১৬ অক্টোবর ২০২১, ৩১ আশ্বিন ১৪২৮, ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩ হিজরি
`

একটি সবুজ সঙ্কেতের অপেক্ষা

-

মনটা বিষণœ। চোখ দুটি ছলছল। চারদিকে বিষাদের সুর। চেনা শহরের মায়া ছেড়ে অচেনা পথে যাত্রা। নিবিড় বন্ধনে বিচ্ছেদের ঘনঘটা। ভরা উঠোনে আবারো নিস্তব্ধতার আনাগোনা। পাশের ঘরের বিছানা, খাবার টেবিলের মেজ ছেলের চেয়ার আর ব্যালকনির টবে থাকা ফুলগুলো তাদের একজন আপন সঙ্গী হারাচ্ছে। প্রতিটি ঘরের মা-বাবারা আবারো নিঃসঙ্গতার কোলে ঢলে পড়বে। দেয়ালের ভাঁজে ভাঁজে সন্তানের স্পর্শের অনুভূতি খুঁজে বেড়াবে। স্মৃতির পাতায় চেনা মুখখানি বারবার এঁকে নিঃসঙ্গতা দূর করার ব্যর্থ চেষ্টায় দিন কাটাবে।
প্রায় দীর্ঘ দু’বছর ক্যাম্পাস ছেড়ে বাসায় বসে আছি। এর মধ্যে ছয় মাস কেটেছে একদম ঘরবন্দী। লকডাউন নামক শেকলে আবদ্ধ ছিলাম। হয়তো তালাবদ্ধ দুয়ার এবার খুলে যাবে। শুরু হবে জীবনের নতুন অধ্যায়। কল্পনাও করতে পারিনি সে দিনের আসাটাই যে এত লম্বা সময়ের জার্নি হবে। মাঝখানে দেড়টি বছর কেটে গেছে। এর মধ্যে কতজনের দুঃখ-বেদনার গল্প রচিত হয়েছে; কত সহপাঠী কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। অনেকেই অধ্যয়ন জীবনের সমাপ্তি টেনেছেন। অনেকেই পা রেখেছেন নতুন জীবনে।
এসব ভাবতে ভাবতে চোখটা লেগে এসেছে। এরই মধ্যে পাশে থাকা ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে বাংলায় লেখা ‘সাঈদ, ভোলা’।
রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো, ‘ক্যাম্পাস তো খুলে দিচ্ছে, ঢাকায় আসবি কবে?’
সংবাদটা যেমন আনন্দের তেমনি কষ্টেরও বটে! এখানে যেমন আছে বিচ্ছেদের ঘ্রাণ তেমনি আছে স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস।
বহুদিন ক্যাম্পাস চত্বরে সবুজ ঘাসে গা মেশায়নি। বড় ফটক সংলগ্ন জুঁই ফুলের পাপড়িগুলো ছুঁয়ে দেখিনি। বহুদিন খোলা আকাশের নিচে নতুন কোন বইয়ের গন্ধ মাখিনি। গল্পে গল্পে কত রাত কেটে গেছে তার কোনো হিসাব রাখিনি। কখনো টেবিলে মাথা ঠেকিয়ে, কখনো মাঠের ফ্লোরে গা এলিয়ে। মসজিদের পাশে পিঠার দোকানটা খুব মনে পড়ে। রকমারি পিঠার স্বাদে সন্ধ্যার অপরূপ মিশ্রণ। দারুণ উপভোগ করতাম। যদিও মায়ের হাতের ছোঁয়ায় ওসব হার মেনে যায় নিমিষেই। কিন্তু স্মৃতি তো থেকেই যায় মনের কোণে। তাকে তো ভোলা যায় না। হাজারো চেষ্টা সত্ত্বেও আয়নার সামনে দাঁড়াতেই স্মৃতির পাতাগুলো কালো অক্ষরে ভেসে ওঠে।
সেই শৈশব থেকে কৈশোর। উঠতি বয়সের জোয়ার-ভাটা ডিঙিয়ে পরিণত যৌবনে পদার্পণ। ২৪ পেরিয়ে পঁচিশের বসন্তের হাওয়া গায়ে মাখা। প্রায় এক যুগ পর এই প্রথম এত দীর্ঘ সময় বাবা-মায়ের সাথে থাকা। তাদের সাথে কাটানো সময়গুলো সত্যিই দারুণ ছিল। ভালোবাসার চাদরে মোড়ানো ছিল প্রতিটি মুহূর্ত। কেমন যেন ছেলেবেলায় হারিয়ে গিয়েছিলাম। সেই জীর্ণশীর্ণ শাড়ির আঁচল, থালা হাতে হাজারো বায়না মেটানোর ছলে পেছন পেছন ছুটে বেড়ানো, সন্ধ্যায় কাঠের স্কেল নিয়ে পড়তে বসানো, বাবাকে লুকিয়ে দু’টাকার নোটটা পাঁচ আঙুলের ভাঁজে গুঁজে দেয়া। এসব দৃশ্য হয়তো এখন জীবন থেকে হারিয়ে গেছে। সেই শাড়ির আঁচল আর থালাটা বোধ হয় বদলে গেছে। তবে ভালোবাসাগুলো একটুও বদলায়নি। ঠিক আগের মতোই রয়ে গেছে। পেছনে ছোটার দিন হয়তো শেষ, তবে কাছে টেনে নেয়ার আকুল আবেদন এখনো ফুরায়নি। বেলা শেষে এই আদর-স্নেহ আর ভালোবাসা নিয়েই যে আমরা বেঁচে আছি।
মায়ার বাঁধন ছেড়ে আবারো জীবন সংগ্রামের পথে পা বাড়িয়েছি। বরাবর মুচকি হেসে বিদায় নিলেও এবার হাসিটা যেন চাপা পড়ে গেল বিষাদের গভীর সমুদ্রে। গেট থেকে বেরুতে মনের অজান্তেই চোখ বেয়ে দু’ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। পেছন ফিরে আর তাকাতে পারলাম না। মাটিতে দৃষ্টি নামিয়ে চাপা কণ্ঠে বললাম, ‘আসি মা, দোয়া করো!’
কী মায়া বাড়িয়ে! যেতে তো হবেই। এক মাকে ছেড়ে আরেক মায়ের কোলে ফিরে যাচ্ছি।
একটি মাত্র সবুজ সঙ্কেতের অপেক্ষা! চার কোটি সন্তান তার মায়ের বুকে ফিরে আসবে। অপেক্ষার প্রহর এবার শেষ হোক। বারান্দায় বেজে উঠুক নতুন দিনের ঘণ্টা। কালো ব্লাকবোর্ডে ছেয়ে যাক সাদা অক্ষরের বর্ণমালা। আবারো হাত ধরে, কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে কিছুদূর হাঁটতে চাই!হ

 



আরো সংবাদ