১৯ এপ্রিল ২০২১
`

বসন্তের আগুনরাঙা পলাশ

-

বসন্ত মানেই আগুনরাঙা পলাশ ফুল। মন-প্রাণ কাড়ানো ফুল পলাশ। বৈরী মনে সুখ আহরণের ফুল পলাশ। উপমা দিয়ে পলাশকে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কিছু নেই। পলাশ নিজেই নিজের ঐশ্বর্যে লালায়িত বিস্ময়কর এক ফুল। হৃদয়কাড়া, নজরকাড়া এ ফুল তার শাখায় শাখায় জ্বালিয়েছে রূপের আগুন। শীতে গাছের পাতা ঝরে পড়ার পরপরই পর্ণমোচী পলাশ বৃক্ষের শূন্য ডাল চিরে বের হয়; যেন আগুনের শিখা। ফাগুনের ফুরফুরে বাতাসে সবুজ অরণ্যে এই একটি ফুলই কাল থেকে কালান্তর একক রাজত্ব করে চলছে বসন্তের কোলে। থোকা থোকা মঞ্জরিতে আপন মহিমায় ফুটে আছে পলাশ পর্ণমোচী ডালে। যেন বসন্ত ঋতু মাতাতেই পলাশ ফুটেছে প্রিয় ফাগুনে। বসন্তে প্রকৃতি নবীন পত্র-পল্লবে সুশোভিত হয়ে যেমন তার যৌবনে উপনীত হয়, পলাশ তারই যৌবনের জৌলুশ। বলা যায় পলাশই আজ বসন্তের জৌলুশ এনেছে। পালাশের আগুন রাঙা জৌলুশ বড়ই মনোমুগ্ধকর। ডালে ডালে ফুটে পলাশ সেটাই সে আমাদের জানান দিচ্ছে চেতনে-অবচেতনে। দিচ্ছে দিক। তাই বলে এভাবে। একক রাজত্বে! রাজত্ব না দেখাবেই বা কেন! এমন বসন্ত দিনে আর কোনো ফুল-ই বা আছে পলাশের টক্টকে লালিমার সাথে টক্কর লাগায়! হয়তো শিমুলের কথা বলতে পারি। কিন্তু পলাশের পাশে সে একেবারেই বেমানান। বেমানান হবে না কেন! পলাশ না ফুটলে বসন্তের পূর্ণতাই বৃথা। বৃথা এ জন্য যে জৌলুশ-পলাশ তো বসন্তেরই মুকুটস্বরূপ। মুকুটহীন রাজা যেমন সিংহাসনে বেমানান তেমনি পলাশহীন বসন্ত যেন ঋতুরাজই নয়। মনে হবে যেন বসন্ত নামেনি এবার বাংলাদেশে। কিন্তু পলাশ প্রতি বসন্তেই ফোটে। পলাশ তার আপন রঙে একাই সে সব ফুলকে ছাপিয়ে ফোটে। টক্টকে লাল ছাড়াও আরো দু’টি রঙ সে ধারণ করে থাকেÑ হলুদ ও কমলা। একই দেহে আলাদা আলাদা রঙ দেখলে মনে হয় অরণ্যজুড়ে চলছে তারই বর্ণমিছিল। এ মিছিলে লাল, হলুদ, কমলাই তার অহঙ্কারের মশাল। দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলছে। চলছে অবিরাম। এককভাবে এক ঋতুতে এক জাতের তিন বর্ণের মিছিল চললে অন্য ফুল আপনিই ম্লøান হতে বাধ্য। না হয়ে উপায় কী। পলাশ যে অরণ্যের অগ্নিশিখা। রক্তিম পলাশের ওপর দৃষ্টি পড়লেই চোখ ধাঁধিয়ে ওঠে। মনে হয় যেন অরণ্যে আজ কে আগুন লাগিয়ে দিলো। সমস্ত সবুজ অরণ্য দাউ দাউ করে জ্বলছে। সে আগুন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সমস্ত সবুজ অরণ্যে। নেভানোর নেই বুঝি কেউ। কে নেভাবে। সাধ্য আছে কার!
পলাশ রঙে যেমন ভুবন মাতিয়ে রেখেছে তেমনি কুঁড়িতেও আছে তার আরেক রয়েল ভাব। তথা পলাশের রক্তিম কুঁঁড়ি দেখতে বাঘের নখের মতো। তবে খামচির ভয় নেই, কেননা পলাশ কোমল। স্পর্শ-হৃদয় ছোঁয়া। আবেগ মায়াময়। এটি আবার দেখতে শিম ফুল আকৃতির। পাঁচটি পাপড়ি নিয়ে গঠিত। সামনে একটি চওড়া পাপড়ি, পেছনে দুটি ডানার মতো ছড়ানো। আরো দু’টি পাপড়ি একত্রে বাঁকানো। সব মিলিয়ে আবার আরেক আকারে দাঁড়ায় যা পাখির ঠোঁটের মতো।
বৃতি বাদামি, রোমশ এসব বৈসাদৃশ্য এই ফুলকে করেছে আরো মোহনীয়। চিত্তকর্ষক। তার সাথে পাখপাখালির কলকাকলি নতুন মাত্রা যোগ করে আরো মনোরম, প্রাণচঞ্চল করে তোলে আমাদের। পলাশের সাথে পাখির কলকাকলি আমাদের বাড়তি পাওনা ‘সোনায় সোহাগা’। সাহিত্যের বহু শাখায় আছে পলাশের আধিপত্য। কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার গানে পলাশের কথা এভাবে উল্লেখ করেছেনÑ হলুদ গাঁদার ফুল রাঙা পলাশ ফুল/এনে দে এনে দে নইলে বাঁধবো না বাঁধবো না চুল। পলাশ বৃক্ষ মাঝারি আকারের পর্ণমোচী। বৃক্ষটির ডালে চোখ পড়লেই একই সাথে ‘আনন্দ এবং বিস্ময়’ একাকার হয়ে আপনি আন্দোলিত হয় মন। বিস্ময়কর এ দৃশ্য! হৃদয় আন্দোলিত না হয়ে উপায় কী! এ যে বিরহ-বিদ্রোহের আরেক প্রতীক পলাশ।
তাই তো রগরগিয়ে সবুজে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে সে কথাই জানান দিচ্ছে ঋতুরাজ বসন্ত।হ



আরো সংবাদ