১৪ এপ্রিল ২০২১
`

টিফিনের পয়সায় বৃক্ষ বাগান

-

মাহবুব ইসলাম পলাশ। একজন বৃক্ষপ্রেমী। নিজে গাছ লাগান। অন্যদের গাছ উপহার দেন। পাঁচ বিঘা জমির উপর প্রায় ৩০০ প্রজাতির পাঁচ হাজার গাছের বাগান তার। বনবিভাগ কর্তৃক বিলুপ্ত ঘোষিত ৪৫ প্রজাতির গাছের মধ্যে ৪৩ প্রজাতির গাছ তার বাগানে রয়েছে। সুন্দরী, গোলপাতা গাছ সুন্দরবন ছাড়া হয় না বললেই চলে। এসব গাছ রয়েছে তার বাগানে। ছাত্র অবস্থায় তিনি টিফিনের পয়সা জমিয়ে গাছের চারা কিনতেন। পড়াশোনা শেষ করে চাকরিতে ঢুুকেই তিনি দুর্লভ প্রজাতির বৃক্ষ সংগ্রহ শুরু করেন। সেই সংগ্রহশালা এখন বিশাল নার্সারি। ইউক্যালিপটাস গাছ পরিবেশের জন্য ভালো নয়। অতিরিক্ত পানি শোষণ করে। এই গাছের ডালে পাখিও বসে না। এই বিষয়টি তাকে ভাবিয়ে তুলল। পাখিরা যেন বাসা করতে পারে তার জন্য রোপণ করেন আম, জাম ও নারিকেল গাছ, গোলপাতা, সুন্দরী কৃপা ইত্যাদি। সুন্দরবনের আরো কিছু গাছ রয়েছে তার নার্সারিতে যেমনÑ সুন্দরী গোলপাতা, কৃপা, খোলসা, কাকড়া, উড়া এবং গড়ানসহ ৯ ধরনের লবণপানি ও জোয়ার-ভাটার গাছ। নানাজাতের বৃক্ষের পাশাপাশি তার বাগানে আছে ২৬ প্রজাতির ফুলের গাছও। এর মধ্যে দায়ফুল, লাইলি-মজনু, হলুদ পলাশ, লাল পলাশ, কনকচাঁপা, ঝুমকোবাদি, কনকসুধা, কুসুম, লাল চিতা, নীল চিতা, হলুদ চিতা, নীল পুর্বল, অনন্ত লতা, বাসর লতা, কুমারী ও চম্পা লতা উল্লেøখযোগ্য।
মূল্যবান বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষ বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে যাবে। নতুন প্রজন্ম ইউটিউবে এসব গাছের কথা জানবে। বাস্তবে দেখবে না। পলাশ তা একদমই চান না। সে জন্য তিনি দুর্লভ বৃক্ষের বাগান গড়ে তুলেছেন। দুর্লভ বৃক্ষ নিয়ে পলাশ বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে এসব গাছ একসময় হারিয়ে যাবে। কিন্তু যদি সংরক্ষিত থাকে তাহলে এই গাছগুলো আর কখনো হারাবে না। আমি এই বিরল প্রজাতির গাছগুলো সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে দিতে চাই। পরিবেশ রক্ষায় বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে সবার পাশে থাকতে চাই।’ শুধু যে দুর্লভ বৃক্ষের বাগান করেছেন তাই নয়। পলাশের আরেকটি অভিনব উদ্যোগÑ কন্যাসন্তানের জন্য গাছ উপহার। কোথাও কন্যাসন্তান হলে গাছ নিয়ে ছুটে যান তিনি। বিনামূল্যে গাছ উপহার দেন। সমাজের মানুষকে বোঝান, কন্যাসন্তান পরিবারের বোঝা নয়। কন্যাসন্তান ছাড়াও ব্যক্তি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে গাছের চারা উপহার দেন তিনি। পাশাপাশি বাল্যবিয়ে না দেয়ার জন্য পরামর্শ দেন তিনি। পাশাপাশি গাছ বড় হলে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া সম্ভব। এ বিষয়ে বৃক্ষপ্রেমী পলাশ কন্যাসন্তানের বাবা-মায়ের সাথে কথা বলেন। কর্মস্থল রাজশাহী হোক বা জন্মস্থান সিরাজগঞ্জ হোক। সব জায়গায়ই তার এই কর্মকাণ্ড বিদ্যমান। কয়েক শত পরিবারকে তিনি গাছ উপহার দিয়েছেন। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া তার এই কর্মকাণ্ড ব্যাপক সাড়া ফেলে। একবার গাছ জোগাড় করতে কক্সবাজার গিয়ে হাতির আক্রমণের মুখে পড়েছিলেন। তার পেছনে হাতি এসে দাঁড়িয়েছিল। মালমঘাট ফরেস্টের একজন কর্মচারী তাকে বাঁচিয়েছিলেন সেদিন। আরেকবার বৃষ্টি মাথায় গাছ লাগানোর সময় তার পাশেই বজ্রপাত হয়। এমনি নানাবিধ মৃত্যুঝুঁকির সম্মুখীন হয়েও বৃক্ষপ্রেম থেকে কখনো দমে যাননি। বুকভরা বৃক্ষের প্রতি ভালোবাসাই তার অনুপ্রেরণা। গাছের সংগ্রহের জন্য দক্ষিণাঞ্চলে বিভিন্ন কর্মকর্তার কাছে চিঠি লিখে, ফোন করে গাছের চারা সংগ্রহ করেন। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রচুর সংখ্যক মানুষ পলাশের বাগান দেখতে আসেন। আবার কারো গাছ লাগলে পলাশের কাছে গেলেই হয়। মাহবুব ইসলাম পলাশের বাড়ি সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার বাজার ভদ্রঘাট এলাকার শেখপাড়া গ্রামে। বৃক্ষপ্রেমী পলাশ স্বপ্ন দেখেন বিলুপ্তপ্রায় গাছগুলো বেঁচে থাকবে। বিলুপ্তপ্রায় গাছের গবেষণাগার আর বর্তমানে ব্যবহৃত কৃষি উপকরণ, যন্ত্রপাতির জাদুঘর স্থাপন করা তার অনেক দিনের স্বপ্ন। হ



আরো সংবাদ