১৯ এপ্রিল ২০২১
`

ইবনে সিনার গ্রন্থাগার

-

মুসলিম স্বর্ণযুগে যেসব মৌলিক গবেষণা ও আবিষ্কারের কথা আমরা জানতে পারি তার বেশির ভাগই এ গ্রন্থাগারে বসে গবেষণাগার কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না। এসব গ্রন্থাগারই ছিল উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণা কেন্দ্র। আল-খাওয়ারিজমির বীজ গণিত আবিষ্কার, ইবনে খলদুনের সমাজবিজ্ঞান রচনা, আল কিন্দির রসায়ন চর্চা, আল বেরুনির পদার্থবিজ্ঞান রচনা, ইবনে সিনার চিকিৎসাবিজ্ঞানের নবদিগন্ত উন্মোচন প্রভৃতি কার্যক্রম পরিচালনার মূল কেন্দ্রস্থল ছিল এ গ্রন্থাগার।
মধ্য যুগের মুসলিম শাসনামলে যেসব গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেগুলো কেবল গ্রন্থ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের গ্রন্থাগার ছিল না। এগুলো ছিল একাধারে পাঠশালা, অনুবাদ কেন্দ্র, গবেষণা কেন্দ্র, গ্রন্থ আদান-প্রদান কেন্দ্র, আবাসিক শিক্ষালয়, সভা-সমিতি করার ব্যবস্থাসহ বহুমুখী কার্যক্রমের এক বিশাল প্রতিষ্ঠান। মুসলমানদের সাহিত্যিক অভিরুচি ও বিদ্যোৎসাহী মানসিকতার কারণে সমগ্র মুসলিম বিশ্বের সর্বত্রে এ জাতীয় গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এ সময়ের গ্রন্থাগারগুলো সাধারণত দুই রকমের হতো। যথা: সাধারণ লাইব্রেরি ও বিশেষ লাইব্রেরি। সাধারণ লাইব্রেরি খলিফা, আমির-ওমরাহ, আলিম ও বিত্তশালী লোকেরা প্রতিষ্ঠা করত। এর জন্য স্বতন্ত্রভাবে পাকা ভবন নির্মাণ করা হতো এবং অনেক সময় তা মসজিদ ও বিদ্যালয়গুলোর সংলগ্ন থাকত। এসব লাইব্রেরিতে সুসজ্জিত ক্যাটালগ বা পুস্তক তালিকা থাকত, যা দেখে পাঠক খুব সহজে তার পছন্দের বইটি বের করতে পারত। মুসলিম শাসনামলে প্রতিষ্ঠিত গ্রন্থাগারের জন্য যে স্বতন্ত্র ভবন নির্মিত হতো তাতে বহুসংখ্যক কক্ষ থাকত। মাঝখানে বড় আকারের হল থাকত। প্রতিটি কক্ষ নির্দিষ্ট একেকটা বিষয়ে জন্য নির্দিষ্ট থাকত। যেমনÑ সাহিত্য পুস্তকের কক্ষ, আইন শাস্ত্রীয় পুস্তকাদির কক্ষ এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের পুস্তকের কক্ষ, অনুরূপভাবে অন্যান্য বিদ্যার জন্য আলাদা কক্ষ থাকত। এসব পাঠক অত্যন্ত আরামদায়ক ও উন্নতমানের চেয়ার-টেবিল প্রভৃতিতে সুসজ্জিত থাকত। পাঠকদের খাওয়া-দাওয়া ও ঘুমানোর জন্যও আলাদা কক্ষ থাকত। এ ধরনের একটা বিরাট গ্রন্থাগার ভবন ছিল বাগদাদের উপকণ্ঠস্থ কাফস নামক এলাকায়। আলী বিন ইয়াহিয়া বিন মুনজিমের প্রতিষ্ঠিত এ গ্রন্থাগারটি ‘খাজানায়ে হিকমত’ বা জ্ঞানের ভাণ্ডার নামে পরিচিত ছিল। এখানে বিভিন্ন স্থান থেকে লোকেরা আসত, থাকত ও বই পড়ে জ্ঞানার্জন করত। এখানে তাদেকে সব রকমের বই সহজেই সরবরাহ করা হতো। শুধু তা-ই নয়, জ্ঞানার্জনে উৎসাহী কোনো গরিব শিক্ষার্থী এলে গ্রন্থাগার থেকে তাদের শুধু কাগজ-কালি সরবরাহ করা হতো তাই নয়, বরং ব্যয়ভার বহনের জন্য নগদ অর্থ দিয়েও সহায়তা করা হতো। সাধারণ গ্রন্থাগারগুলোতে কর্মচারী রাখা হতো। এদের মধ্যে যিনি প্রধান থাকতেন, তার উপাধি ছিল ‘খাজিনুল মাকতাবা’ বা গ্রন্থাগার পরিচালক। এই পদে সব সময় সমকালীন বিখ্যাত পণ্ডিত ব্যক্তিদের নিযুক্ত করা হতো। কাতিব বা লেখক পদেও কিছু লোক নিয়োজিত থাকত। যারা সুন্দর হস্তাক্ষরে সুন্দর-সুন্দর কপি তৈরি করত। অনুবাদ কার্যক্রম ছিল এ যুগের গ্রন্থাগারগুলোর বিশেষ বৈশিষ্ট্য। বিভিন্ন ভাষা হতে আরবি-ফারসি ভাষায় অনুবাদের জন্য বিশেষজ্ঞ অনুবাদক নিযুক্ত থাকত। চামড়া দিয়ে বই শক্ত ও সুদৃশ্যভাবে বাইন্ডিং করার জন্য সুদ বাইন্ডারও ছিল। এসব পদ ছাড়াও আরো কিছু সংখ্যক জনশক্তি গ্রন্থাগারের অন্যান্য জরুরি কাজের জন্য নিযুক্ত থাকত। প্রতিটি ছোট ও বড় গ্রন্থাগারের একটা পুস্তক তালিকা থাকত, যা থেকে সহজেই প্রয়োজনীয় পুস্তক খুঁজে বের করা যেত।
গ্রন্থাগারগুলোকে কেন্দ্র করে এ-জাতীয় আরো বহু কার্যক্রম পরিচালিত হতো। যথা :
বইপুস্তক/পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, গ্রন্থ সেবা প্রদান, বই ভাড়া প্রদান, প্রতিলিপি প্রণয়ন, বাইন্ডিং, চিত্রশালা/ মানচিত্র সংরক্ষণ, অনুবাদ, গ্রন্থ প্রণয়ন, বৃত্তি প্রদান, গ্রন্থপঞ্জি তৈরি, সামষ্টিক অধ্যয়ন, মৌলিক গবেষণা, মানমন্দিও, আবাসিক শিক্ষালয়। অত্র প্রবন্ধে উল্লিখিত মধ্যযুগের গ্রন্থাগারের তালিকার প্রথম গ্রন্থাগারটি ছিল আব্বাসী আমলে প্রতিষ্ঠিত বাগদাদের ‘বায়তুল হিকমাহ’। এ বায়তুল হিকমাহ ছিল একাধারে গ্রন্থাগার, শিক্ষায়তন ও অনুবাদ কার্যালয়। অনুবাদ কাজ ও জ্ঞান গবেষণার মাঝে সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে জ্ঞান-বিজ্ঞানের গতিকে ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে বায়তুল হিকমাহ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। বায়তুল হিকমাহ গ্রন্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রে উদারনীতি গ্রহণ করে। বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার গ্রন্থ ওই গ্রন্থাগারটিতে সংরক্ষিত ছিল। খলিফা হারুন ও তার উজির ইয়াহিয়া বার্মাকির উদ্যোগে ফারসি, গ্রিক, মিসরীয়, ভারতীয়, কালদীয় প্রভৃতি ভাষার বইপুস্তক প্রাচীন পাণ্ডুলিপি প্রভৃতি এ গন্থাগারটিকে সমৃদ্ধ করেছিল। খলিফা হারুনুর রশিদের পর খলিফা আল মামুনও বাবার মতো বায়তুল হিকমাহর উন্নয়নে বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তার পৃষ্ঠপোষকতায় বায়তুল হিকমাহর পরিসর বৃদ্ধি পায়। ওই সময় গ্যালেন, হিপোক্রেটিস, ডায়োস-কোরইডিসের রচনাবলি, পেটোর রিপাবলিক এবং অ্যারিস্টটলের ক্যাটেগরিজ, ফিজিক্স ও ম্যাগনা মরালিয়াসহ প্রভৃতি গ্রন্থ আরবিতে অনূদিত হয়। আল মামুনের খেলাফতকালে শুধু গ্রিক রচনাবলি অনুবাদ করতেই বায়তুল হিকমাহ থেকে প্রায় তিন লাখ দিনার ব্যয় করা হয়েছিল বলে জানা যায়। ওই সময়ে ইসলামের আগের যুগের দু®প্রাপ্য সম্পদ, প্রাচীন আরবের কসিদা ও কবিতা, চিঠিপত্র, দলিল-দস্তাবেজ, সন্ধিপত্র সংগ্রহ ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়। সার্বিক বিবেচনায় খলিফা মামুনের রাজত্বকাল ছিল ইসলামের ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা উজ্জ্বল ও গৌরবময় যুগ।
এ গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় সৃষ্টির মূলে ছিল বায়তুল হিকমাহর অবদান। মুসলিম জাহানের খলিফা বায়তুল হিকমাহে গবেষণারত পারসিক, হিন্দু, গ্রিক, খ্রিষ্টান, আরবীয় প্রভৃতি সম্প্রদায়ের মনীষীদের মাধ্যমে আরবের বিভিন্ন অঞ্চল ও বৈদেশিক রাজ্য হতে নানা দেশের জ্ঞানভাণ্ডারে সঞ্চিত পুস্তকের পাণ্ডুলিপি আহরণ করেন। খলিফা আল মামুনের শাসনামলে বায়তুল হিকমাহর সাথেই মানমন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়। ওই মানমন্দিরে জ্যোতির্বিদ্যার চর্চা হতো। খ্যাতিমান জ্যোতির্বিদ ইয়াহিয়া ওই মানমন্দিরে গবেষণায় নিযুক্ত ছিলেন। এ সময় প্রতিষ্ঠানটি গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসাবিজ্ঞান, আলকেমি, প্রাণিবিদ্যা, ভূগোল ও মানচিত্রাঙ্কন বিদ্যাসহ বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানচর্চার অপ্রতিদ্বন্দ্বী স্থান হয়ে ওঠে। ভারতীয়, গ্রিক ও পারসিয়ান রচনা ব্যবহার করে পণ্ডিতরা বৈশ্বিক জ্ঞানের বিরাট ভাণ্ডার অর্জন করেন এবং এর মাধ্যমে তাদের নিজেদের আবিষ্কারের দিকে এগিয়ে যান। নবম শতকের মধ্যভাগে বায়তুল হিকমাহ ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহৎ গ্রন্থভাণ্ডার। বায়তুল হিকমাহ গ্রন্থাগারের গ্রন্থাগারিকের মধ্যে সাহল ইবন হারুন, সাঈদ ইবন হারুন ও সালাম অন্যতম ছিলেন। ওই তিনজন গ্রন্থাগারিককে ‘সাহিব’ উপাধি প্রদান করা হয়। বীজগণিতের জনক মুহাম্মদ ইবন মুসা আল খাওয়ারিজমিও (৭৮০-৮৫০ খ্রি.) বায়তুল হিকমাহ গ্রন্থাগারের গ্রন্থাগারিকের দায়িত্ব পালন করেন।
গ্রন্থ ও পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, গ্রন্থ রচনা, অনুবাদ ও প্রতিলিপি তৈরি, গ্রন্থপঞ্জি তৈরি, অধ্যয়ন ও গ্রন্থ ধার দেয়া প্রভৃতি ছিল গ্রন্থাগারগুলোর নিয়মিত কার্যক্রম। এ সময়কার গ্রন্থাগারগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি ছিল মৌলিক গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা। মুসলিম স্বর্ণযুগে যেসব মৌলিক গবেষণা ও আবিষ্কারের কথা আমরা জানতে পারি তার বেশির ভাগই এ গ্রন্থাগারে বসে গবেষণাগার কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না। এ গ্রন্থাগারগুলোই ছিল উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণা কেন্দ্র। আল-খাওয়ারিজমির বীজ গণিত আবিষ্কার, ইবনে খলদুনের সমাজ বিজ্ঞান রচনা, আল কিন্দির রসায়ন চর্চা, আল বেরুনির পদার্থবিজ্ঞান রচনা, ইবনে সিনার চিকিৎসাবিজ্ঞানের নবদিগন্ত উন্মোচন প্রভৃতি কার্যক্রম পরিচালনার মূল কেন্দ্র্স্থল ছিল এ গ্রন্থাগার। হ



আরো সংবাদ