২৫ অক্টোবর ২০২০

ঐতিহ্যবাহী সূর্যমণি মেলা

-

২২৫ বছর ধরে বানারীপাড়ার আহম্মদাবাদ (বেতাল) গ্রামে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী সূর্যমণি মেলা। সূর্যপূজার মাধ্যমে মেলার শুরু হয়। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নানা ধর্মের অসংখ্য মানুষ মেলা দেখতে আসেন। বানারীপাড়ার আহম্মদাবাদ (বেতাল) গ্রামে ছিল সরকার বাড়ি। কৃষকরা সরকার বাড়ির জমি চাষ করতেন। একদিন জমি চাষ করতে গিয়ে লাঙ্গলের ফলা আটকে যায়। অনেক চেষ্টার পরও ফলা আর সামনে এগোচ্ছিল না। তখন মাটি খুঁড়ে পাওয়া যায় কালো বর্ণের কষ্টিপাথরের সূর্যমূর্তি। যার উচ্চতা ছিল পাঁচ ফুটের মতো। পাশে ছিল প্রায় দুই ফুট, ওজনে প্রায় চার মণের মতো। যেটি ছিল মূল্যবান কষ্টিপাথরের প্রতিমা। কিছু দিন পর সরকার বাড়ির গৃহিণী স্বপ্ন দেখেন। কে যেন তাকে প্রতিমাটি দিয়ে সূর্যপূজা করার নির্দেশ দিচ্ছেন। পরবর্তীতে মাঘী সপ্তমির দিন শুরু হলো সূর্যদেবের পূজা। অন্য এক বর্ণনায় জানা যায়, সূর্যমণির সূর্যমূর্তিটি নবম শতকের। কষ্টিপাথরের সূর্যমূর্তিটির সাথে স্ত্রী ছায়া, পুত্র শনি ও কন্যা সঙ্গার মূর্তি ছিল। মূর্তিটি প্রথমে ছিল বাউফল থানার সূর্যমণি গ্রামে। কর্দপ নারায়ণ বাকলা থেকে রাজধানী স্থানান্তরিত করার সময় সেবায়েতরা মূর্তিটি বানারীপাড়া নিয়ে আসেন। রাজনৈতিক কারণে মূর্তিটি মাটিচাপা দিয়ে রাখা হয়। পরবর্তীতে মূর্তিতে উদ্ধার এবং ১৯৭১ সালে চুরি হয়। ১৯৭৭ সালে মূর্তিটি উদ্ধার করে জাতীয় জাদুঘরে রাখা হয়েছে। (তথ্যসূত্র : বরিশাল জেলার ইতিহাস, বরিশাল বিভাগের ইতিহাস, লেখকÑ সিরাজউদ্দীন আহমেদ)। বানারীপাড়া সূর্যমণি মেলার ইতিহাস বইয়ের লেখক আবদুল হাই বখশ জাতীয় জাদুঘরে গিয়ে এ ধরনের কোনো মূর্তি খুঁজে পাননি। যতদূর জানা যায়, ১৭৯৫ সালে প্রথম মেলা অনুষ্ঠিত হয়। সূর্যপূজার মাধ্যমে মেলার শুরু হয়। প্রথমে শুধু পূজা হলেও পরে উৎসাহী লোকজন বিভিন্ন পণ্যের দোকান দিয়ে বসেন। যা পরবর্তীতে মেলায় রূপ লাভ করে। সূর্যপূজা করলে রোগবালাই, রাহুগ্রাস থেকে রেহাই পাওয়া যাবে। জমির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি পাবে, ফসল ভালো হবেÑ এমনটাই হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের বিশ্বাস। প্রথম দিকে এক বা তিন দিন, তারপর সাত দিনব্যাপী থাকলে এখন মেলার মেয়াদ এক মাস। শুরুর দিকে ছাপড়াঘরে পূজা হতো। এখন সেখানে পাকা মন্দির হয়েছে। বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে হরেক রকমের পণ্যের পসরা বসে। মেলা শুরু হওয়ার প্রায় মাসখানেক আগে থেকেই প্রস্তুতি শুরু হয়। এ বছর ফেব্রুয়ারি মাসে মেলা হয়েছে।
মাটির নিচে যে প্রতিমাটি পাওয়া যায়। যেটিকে কেন্দ্র করে পরবর্তীতে স্বপ্নযোগে পূজা করার নির্দেশ আসে। পাঁচ ফুট উঁচু, চোখে রেডিয়ামে লাগানো ঐতিহাসিক সূর্যমূর্তিটি ১৯৬৮ সালে চুরি হয়ে যায়। কে বা কারা চুরি করে সন্ধান মেলেনি। ওই সময়ে এই ঘটনাটি প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল বলে জানা যায়। পরবর্তীতে সূর্যদেবের সাদৃশ্য একটি প্রতিমা স্থাপন করা হয়েছে। নির্মাণ করা হয়েছে পাকা মন্দির। সূর্যপূজার আয়োজক ছিল সরকার পরিবার। ১৯৫৭ সালে দেশ বিভাগের সময় সরকার পরিবার ভারতে পাড়ি জমায়। জমিজমাসহ সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি স্থানীয় চেরাগ আলী মোল্লøাকে দান করে যান। মতান্তরে বিক্রি করে যান। এরপর থেকে বংশপরম্পরায় মোল্লা পরিবারের লোকেরা মেলার দেখভাল করেন। তাদের জায়গায় মেলা অনুষ্ঠিত হয়। সূর্যমণি মেলা সংলগ্ন উত্তর পাশে ইছানি খাল। নয়নাভিরাম সৌন্দর্যময় এই খালটি এখন মৃতপ্রায়। এক সময় এই খাল অনেক প্রশস্ত ছিল। গভীরতাও ছিল অনেক। আগাবাকের খার সৈন্যরা এই খাল দিয়ে বাকপুর, নারায়ণপুর, গুঠিয়া হয়ে বাকেরগঞ্জ চলে যায়। তাড়াবাড়ির জমিদার বাড়ি আগাবাকেরের সৈন্যরা দখল করে। প্রচুর ধনসম্পদসহকারে ইছানি খাল দিয়ে যাওয়ার সময় মেলা যে স্থানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, সেখানে সূর্যমূর্তিটি পুঁতে রেখে যায়। এমন বর্ণনাও প্রচলিত আছে। ধারণা করা হয়, এটা নবাব সিরাজউদ্দৌলাহ নিহত হওয়ার ২০০ বছর আগের ঘটনা। আবদুুল হাই বখশ বধিরদের কথা শেখার প্রতিষ্ঠান হাই কেয়ার স্কুল বানারীপাড়া-এর প্রতিষ্ঠাতা। তিনি দীর্ঘ দিন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। আবদুুল হাই বখশ বানারীপাড়া সূর্যমণি মেলার ইতিহাস শীর্ষক পুস্তিকা রচনা করেছেন। পুস্তিকার মূল্য ২০ টাকা। ইতোমধ্যে পুস্তকাটির দুটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। পুস্তিকাটিতে তিনি বিভিন্নভাবে সূর্যমণি মেলার সঠিক ইতিহাস খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন। তবে হালচাষের সময় কৃষকের লাঙ্গলের ফলায় সূর্যমূর্তির সন্ধান লাভ। পরবর্তীতে গৃহকত্রীর স্বপ্নে সূর্যপূজা করার নির্দেশ দান। এই বর্ণনাটি অধিক গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছে। উল্লেখ্য, কৃষকের লাঙ্গলের ফলার আঘাতে সূর্যমূর্তিটির একটি কান ভেঙে গিয়েছিল। এই ভাঙা কান বর্ষীয়ান আবদুুল হাই বখশ নিজে দেখেছেন বলে তার পুস্তিকায় উল্লেখ করেছেন। তার বইয়ের বর্ণনা মতে, মেলা শুরু হয় ১৭৯৫ সালে। আর সূর্যমূর্তি উদ্ধার হয় তারও এক-দুই বছর আগে। সূর্যমণি মেলায় সব ধর্মের মানুষ আসেন। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সবাই উৎসবে মেতে উঠেন। কেনাকাটা করেন। সার্কাস, পুতুল নাচ উপভোগ করেন। যুগ যুগ ধরে সূর্যমণি মেলা অসাম্প্রদায়িকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। মেলায় কাঠের আসবাবপত্র, মৃৎশিল্প, বাঁশ ও বেতের আসবাবপত্র, চুড়ি, ফিতার দোকান, কসমেটিক্স, খাবারের দোকান, শিশুদের বিভিন্ন ধরনের খেলনার দোকান, দা-খুন্তি, কুঠার, কাস্তে, বিভিন্ন রকমের মিষ্টির দোকান, ফলের দোকানসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী পাওয়া যায়। সূর্যমণি মেলার বিশেষ আকর্ষণ পুতুল নাচ, সার্কাস, গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী যাত্রাপালা, জাদু ইত্যাদি।

 

 

 


আরো সংবাদ