২৮ অক্টোবর ২০২০

‘মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়’

-

সময় চলে সময়ের নিয়মে। আর সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলে আমাদের জীবন। এ অর্থে সময় আর জীবনের ঘনিষ্ঠতা সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই। পার্থক্য শুধু টিকে থাকা আর না থাকার মধ্যে। জীবনের যেমন শুরু আছে তেমন শেষও আছে। জীবন অনেকটা বহতা নদীর ঢেউয়ের মতো। প্রবল স্রোতে যৌবনের উন্মাদনার জয়গান গাইতে গাইতে এগিয়ে যায়। একেবারে মৃত্যুর কিনারে। তীরে এসে ক্লান্ত পথিকের মতো মিশে যায়। উচ্ছ্বল তারুণ্যে তখন ভর করে জরাজীর্ণ বার্ধ্যকের প্রভাব।
কিন্তু সময় সর্বদা প্রবাহমান। অদৃশ্য অস্তিত্ব।
চেষ্টা ও সাধনা ছাড়া আমরা কখনো সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাতে পারব না। সুখী ও সমৃদ্ধ জীবনযাপন করতে পারব না। পৃথিবীকে ভালো কিছু উপহার দিতে পারব না। পৃথিবীতে রেখে যেতে পারব না মানবিক ও প্রশংসনীয় কোনো সৃজনশীল কর্ম। আমাদের অনেকেরই জীবনের অধ্যায় মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হয়ে যায়। জীবনের সমস্ত অর্জন সময়ের স্রোতে মুছে যায়।
আবার কারো কারো জীবন অর্থবহ হয়। মৃত্যুতে হারিয়ে যায় না। কালে কালে তারা অমর হয়ে কীর্তি ছড়ায়। কিন্তু ক’জনের ভাগ্যে তা জুটে? যাদের ভাগ্যে তা জুটে তাঁরাই কীর্তিমান পুরুষ। জাতির আদর্শ। যুগ যুগ ধরে মানুষ তাদের অনুসরণ করে, অনুকরণ করে। ভালোবাসে। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে তারা জিতে যায়। আপন কীর্তিতে।
মৃত্যুর পরে অমর থাকা, মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকা, স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে সাধারণের অন্তরে জায়গা করে নিতে প্রয়োজন সততা, প্রচেষ্টা, সাধনা ও কঠোর সংগ্রাম। পাশাপাশি মানব মনে চাষ করতে হয় সত্য ও সুন্দর পথের বিজয়ের ফুল।
ফলাতে হয় অদম্য স্পৃহার ফসল।
পৃথিবীর ইতিহাসে যাঁরাই সমাদৃত হয়েছেন
তাঁরা প্রত্যেকেই সময়ের সঠিক মূল্য দিয়েছেন। নিজ নিজ স্বপ্নের বাস্তবায়নের লক্ষ্যে চেষ্টা ও সাধনাকে জীবনের চূড়ান্ত পর্যায়ে স্থান দিয়েছেন।
ভারতের পরমাণু বিজ্ঞানী এ,পি,জে আবদুল কালাম বলেছেন, ‘সূর্যের মতো দীপ্তিমান হতে হলে প্রথমে তোমাকে সূর্যের মতোই পুড়তে হবে।’
জীবন চলার পথ সব সময় মসৃণ নয়। জীবনের কঠিন অধ্যায় মাড়িয়েই লক্ষ্যকে ছুঁতে হয়। বন্ধুর পথে তাই ভেবেচিন্তে পা ফেলতে হবে। সময়মতো ঝোপ বুঝে নিজের সেরাটা ঢেলে দিতে হয়।
স্বপ্ন দেখতে হবে উজ্জ্বলতার, শালীনতার, মরেও বেঁচে থাকার। জলাঞ্জলি দিতে হবে জীবনের কাছে জীবনকে।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেছেন, ‘মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়।’
তার মানে আমাদের স্বপ্ন যত বড় হবে আমরাও তত বড় হবো। আমাদের স্বপ্ন যদি হকের পক্ষে হয় তাহলে আমরাও হকের পক্ষের মানুষ হবো। আর যদি কোনো বিপথগামীদের পথে হয়, তাহলে সময়ের ব্যবধানে আমরাও বিপথগামীদের দলের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।
যে স্বপ্ন আমাদের ঘুমাতে দেয় না, জড় বস্তুর মতো বসিয়ে না রেখে সম্মুখে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগায়, সেই স্বপ্নই বাস্তবতার বিজয় নিশান ওড়াতে পারে।
অথচ সময় কখনো পেছন ফিরে চায় না। হারে না। শুধু জেতার সম্ভাবনায় সম্মুখে দুর্বার এগিয়ে চলে।
আর আমরা শুধু অভিযোজনের খেলায় মাতি। কখনো ভালো, কখনো মন্দ সময় পার করি।
এখন বিশ্বজুড়ে চলছে জীবনের কঠিন মুহূর্ত। করোনাভাইরাস আতঙ্কের মধ্যে বেঁচে থাকার সংগ্রামে আমরা নিত্য লড়াই করছি। ইতোমধ্যে এই সংগ্রামে অনেকেই জীবনের কাছে হেরে গেছেন। কেউ কেউ অসচেতন থেকে। আবার কেউ কেউ সচেতন থেকেও। কিন্তু সময় ঠিকই এগিয়ে যাচ্ছে। নিজের মতো করে। যেন তার একটুও ঘুরে দাঁড়ানোর অভিপ্রায় নেই। আর আমরা যারা এখনো বেঁচে আছি, তারা শুধু বেঁচে থাকার উপায় খোঁজে বের করার চেষ্টায় আছি। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছি। সবাই না। হয়তো কেউ কেউ। কিন্তু এ কথা সত্য যে, আসন্ন বিপদ থেকে মহান সৃষ্টিকর্তার করুণা ও আমাদের সচেতনতাই মুক্তি এনে দিতে পারে।
হয়তো একসময় এমন দুঃসময়ও থাকবে না। আবার ঘুরবে থমকে যাওয়া পৃথিবীর চাকা। জীবনে ফিরে আসবে নতুন গতি। সময় নতুনভাবে মেলে ধরবে তার নতুন রূপ। সেরূপে আমরাও নিজেদের মানিয়ে নেবো। সময়ের মতো এগিয়ে যাবার মিছিলে শরিক হবো। জীবনের বিজয় সুনিশ্চিত করব।


আরো সংবাদ