০৪ আগস্ট ২০২১
`

আইসিইউ

-

নিস্তব্ধ রাত। ঘড়ির কাঁটা ২টা ছুঁইছুঁই। আজ রাত হাসপাতালে ডিউটি আমার। হাসপাতালের স্টাফ আর দু-চারজন রোগীর স্বজন বাদে সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে।
মাঝে মধ্যে মুমূর্ষু রোগীর কেবিন থেকে স্বজনদের গুণগুণ করে কান্নার আওয়াজ আসছে। এসব কান্না এখন আর আমার অন্তর পর্যন্ত পৌঁছায় না। ছোট বেলায় আমি নাকি অনেক আবেগি ছিলাম। অপরের কান্না দেখলে নিজেকে ঠিক রাখতে পারতাম না। তাদের কান্নার সঙ্গী হতাম। এ নিয়ে অনেকে হাসাহাসি করত। বড় হওয়ার পর অতীতের স্মৃতিচারণ করে অজান্তেই হেসে উঠি। সেই তখনকার আমি আর এখনকার আমির মাঝে অনেক ফারাক। ডাক্তার হওয়ার সুবাদে আমার অন্তরটা এখন পাথরের শান দিয়ে বাঁধা। কোনো রকম ভনিতা না করে কত শত স্বজনদের কাছে তাদের রোগীর মৃত্যুর খবর বলে দিয়েছি তার হিসাব নেই। আমার কথা শুনে তাদের আর্তচিৎকার ও ভয়াল কান্না আমার মাঝে বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলেনি। ডাক্তারের ধর্মই বুঝি এটা!
যাই হোক, আসল কথায় ফিরে আসি। রাতে ডিউটি পড়লে যাতে ঘুমের ঘোরে চলে না যাই সে জন্য সবসময় হাঁটাহাঁটির মধ্যে থাকি।
এ পাশ থেকে ও পাশ অনবরত হেঁটে চলি।
বিষয়টি অনেকের কাছে অন্যরকম লাগতে পারে। অনেকে ভাববে, একজন ডাক্তার তার দায়িত্বের প্রতি সম্মানবোধ থাকলে কোনো প্রকার অনিষ্ট এসে পথরোধ করবে না।
হঠাৎ হন্তদন্ত করে নার্সের আগমন আমার আত্মকেন্দ্রিক চিন্তার সমাপ্তি ঘটাল। এ রকম করে নার্সের আগমন যে সবসময় অশুভ খবরের ইঙ্গিত দেয় সেটা অত্যন্ত ভালোভাবেই জানি।
নার্স কিছু বলার আগেই আমি হাতের ইশারা দেয়ার সাথে সাথেই সে উল্টো দৌড় দিলো। আমিও দৌড় দিলাম পেছন পেছন। হাত ইশারার ইঙ্গিত যে ‘চলো তাড়াতাড়ি’ সেটা নার্স ভালোভাবেই জানে।
দৌড়াতে দৌড়াতে সোজা আইসিইউতে ঢুুকলাম। রোগী রফিকউল্লøাহ সাহেব এখানে তিন দিন থেকে লাইফ সাপোর্টে আছেন। ব্রেইন টিউমার অপারেশন করার পর থেকে রাখা হয়েছে।
অবস্থা অনেক খারাপ। এতদিনের ডাক্তারি অভিজ্ঞতা থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করলাম।
কিন্তু বিধির লিখন না যায় খণ্ডন।
রফিকউল্লøাহ সাহেব বিধির ডাকে সাড়া দিয়ে ওপারে চলে গেছে।
কেন জানি আইসিইউ থেকে বের হতে ইচ্ছে করছে না এখন।
কারণ, এখানে ঢোকার আগে রোগীর সাত-আট বছরের নিষ্পাপ ছেলেটা আমার হাত ধরে কোমল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেছিল, আচ্ছা আঙ্কেল আমার বাবার কিছু হবে না তো?
আমি তাকে আত্মবিশ্বাসের সাথে জোর দিয়ে বলেছিলাম, আমি থাকতে তোমার বাবার কিচ্ছু হবে না।
আমার মনে আছে, ছেলেটা তখন হেসেছিল।



আরো সংবাদ