০৪ আগস্ট ২০২১
`

প্রযুক্তি থাকবে, সঙ্গে বইও!

-

তবে কি দিন দিন পড়ার অভ্যাস কমছে? তরুণ-তরুণী, কিশোর-কিশোরীরা কম্পিউটার, ইন্টারনেট, ফেসবুক, মোবাইল আর এসএমএস কালচারে যতটা মগ্ন, সে তুলনায় তাদের বই পড়ার সময় যেন একেবারে কমে গেছে।
সময়ের সাথে পাল্লøা দিয়ে ক্রমেই প্রযুক্তির প্রতি নির্ভরতা বাড়ছে। আর যুক্তিহীন বহু প্রযুক্তির ভিড়ে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে যুক্তিবুদ্ধির রসদ জোগানো বই পড়ার অভ্যাস। সোফায় কিংবা নিজের প্রিয় বিছানায় শোয়ে যেখানে অনায়াসে দু’আড়াই ঘণ্টার একটা জমজমাট মুভি দেখা যায়, যেখানে কানের মধ্যে দুুটো ইয়ারফোন গুঁজে দিয়েই নিমিষেই শুনে ফেলা যায় অনেক প্রিয় গান, সেখানে এ যুগে বই পড়ার কষ্ট আর কে করতে চায় বলুন। তাছাড়া মুভি দেখে, গান শুনে আপনার বিনোদনের চাহিদা যেভাবে মিটছে, বন্ধুদের আড্ডায় যেখানে সাম্প্রতিক সব মুভি কিংবা গানের আলোচনায় সক্রিয় অংশ নেয়া হচ্ছে সেখানে বই পড়ে লাভটাই বা কি? আজকাল তেমন চিন্তাভাবনা পোষণ করেন অনেকেই। আবার কারো মনে এমন ভাবনার জন্ম হতে পারে যে, বই পড়াটা আসলে ওল্ড ফ্যাশনের। আজকের সময় বাস্তবতার আলোকে এসব চিন্তাভাবনা হয়তো সঠিক মনে হতে পারে অনেকের ক্ষেত্রে। তাই বলে এসব অজুহাত দিয়ে বই পড়ব না বা বই পড়ার প্রয়োজন নেই এমন ভাবাও ঠিক নয়। এমপিথ্রি, এফএম রেডিও কিংবা ডিভিডি, ইন্টারনেট, ফেসবুকের এই যুগেও মননশীল বই, গল্প উপন্যাস নতুন কিছুর সন্ধান দিতে পারে। অনেকেই হয়তো ভাবছেন অমর একুশে বইমেলা বা ফেব্রুয়ারি মাস এলেই সবাই মিলে বই পড়ার উপদেশ দেয় তাদের জন্যও বিষয়টি নতুন করে খানিকটা ভাবনার বৈকি। আপনার আশপাশে কেউ বই পড়ে না, কিংবা এখন মুভি দেখা, গান শোনা, ফেসবুকে ঢুঁ মারা মোবাইলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলা বিনোদন বা অবসর কাটানোর জন্য বেশি সহজলভ্য উপায়। এই যুক্তিতে হয়তো আপনিও সেভাবে বই পড়ার চেষ্টা কখনো করে দেখেননি। কিন্তু অন্যের কথা না শুনে যদি বছরে অন্তত দু’একটা ভালো বইও পড়ে দেখতেন তাহলে হয়তো আজ এই লেখাপড়ার প্রয়োজন হতো না আপনার। তাছাড়া অন্যের কথা শুনে বা অন্যরা করে না এই অজুহাতে বই পড়ার আনন্দ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করাটাও হয়তো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। অনেকেই হয়তো যুক্তি দেখিয়ে বলতে পারেন পড়াশোনায় টিকে থাকার প্রয়োজনে এমনিতেই অনেক অনেক পাঠ্যবই পড়তে হয় তাতেই আপনার প্রাণ ওষ্ঠাগত। তার উপর বাড়তি কোনো পড়ার ঝামেলায় নিজেকে জড়ানো মানেই বাড়তি সমস্যায় পড়া। তবে এসবই কিন্তু যারা বই পড়ে না তাদের খোঁড়া যুক্তি। নইলে প্রতিটি গল্প উপন্যাসের বই মনের জানালাটাকে যেভাবে প্রশস্ত করে সেই জানালা গলিয়ে পৃথিবীটাকে দেখা যায় ছোট পর্দায় চেয়েও বড় আঙ্গিকে। আবার আজ আপনার যে বন্ধুরা সবার আগে কোনো মুভি দেখে গড়গড় করে কাহিনীর ‘টুইস্ট’ বলে বাহবা কুড়াচ্ছে তাদের সামনে একবার আপনার বইপড়–য়া জ্ঞানটা জাহির করেই দেখুন না। নেহায়েত বোকা কিংবা অহঙ্কারি কেউ না হলে আপনার এই জ্ঞান বন্ধুদের মুগ্ধ করতে বাধ্য।
আবার পড়ার অভ্যাসটা ভালো করে রপ্ত করতে পারলে সেটা আখেরে কাজ দেবে আপনার একাডেমিক পারফরম্যান্সেও। এ কথা হয়তো ঠিক যে, আজকালকার প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদনের মধ্যে বই সংগ্রহ করে বা বই কিনে পড়াটা মোটেও সহজসাধ্য কাজ নয়। কিন্তু একবার চেষ্টা করে হলেও নিজের রুচিমতো একটা বই যদি আপনি পড়তে পারেন তবে বই পড়ার প্রেমে না পড়ার কোনো কারণই নেই। এ ক্ষেত্রে আপনার পাল্টা যুক্তি থাকতে পারে, এত কিছু থাকতে বইয়ের প্রেমেই কেন জোর করে পড়তে হবে। উত্তরটা যদি একবাক্যে জানতে চান তাহলে বলব, একটা ভালো বই আপনাকে যেভাবে জীবন নিয়ে ভাবতে শেখাবে মুভি কিংবা ফেসবুকে ঢুঁ মেরে, হেডফোন লাগিয়ে এফএম রেডিও কিংবা এমপিথ্রি শুনে তা পারবেন না কোনোভাবেই, সেগুলোর সে সাধ্য নেই বললেই চলে। টিনএজ বয়সের হৈহুল্লোড়ের মধ্যে জীবন নিয়ে ভাববার প্রয়োজনও হয়তো আপনাদের নেই। কিন্তু বই পড়া মানেই মুখ গম্ভীর করে ইন্টেলেকচুয়াল ভাব নেয়া কিন্তু নয়।
বরং একটা অ্যাকশন মুভির পরিবর্তে ফেলুদা, জেমস বন্ড বা মাসুদ রানা সিরিজের বইগুলো কিন্তু কম রোমাঞ্চকর নয়। একইভাবে এফএম রেডিওর গানের চাইতে কোনো অংশে কম রোমান্টিক নয় আমাদের লেখকদের লেখা গল্প-উপন্যাগুলো। তাছাড়া বই পড়তে গিয়ে টিভি, মুভি, গান, ফেসবুক ইত্যাদিকে নির্বাসনে পাঠাতে হবে তারও কোনো যুক্তি নেই। বরং এসব কিছুর পাশাপাশিই বই পড়া চলতে পারে।
যেখানে আপনার আর সব বন্ধু-বান্ধবীই মুভি আর গানের ভাবনায় আপনার চেয়ে কোনো অংশে কম যায় না। সেখানে বই পড়া আপনাকে একটা দিকে হলেও এগিয়ে রাখতে পারে অন্য সবার চেয়ে। আর বই কেন পড়বেন এ নিয়ে যদি এর পরও আপনার মনে দ্বিধা থাকে তাহলে দ্বিধা কাটাতে আপনি না হয় আপনার নিজের পছন্দের আর ভালোলাগার একটা ব্যতিক্রমধর্মী জায়গা তৈরি করতে বরং এসবের পাশাপাশি অন্য কোনো বই একবার পড়েই দেখুন না।



আরো সংবাদ