১৯ অক্টোবর ২০২১, ৩ কার্তিক ১৪২৮, ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩ হিজরি
`

জীবনের বাঁকে বাঁকেv

-

মোটামুটি শ’খানেক ট্রাকের ইয়া লম্বা সারির মাঝে আছে রাহাত আর মেহরীন। পাটুরিয়া ঘাটে এরকম একটি বড় জ্যাম হবে জানা কথা। জ্যাম কখন ছাড়বে আর কখন তারা ফরিদপুর গিয়ে পৌঁছবে আল্লাহ মালুম! এ বিষয়ে মেহরীনকে বলা হয়েছিল বহুবার। ও তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছে! বলেছে জ্যামের সে খ্যাতা পুড়ি। দুনিয়াবি যাবতীয় বিপত্তিকে তুচ্ছ করে এক জীবনে সে আট চাকার ট্রাক জার্নি করতে চায়। তাও আবার একদম সামনে, ট্রাক ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে। আর এরকম সুযোগ তো বারবার আসে না। ছোট ফুপুরা ঢাকা থেকে তল্পিতল্পা গুটিয়ে ফরিদপুর চলে যাচ্ছেন। ট্রাক বোঝাই করে ফার্নিচার যাবে সেখানে। সাথে যেতে হবে রাহাতকে। আর এই সুযোগে মেহরীনও যাবে ওর সাথে।
এখন ট্রাক ড্রাইভারের পাশে বসে তারা দু’জন খ্যাতা পুড়ছে। অনাদিকাল ধরে চলতে থাকা এই জ্যাম ছুটে যাওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। তাও ভাগ্য ভালো আজকে তেমন একটা গরম নেই। আকাশ ভরা ঘন মেঘ আর একটু পরপর ধুড়ুম ধুড়ুম বাজ পড়ে যাচ্ছে। সমূহ সম্ভাবনা আছে আরেকটু পর ধুন্ধুমার বৃষ্টি পড়ার। এই অবস্থাতেও মেহরীন বেশ আনন্দ পাচ্ছে। জানালার পাশে বসে রাতের আঁধারে কুচকুচে কালো গাছপালা দেখছে। রাহাত বসে আছে মাঝে আর ড্রাইভার নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে পান চিবুচ্ছে।
এই ড্রাইভার ভাই, কেক খাবেন?
মেহরীন রাস্তায় খাওয়ার জন্য চুলার ওভেনে একটা কেক বেইক করে এনেছে। হ্যান্ড ব্যাগ থেকে বক্স বের করে ও সামনে রাখল। এত আগ্রহ নিয়ে আয়োজন করে ট্রাক জার্নি করা যায় রাহাত কখনো ভাবেনি।
তো ম্যাডাম, ভালো লাগে তো? এতদিনের ইচ্ছা পূরণ করিয়ে দিলাম।
রাহাতের কপালের ভাঁজে দুষ্টুমি আর হালকা বিরক্তি দেখা যাচ্ছে।
এখনই বলতে পারছি না। পুরো ঘটনাটা সুন্দরমতো শেষ হোক। তারপর তোমাকে রিভিউ দেবো।
মেহরীন জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। রাত বাজে ১২টা ৪৫। বাসায় থাকলে এতক্ষণে ঘুমিয়ে কাদা হয়ে যেত। একটি দুটি স্বপ্ন দেখে ঘুমের ভেতর টুকটাক কথা বলে উঠত। অথচ আজকে সে দিনের আলোর মতো জ্বলজ্বলে।
একটু একটু করে ট্রাকগুলো চলতে শুরু করল। মেঘগুলো হালকা হতে শুরু করল। অল্প অল্প বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল।
তুমি আছ বলে মৌন কথোপকথন
তুমি আছ বলে পৃথিবীটা লাগে আপন...
কথা নেই বার্তা নেই মেহরীন একটি গান ধরেছে। নিভুু নিভু গলা করে সে গাইছে। জানালা বন্ধ করা হয়নি বিধায় গুড়িগুড়ি বৃষ্টির কণা চোখ-মুখ ভিজিয়ে দিচ্ছে। মেহরীন এক বুক আবেগ নিয়ে গান গাচ্ছে! এদিকে ট্রাক ড্রাইভার যে বিশদ বিনোদন পেয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। পানে জং ধরা দাঁত বের করে হিহি হুহু হেসে যাচ্ছে সে। রাহাত এ কারণেই মেহরীনকে আনতে চায়নি। এরা কেমন যেন বজ্জাত কিসিমের হয়! আর সামান্য ট্রাকে চড়ে তার বউয়ের এত খুশি হওয়ার কী আছে কে জানে! মেয়েছেলে সৃষ্টিকর্তার বড় আজব সৃষ্টি।
শুনো, এই ট্রাক জার্নির উসিলায় তোমার বিগত তিন বছর আর সামনের তিন বছরের সব ভুলচুক ক্ষমা হয়ে গেল।
মেহরীন কথাটা রাহাতের দিকে তাকিয়ে ঠুশ করে বলে আবার একই গানের প্রথম অন্তরা গাওয়া শুরু করল। রাহাত কোনো জবাব দেয়নি। ওর চোখে যে একটুখানি ঘুম লেগে ছিল তা গান আর বৃষ্টিতে ধুয়ে গেল। ট্রাকগুলো এতক্ষণে জোরে চলা শুরু করেছে। আর রাহাত ঠিক করেছে রিটায়ারমেন্টের টাকা দিয়ে সে একটা ট্রাক কিনবে। আট চাকার বড় সাইজের ট্রাক। বুড়ো বয়সটা ট্রাক চালিয়ে পার করে দেবে! আর পাশে বুড়ি মেহরীনকে বসিয়ে রাখবে। দেশে ট্রাকে চড়ে বেড়াবে। শীত-গ্রীষ্ম এমনকি এরকম রুমঝুম বর্ষায়...হ



আরো সংবাদ