০৬ জুলাই ২০২২, ২২ আষাঢ় ১৪২৯, ৬ জিলহজ ১৪৪৩
`

বাবার মায়া চোখ

বাবার মায়া চোখ -

চার আনা আর আট আনার যুগ পালিয়ে গেছে সেই কবে! গ্রীষ্মের ঠা ঠা রোদে পোড়া দিনে একজন বৃদ্ধ ফেরিওয়ালা আইসক্রিম নিয়ে আসত মাথায় চাপিয়ে। আমরা মায়ের কাছ থেকে চার আনা অথবা আট আনার পয়সা নিয়ে ছুটে যেতাম আইসক্রিম কিনতে। সেই চার আনা আদায় করতে কত যে বাহানা করতে হতো। কখনো কখনো মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে কান্নাকাটি করতে হতো। আইসক্রিম খেলে ঠাণ্ডা লাগবে বলে বারবার সতর্ক করতেন আম্মা। কিন্তু কে শোনে কার কথা? আম্মার কাছ থেকে পয়সা খসিয়ে নেয়ার জন্য অত তালবাহানা করলেও সেই পয়সা আইসক্রিমওয়ালার হাতে তুলে দিতে আমার গায়ে লাগত না মোটেও। দ্রুত ছুটে গিয়ে তার হাতে তুলে দিতাম, আর অপেক্ষা করতাম আইসক্রিম হাতে পাওয়ার। আইসক্রিমের বাক্সের গায়ে লেখা থাকত ‘শাহীন আইসক্রিম মিল’। বৃদ্ধ ফেরিওয়ালা বাক্স খুলতেই অন্দর থেকে বেরিয়ে আসত সাদা কুয়াশার মতো ধোঁয়া। আমি অবাক হতাম, সেই কখন বানিয়েছে আইসক্রিমগুলো, অথচ এখনো ধোঁয়া উঠছে- শীতল ধোঁয়া।
আমাদের গ্রামের পূর্ব দিকে জেগে ওঠা বিল তখন পানির দেখা পাচ্ছে দিন দিন। যতদূর চোখ যায়, শুধু সবুজ শ্যামল ফসলের মাঠ। সেই মাঠ সবুজ ফসলের মাঠ পেরিয়ে গেলে একটা গ্রাম। সেই গ্রামের বুক চিরে বয়ে গেছে বিশাল গাঙ। গ্রামটা দুই থানার মাঝামাঝি। একই গ্রাম দুই থানায় ভাগ করেছে গাঙটা। গাঙের এপার-ওপার মিলিয়ে বসত এক বিশাল বৈশাখী মেলা। মেলার নাম আমরা জানতাম উত্তরবাহানি মেলা। বৈশাখ মাস এলেই বৈশাখী মেলা মেলা একটা আমেজ পড়ে যেত দুই থানার ভেতর। কী এক অদৃশ্য আনন্দের জোয়ার যে বয়ে যেত আমাদের ছোটদের মাঝে! আমি তখন আইসক্রিম না খেয়ে টাকা জমাতাম মেলার জন্য।
একটা পুরনো ক্যালেন্ডার বহুদিন ঝুলে ছিল আমাদের ঘরের দরজার পেছনটায়। শৈশবের কয়েক বছরে সেই ক্যালেন্ডার আমি বহুবার পড়েছি। অবশ্য ওই বয়সে অক্ষর মিলিয়ে মিলিয়ে বানান করে দু’চার লাইন বাংলা পড়া ছাড়া ক্যালেন্ডারের ক-ও বুঝতাম না। মূলত ক্যালেন্ডারের পাশাপশি যেসব প্রয়োজনীয় বিষয় তুলে দিত, সেসব বাংলা আমি মূর্খের মতো বারবার বানান করে পড়তাম। একবার চোখ পড়ল মোটা ফন্টে লেখা তিন শব্দের একটি শিরোনামের ওপর। শিরোনামটা এমন- ‘সরকারি ছুটির দিনসমূহ’। ক্যালেন্ডারের সেই সরকারি ছুটির তালিকায় খুঁজে পেলাম বৈশাখী ছুটির দিন। এভাবে লেখা ‘১ লা বৈশাখ।’ এটার মানে যে পয়লা বৈশাখ, সেটা তখনো আমার বোধগম্য ছিল না। আমি উচ্চারণ করে পড়তাম ‘একলা বৈশাখ’। শৈশবের সেসব দিনে সত্যিই আমার খুব একলা লাগত। সমবয়সী বন্ধুর তালিকায় তেমন কেউ ছিল না। একজন খেলার সাথীর জন্য মন কেমন করত। আমার খুব খারাপ লাগত।
সেবার উত্তরবাহানি মেলার দিন এলে আমার আনন্দের সীমা ছিল না। সকাল থেকে অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় বসে আছি কখন আব্বার কাজবাজ শেষ করে আমাদেরকে মেলায় নিয়ে যাবেন। খালার বাড়ি থেকে এসেছে খালাতো ভাই ফরহাদ ও তার ছোট বোন শাহনাজ। দুজনেই আমার থেকে বয়সে ছোট। শাহনাজকে আমরা ডাকতাম ‘নাহানু।’ শাহনাজের এই চার অক্ষরের নামকে তালিল করে তিন অক্ষরে ‘নাহানু’ করেছে তার দাদী। শুধু তারই নয়, সব নাতি-নাতনীদের নামই তিনি সংক্ষিপ্ত করেছেন। সবার বড় সেতারা আপুর নাম সংক্ষিপ্তাকারে সেতু এবং ফরহাদের নাম সংক্ষিপ্তে ‘ফরো’ করেছেন। তবে ওই সময়ে নাহানু নামটাই যেন আমাদের সবার কাছে অধিক জনপ্রিয় ছিল। সেবার নাহানুরা আমাদের বাড়িতে এলো। আমাদের সাথে মেলায় যাবে বলে। তারা সেবার প্রথম মেলায় যাবে। খালুজান মেলায় যান না, বিষয়টি এমন নয়। মেলায় যান, কিন্তু ছেলেমেয়ে কাউকেই সাথে নিয়ে যান না। তারাও ছোট ছোট, একা যেতে পারে না। তাই আমাদের এখানে এসেছে আমাদের সাথে মেলায় যাবে।
জোহরের পরপর আব্বা আমাদের নিয়ে মেলার দিকে রওনা দিলেন। আমরা চারজন- ফরহাদ, শাহনাজ, আমি ও আমার বড় ভাই আনোয়ার হোসেন। আনোয়ার ভাই বড় হলেও বয়সের দূরত্ব খুব বেশি না। আমরা হেঁটে যাচ্ছি ক্ষেতের আলপথ ধরে। দুই পাশের ধানগাছের পেট চিরে বেরিয়ে আসা ধানের শীষেরা যেন আমাদের সাথে হেলেদুলে খেলা করছে। আমরাও দুই হাত দু’দিকে মেলে ধরে খেলতে খেলতে অগ্রসর হচ্ছি মেলার দিকে। চোখমুখে লেগে যাচ্ছে ধানের সাদা সাদা পরাগ। মাথার কালো কেশে সেসব পরাগ যেন ফুলের মতো দেখাচ্ছে। মেলা থেকে নানা ধরনের, নানা বাঁশির সুর ভেসে আসছে। সেই মুগ্ধকর সুর ক্রমেই বাড়তে থাকে। আমরা একেকটা নিষ্পাপ ফুল খেলা করতে করতে মেলায় যাচ্ছি- উত্তরবাহিনী মেলায়।
চরপাড়ার ঈদগাহ মাঠ আর উঁচু দেয়ালে বাউন্ডারি করা গোরস্তান পেরিয়ে গিয়ে যখন গাঙের কাছাকাছি পৌঁছলাম, দৃশ্যমান একটি কাঁচা বাঁশের সাঁকো জনমানুষের ক্রমাগত যাওয়া-আসায় নড়বড় করছে। ভেবেছিলাম হাঁটুপানি হবে, হেঁটে হেঁটে পার হয়ে যাব। এই গাঙ যতবারই দেখেছি, ততবারই আমার কেবল মনে পড়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা কবিতা-
আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে
বৈশখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে,
পার হয়ে যায় গরু, পার হয় গাড়ি
দুই ধার উঁচু তার, ঢালু তার পাড়ি।
এই গাঙটাও ঠিক তেমনই। ছোট নদী। উঁচু উঁচু দুই ধারে কাশবন না থাকলেও পাড় ঘেঁষে সটান দাঁড়িয়ে আছে বিশাল বিশাল গাছ। সবুজ পাতায় মাথা ভরা গাছের। কি যে সুন্দর লাগছিল! কিন্তু এবার আর হাঁটু পানি নেই। বড়দের এক মানুষ অনায়াসে তলিয়ে যাওয়ার মতো পানি হয়েছে। প্রবল স্রোত। আনোয়ার ভাই সাঁকো বেয়ে তরতর করে পার হয়ে গেলেন একা একাই। আমরা ছোটরা দাঁড়িয়ে আছি। আব্বা আমাদের একজন একজন করে পার করছেন। তারপরই মেলা। আমাদের ছোট ছোট কোমল হৃদয়ে অপেক্ষা আর ধরে না। দ্রুত ছুটে যেতে চাই। কিন্তু আব্বার কড়া নির্দেশ তার হাত যেন ছেড়ে না যাই কোনোভাবেই। একবার হারিয়ে গেলে এত মানুষের ভিড়ে কিভাবে খুঁজে পাবে? আব্বুর হাত ধরে ধীরে ধীরে এগোচ্ছি মেলার দিকে নয়, যেন ঢুকে যাচ্ছি অলীক স্বপ্নের ভেতর।
লাল নীল হলুদসহ হরেক রঙের বেলুন হাওয়ায় ফুলিয়ে সুতো দিয়ে বেধে রাখা হয়েছে দোকানে দোকানে। বেলুনগুলো কী উদ্ভুত! একটু ছুঁয়ে দিলেই দূরে সরে যায়। আমি না ছুঁয়ে টোকা মারতাম। আরো বসেছে হরেক রকম জিনিসের দোকান। মাটির হাড়িপাতিল, মাটির ঘোড়া, গরু। গরুর পেছনের দিকের ওপর দিয়ে পয়সা ঢোকানোর মতো ছিদ্র। অনভিজ্ঞ আমি সবিস্ময়ে জানতে পারলাম ওই গরু মূলত টাকা জমানোর ব্যাংক। ব্যাংক মাটি দিয়ে ফুটবলের মতো গোল করে উপরের দিকে মসজিদের গম্বুজের মতো করে বানায় জানতাম, কিন্তু গরু দিয়েও যে ব্যাংক বানানো যায়, সেটা সেবারই প্রথম জানতে পেরেছিলাম। দেখেছিলাম প্লাস্টিকের তৈরি শুঁড়ওয়ালা হাতি, রেলগাড়ির বগির মতো জোড়া লাগানো জোড়া লাগানো প্লাস্টিকের সাপ। নিতান্তই নি®প্রাণ। তবু প্রথম প্রথম ছুঁতে গেলে কেন যেন ভয় ভয় লাগত। বিষাক্ত ছোবলের ভয়। ছোট থেকেই সাপের ভয় অন্তরে ঢুকিয়ে দেয়ার কারণেই কি ওই প্লাস্টিকের সাপকে প্রথমে বিষাক্ত মনে করে ভয় পেয়েছিলাম?
আব্বা আমাদের নিয়ে গেলেন খাবারের দোকানগুলোর দিকে। মিষ্টির ঘ্রাণে ম ম করছিল ওখানটায়। দেখতেই যেন জিব থেকে জল খসে পড়ার অবস্থা। আব্বা দোকানদারকে বললেন আমাদের মিষ্টি দিতে। আনলিমিটেড। যত খুশি খেতে পারো। অবশ্য সেদিন বেশি মিষ্টি খেতে পারিনি- দুয়েকটা খেয়েই যেন মুখ মেরে এসেছিল। কথায় আছে ‘বেশি ভালো, ভালো নয়’। বেশি মিষ্টি খেতে পারব না জেনেই কি আব্বা সেদিন আমাদের জন্য মিষ্টি আনলিমিটেড করে দিয়েছিলেন? সে যাই হোক- তারপর আমরা গেলাম ভিন্নরকম এক মিষ্টির দোকানে। হাজ মিষ্টি। দেখতে বাতাসার মতো সাদা। বাতাসার মতোই চিনি গলিয়ে বানানো। তবে তা বাতাসার মতো চ্যাপ্টা আর গোল নয়। হাজ মিষ্টি মূলত পশুপাখির মূর্তি। হাতি ঘোড়া, এমনকি মানুষেরও মূর্তিও বানানো হতো হাজ নামে। আব্বা আমাদের আবদারে হাজ মিষ্টি কিনলেন। সাথে ভাজা কলাই। যেই কলাই চিবিয়ে খেতে গিয়ে আমাদের দাঁত ভাঙার অবস্থা হতো।
মেলা উপলক্ষে কাঠের ফার্নিচারের বাজার বসেছে এক দিকে। আব্বার সাথে সেসব সৌখিন ফার্নিচার দেখতে গেলাম। খাট, শোকেস, আলমারি এমনকি কাঠের চেয়ার টেবিলও মেলায় উঠেছে। পাশেই দেখি কতগুলো লোক একজায়গায় ভিড় করেছে। আব্বাকে টেনে নিয়ে গেলাম। সেখানে গিয়ে এক ঝলক তাকিয়েই অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল। একজন ছেলে পড়ে আছে। বয়স কত আর হবে, এই ১৭-১৮ বছর। ছেলেটার নাক-মুখ দিয়ে রক্তবমির মতো রক্ত বের হচ্ছে। আমার খুব মায়া হলো। ছেলেটা মারা যাচ্ছে অথচ কেউ তাকে ধরছে না। আমার খুব কান্না পাচ্ছিল। একজন লোক ভিড়ের মাঝখানে ঘুরছে আর বলছে ‘আপনারা টাকা না দিলে ছেলেটা সত্যি সত্যি মারা যাবে’। লোকটার কথা শুনে অনেকই টাকা দিচ্ছে। কিন্তু আব্বা টাকা দিচ্ছেন না। আমি দিতে বললাম। আব্বা কানে কানে বললেন ‘এইগুলা ভুয়া, ম্যাজিক দেখাচ্ছে, ভেলকি এইসব।’
সবার সবকিছু কেনাকাটা শেষ হয়ে গেলে তখন আমাদের বাড়ি ফেরার পালা। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। সবার সবকিছু কেনা হলেও আমার তখনো কিছুই কেনা হয়নি। মেলা থেকে পাশে চলে এসেছি আমরা। আব্বা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন কিছু কিনব কি না। আমি বললাম ‘আমাকে একটা লাল রঙের রিমোটের গাড়ি কিনে দিন’। তখন শিশু মনে শিশু শিশু স্বপ্ন- আমার একটা লাল গাড়ি হবে, যা রিমোট দিয়ে কন্ট্রোল করা যাবে। রিমোটের গাড়ি তখন সম্ভবত নতুন নেমেছে। দামও অনেক বেশি। আব্বা পকেট থেকে টাকা বের করে হিসাব করে দেখলেন রিমোটের গাড়ি কেনার মতো টাকা তার কাছে অবশিষ্ট নেই। আমি আব্বাকে বললাম ‘চলেন বাড়ি চলে যাই, লাগবে না গাড়ি। আরেকবার কিনব নে।’ আব্বার চোখে যেন পানি টলমল করছে। আরেকটু হলেই যেন বেরিয়ে আসবে, গড়িয়ে পড়বে কপোল বেয়ে। আনোয়ার ভাইকে বললেন ‘ওদের নিয়ে এখানেই দাঁড়া, আমি আসতেছি’। বলেই আব্বা মানুষের ভিড়ে কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর ফিরে এলেন। আব্বার হাতে একটা লাল গাড়ি। রিমোটের নয়, তবে ব্যাটারির। দু’টি পেন্সিল ব্যাটারি দিয়ে পরিচালিত হয় সেই গাড়ি। কি যে আনন্দ লাগছিল আমার ভেতরে ভেতরে! গাড়ির জন্য নয়, সেদিন আব্বার চোখে আমি মায়া দেখেছিলাম। কঠিন মায়া। আজ বহুদিন পর আব্বার কিনে দেয়া আমার সেই লাল গাড়িটার কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে আব্বার মায়া চোখ।

 


আরো সংবাদ


premium cement