০৪ আগস্ট ২০২১
`

যে যার ভুবনে

-

শুতে যাওয়ার আগে ফোনটা এলো। যখন দাঁত ব্রাশ করছে আরোয়া। ছোট মেয়েকে ডেকে বলল ফোন ধরতে। উমারা ততক্ষণে কথা শুরু করে দিয়েছে। সাথে উচ্ছ্বসিত হাসি। ভেজা হাত তোয়ালে মুছেই মেয়ের কাছ থেকে ফোন নেয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ল আরোয়া। উমারা মোবাইল মুখের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে ফিসফিস কণ্ঠে বলল, আন্টি।
আরোয়ার কপালে ভাঁজ পড়ল। সাহিরা! আরোয়ার ফেসবুক বন্ধ। অনেক দিন যোগাযোগ ছিল না। পুরো পরিবার নিয়ে সুইজারল্যান্ড সেটেল্ড। আজ সকালেই প্রথমবার ফোন করে জানাল দেশে ফিরেছে। এরপর আর কোনো দিন বিদেশে পাড়ি জমাবে না। বিদেশের বাড়ি নাকি ঘুরতে যাওয়ার জন্য ভালো, নিজের দেশ ছেড়ে সব সময়ের জন্য বিদেশের বাড়িতে পড়ে থাকা বিরক্তিকর। কথাটা শুনে সাহিরাকে মনে মনে পাগল ভাবছিল আরোয়া। সে এ রকম প্রস্তাব পেলে যানজট আর অনিয়মের দেশ ছেড়ে কবেই পালিয়ে বাঁচত। সাহিরা পাগল না হলে কি অমন সুন্দর দেশ ফেলে চলে আসে কেউ?
এভাবে কথা চলতে লাগল সারা দিন আজ ফোনে অথবা চ্যাটের মাধ্যমে। কিন্তু রাতের ফোনে সাহিরা চমকে দিলো। সামনের শুক্রবার তার বাড়িতে যাওয়া আর রাতে খেয়ে আসার নিমন্ত্রণ করে ফেলল। আরোয়া দুই-একবার কাটাতে চাইল, কিন্তু এমন সনির্বন্ধ এবং নাছোড় সে অনুরোধ, যে কাটানো মুশকিল।
তিন দিন পর মেয়েকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছাল আরোয়া। হাসিমুখে দরজা খুলল সাহিরা। তিনি এলেন না? বলল সাহিরা।
আরোয়া বলল, অফিসের কাজে ঢাকার বাইরে আছে এখন। উমারা সাহিরার মেয়েদের সাথে অন্য ঘরে চলে গেল। আরোয়াকে বসানো হলো বাইরের ঘরে। ঘরটি গোছানো, তবে সাজানো নয়। এক গোছা ফুল, একটি ছবি, কয়েকটা উজ্জ্বল রঙের কুশনের ম্যাজিক একটা সাদামাটা ঘরের ভোল পাল্টে দিতে পারে নিমেষে। ঘর সাজানো আরোয়ার ফ্যাশন। ছেলেবেলা থেকে আরোয়া ঘর সাজাতে অভ্যস্ত। ওহাব সেসব ফিরেও দেখে না। তবু নিজের চার পাশকে যথাসম্ভব সুশ্রী করে তুলতে চাওয়ার এক আকুতি তার মধ্যে কাজ করে সব সময়ই। গাছের একটি গোলাপ আর গুচ্ছ গুচ্ছ কিছু ফুলপাতা ছিঁড়ে এনেও ঘর সাজানো যায়। আরোয়ার কাছে মনে হয় এই সামান্য বদলেই ঘর যেন ঝলমলিয়ে হেসে ওঠে। বিয়ের আগে তার গ্রামের বাড়ি জঙ্গলের ফুল লতাপাতা দিয়ে রোজ সাজিয়ে রাখত। বাড়ির লোক কিন্তু লক্ষও করত না এসবে। একজনই বলত তার চাচাতো বোন ফাতিমার খালাতো ভাই মাহফুজ। সে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা। ফাতিমাদের বাড়ি এলে আরোয়াদের বাড়িতেও আসত।
খুব খুঁটিয়ে দেখত আরোয়ার ঘর-সাজানো। পাতাবাহার, জবা আর ঘাসফুল, মাটির হাঁড়ি, রঙিন কাচের চুড়ি, কক্সবাজার থেকে কুড়িয়ে আনা কয়েকটা ঝিনুকও বাদ যেত না। সে কিন্তু সমঝদারের মতো দেখত। উৎসাহ দিত।
সাহিরা খুব হাসিখুশি মহিলা। কথা বলতে ভালোবাসে। তার হাজব্যান্ড এ ঘরে আসতে একটু সময় নিচ্ছিলেন। আরোয়া যে চেয়ারে বসেছিল সেটা ভেতরের দরজার মুখোমুখি। তার উল্টো দিকে বসেছিল সাহিরা।
আরোয়ার চোখ দু’টি দেয়ালে ছবির ফ্রেমের ভেতর একটি মধ্যবয়সী মানুষকে দেখল। তার চোখে বিস্ময়। মোটা কাচের চশমা পরা, ভারী চেহারার মানুষ। হাসি মুখ। এত বছর পরের চেহারা, তবু চিনতে ভুল হলো না। মাহফুজ!
আরোয়ার চোখ দু’টি অনুসরণ করে সাহিরা বলল, আমার হাজব্যন্ড। আর্মি থেকে অবসর নেয়ার পরের বছরের তোলা ছবি। পায়ের তলার মাটি যেন সরে যেতে লাগল। পুরো পৃথিবীটা দুলে উঠল মুহূর্তেই।
এ বাড়িতে এক সেকেন্ড বসে থাকা সম্ভব নয়। সাহিরাকে অবাক করে দিয়েই মেয়েকে সাথে নিয়ে জরুরি প্রয়োজনের কথা বলে বেরিয়ে গেল আরোয়া। সারাটা পথ অতীতের স্মৃতি ভেসে বেড়াতে লাগল। মাহফুজের সাথে প্রণয় আর বিচ্ছেদের দৃশ্যগুলো খুব নড়েচড়ে ওঠে তাদের অস্তিত্ব জানান দিলো। না! আরোয়া এসব মনে করতে চায় না। যে হারিয়ে গেছে হৃদয় চিরে এক মুহূর্ত তাকে দেখে কষ্ট বাড়াতে আর চায় না। বরং সুখেই তো আছে সবাই। সাজানো ঘর আছে। সাজানোই থাক। অজানা ক্ষত ভালো থাক।

 



আরো সংবাদ