাট/শিকল পূজায় পাষাণ বেদি/ওড়েও তরুণ ঈশান/বাজা তোর প্রলয় বিষাণ/ধ্বংস নিশান/উড়ুক প্রাচীর/প্রাচীর ভেদি। তিনিই পরাধীনতার শিকল ভেঙে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছেন জাতিকে। তার জাগরণী ও বিদ্রোহী কবিতা, লাথি মার ভাঙরে তালা/যত সব বন্দি-শালায়/আগুন জ্বালা ফেল উপাড়ি। ‘এই শিকল পরা ছল মোদের এই শিকল পরা ছল/এই শিকল পরেই শিকল তোদের করব রে বিকল’। বল বীর, চির উন্নত মম শির। বা মহাবিদ্রোহী রণক্লান্ত/আমি সেই দিন হবো শান্ত, এমন সাহসী কাব্য লেখনীর মাধ্যমে এ দেশবাসীকে জাগিয়েছেন। শুধু বড়দের জন্যই নয়, কাজী নজরুল ইসলাম ছোটদের জন্যও লিখেছেন। যেমন- প্রভাতী, ঝিঙেফুল, মা, আমি হব, সংকল্প, খুকি ও কাঠবেড়ালি, লিচুচোর, ঈদের চাঁদ, চল চল চল, শিশু সওগাত ইত্যাদি। বড়দের জন্য লিখেছেন- বিদ্রোহী, কামাল পাশা, খেয়াপারের তরণী, মোহররম, আজ সৃষ্টিসুখের উল্লাসে, সাম্যবাদী, জীবন বন্দনা, যৌবনের গান ইত্যাদি। তার অসাধারণ প্রতিভা, সংগ্রামী চেতনা, দুর্জয় সাহস ও কাব্য প্রতিভা আমাদেরকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করে। ‘অগ্নিবীণা’ ও ‘ভাঙ্গার গান’ তার অন্যতম কাব্যগ্রন্থ। ইসলামী কবিতা ও গান ছাড়াও তার গল্প, উপন্যাস ও নাটক আজ আমাদের শ্রেষ্ঠ সম্পদ।
তিনি বিদ্রোহী কবিতা লিখে কারাবরণ করেছেন। কবির লেখনীতে রয়েছে ঝাঁঝালো একটা ভাব। তিনি বড়দের জন্য যেমন লিখেছেন ছোটদের জন্যও লিখেছেন। বাংলার ইতিহাসে তিনি যেসব রচনা সৃষ্টি করে গেছেন তা চিরকাল বেঁচে থাকবে স্বমহিমায়।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু কবিকে কলকাতা থেকে দেশে আনেন। পিজি হাসপাতালে দীর্ঘদিন চিকিৎসা দেন। ৩৪ বছর অসুস্থ থাকার পর ১২ ভাদ্র ১৩৮৩ বঙ্গাব্দ, ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট বাংলাদেশের জাতীয় কবি, বিদ্রোহী কবি, মানবতার কবি, আমাদের প্রিয় কবি মৃত্যুবরণ করেন। এখনো তিনি অসহায় মানুষের সংগ্রামী চেতনার প্রেরণা হয়ে বেঁচে আছেন, তার লেখনীর মাধ্যমে আমাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল।

 


আরো সংবাদ


premium cement