০৪ আগস্ট ২০২১
`

একটি সাইকেলের আত্মকথা ও একজন ইউসুফ হারুন ভূঁইয়া

-

আমি একটি সাইকেল। দুই চাকা বিশিষ্ট বলে বাংলায় আমাকে দ্বিচক্রযান বলা হয়। ১৮১৭ সালে জার্মানির ম্যানহেইম শহরে দুই চাকার বাহন হিসেবে প্রথম আমাদের জনসমক্ষে নিয়ে আসেন জার্মানেরই কার্লভন ড্যারন। শুরুর দিকে দুই চাকা সমান ছিল না। ১৮৮০ সালে সর্বপ্রথম দুই চাকা সমান পর্যায়ে নিয়ে আসা হয় এবং চেইন ও টায়ার সংযুক্ত করা হয়।
আমাদের আঁতুড়ঘর ইউরোপ হলেও আমার জন্ম ঢাকায়। জ্বালানিবিহীন বলে পরিবেশবান্ধব বাহন হিসেবে সারা বিশ্বে আমাদের সমাদর রয়েছে। যদিও বর্তমান যান্ত্রিক সময়ে বাহন হিসেবে আমাদের ব্যবহার করতে অনেকে কুণ্ঠাবোধ করেন।
চাকা ঘুরলেই আমি চলি, জীবন পাই। যতক্ষণ চলা ততক্ষণই আমি কাজের। যিনি আমাকে চালান তাকে পৌঁছে দেই তার অভীষ্ট লক্ষ্যে। মহাজগতের ঘূর্ণায়মান গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্রের সাথে আমার তুলনা চলে। মহাবিশ্ব টিকে আছে তার গতি প্রবাহে। যখন এ গতির স্খলন ঘটবে তখনই সৃষ্টির ধ্বংস অনিবার্য। আমিও ঠিক তেমনি, গতিই আমার জীবন।
আমাকে নিয়ে অনেক জনপ্রিয় গানও রয়েছেÑ
‘হাওয়ার ওপর চলে গাড়ি
লাগে না পেট্রোল ডিজেল
মানুষ একটা দুই চাকার সাইকেল
কী চমৎকার গাড়ির মডেল।’ (কথা ও সুর মনির সরকার)
যখন নতুন কেনা হয়েছিল তখন দেখতে অনেক সুন্দর ছিলাম আমি। যদিও এখনো চকচকে আমি। যেভাবে রাখা স্পটলাইটের আলোয় আরো উজ্জ্বল আরো বর্ণীল হয়েছি। এভাবে থাকা আমার ইচ্ছে নয়। খাঁচার পাখির মতো বন-বনানীর স্মৃতি নিয়েই আমি টিকে আছি। আমাকে দেখে অনেকে আবেগপ্রবণ হন, কর্মচঞ্চলতা অনুভব করেন, মনে মনে তুচ্ছ তাচ্ছিল্যও করেন কেউ কেউ।
মনে পড়ে এই তো সেদিন, ঢাকা শহরের অলিগলি প্রান্তর আমার চলায় কেমন মুখরিত ছিল। টুংটাং ঘণ্টাধ্বনি কোকিলের কুহুর মতো শ্রুতিমধুর ছিল সারা বছর বসন্তময় ঋতুর স্বরূপে। আহা কী কর্মময় দিন ছিল সে সময়গুলো। আমার আরোহীর টুপটুপ করে পড়া ফোঁটা ফোঁটা ঘাম আমার হৃদয় মন আন্দোলিত করত পেরে ওঠার তৃপ্তিতে। এই ফার্মগেট, কাঁঠালবাগান, এই তেজকুনিপাড়া, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ... আরো কত জায়গা। ভোর থেকে মধ্যরাত অবধি আমার নিরবধি পথচলা। মনে পড়ে রাত ১২টার পরও আমার টুং করে একটা ঘণ্টাধ্বনি সন্তানদের ঘুম পাড়িয়ে বসে থাকা বিদগ্ধা রমণীর অপেক্ষার কপাট কিভাবে খুলে যেত। আহা কী মধুময় সময়গুলো!
আমার আরোহী, যিনি আমাকে চালিয়েছেন, যাকে নিয়ে আমি বয়ে বেড়িয়েছি, তিনি একজন ইউসুফ হারুন ভূঁইয়া। ডক্টর হাকীম মো: ইউসুফ হারুন ভূঁইয়া। ১ মার্চ ১৯৫৩ লক্ষ্মীপুর জেলার সদর উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের (দত্তপাড়া) দক্ষিণ মাগুরী গ্রামে তার জন্ম। সম্ভ্রান্ত, ঐতিহ্যবাহী মুসলিম, ভূঁইয়া পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও গ্রামের হাঁ-হাঁ দুরন্ত বাতাসের সাথেই তার বেড়ে ওঠা। তিনি দেখেছেন গ্রাম থেকে গ্রামান্তর কলেরা, কালাজ্বর, গুটিবসন্তসহ নানা মহামারীতে শূন্য হয়ে যাওয়া বাড়িগুলোর বন্ধ দরজা। তিনি শুনেছেন নিরীহ গাছগুলোর ঝুঁটি ধরে নাড়া দেয়া অশান্ত অভিযোগ। নিরন্তর বেদনার্ত স্মৃতি করুণ শৈশব কেটেছে তার গ্রামেই। অতি কাছ থেকে কর্কশ জীবনকে বোঝার ভঙ্গি তিনি শিখেছেন গ্রাম থেকেই। বাবা ছায়েদ উল্লøাহ ভূঁইয়া ছিলেন একজন বুদ্ধিদীপ্ত দূরদৃষ্টিসম্পন্ন আদর্শ মানুষ। গ্রামের বিচার আচার অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতি ছিল সবার কাম্য। মা রওশন জাহান ছিলেন একজন বিদূষী মহিলা। তাই আদর্শ মা-বাবার আদর্শ সন্তান হিসেবে যাবতীয় মোহের বৈপরীত্য তার জন্মগত।
আর এ জন্যই ১৯৭১ সালে তেজগাঁও থানায় অফিসার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও মানবসেবার তীব্র বাসনা তাকে পুলিশি জীবনে আটকে রাখতে পারেনি। মহান মুক্তিযুদ্ধে পাক বাহিনীরা মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে আনলে জীবনবাজি রেখে রাতের আঁধারে পেছনের দরজা দিয়ে বের করে দিতেন। এভাবে কত মুক্তিযোদ্ধাকে তিনি বাঁচিয়েছেন তার হিসাব নেই। আর এভাবেই তিনি হয়ে উঠেন একজন গর্বিত মুক্তিযোদ্ধা। আজো গভীর শ্রদ্ধা অপরিসীম ভালোবাসায় মুক্তিযোদ্ধারা তাকে স্মরণ করেন একজন অভিভাবক, একজন মুক্তির প্রিয় ত্রাতা হিসেবে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পশ্চিমাদের পরিত্যক্ত অঢেল সম্পদ ইচ্ছা করলেই তিনি নিতে পারতেন। সম্পদের মোহ কখনোই তাকে দ্বিধাগ্রস্ত করতে পারেনি।
তেজগাঁয় তখন হামদর্দের একটি কারখানা গড়ে উঠেছিল, তৎকালীন মোতাওয়াল্লির একটুখানি কথায় মানবিক সেবায় উদ্দীপ্ত হারুন দারোগা খ্যাত ইউসুফ হারুন ভূঁইয়া সরকারি চাকরি ছেড়ে হামদর্দে যোগ দিলেন সহযোদ্ধা হিসেবে। এম এম ডিগ্রি অর্জনের পর তিব্বিয়া হাবিবিয়া কলেজ থেকে ডিইউএমএস ডিগ্রি অর্জন করায় ইউনানি প্রতিষ্ঠান হামদর্দে যোগ দিতে তার কোনো অসুবিধাই হয়নি।
হামদর্দ। ফার্সি দু’টি শব্দ হাম এবং দর্দ-এর সমন্বয়ে শব্দটি গঠিত। হাম অর্থ সহযোগী দর্দ অর্থ ব্যথা। অর্থাৎ হামদর্দ শব্দটির দ্বারা বুঝায় ব্যথার সহযোগী বা সমব্যথী। মানবতার অকৃত্রিম সেবা ও কল্যাণের জন্য মহান আল্লøাহর নামে উৎসর্গকৃত একটি ওয়াক্ফ প্রতিষ্ঠান হামদর্দ।

 



আরো সংবাদ