১২ আগস্ট ২০২০

ঢাকায় যাওয়ার বায়না

জীবনের বাঁকে বাঁকে
-
24tkt

খুব ছোট বেলায় বাবার কাছে বায়না ধরেছিলাম ঢাকায় যাওয়ার জন্য। আমার বয়স তখন পাঁচ-ছয় বছর হবে হয়তো? ছোট ফুপুুরা তখন ঢাকায় থাকতেন। আমি ঢাকায় যাবো, ফুপুর বাসায় যাবো, ঢাকায় ঘুরব, দেখব। এ নিয়ে কান্নাকাটি শুরু করে দিলাম। যেমন তেমন কান্না নয়, একেবারে মাটিতে গড়াগড়ি করে কান্না। গড়াগড়ি করে ঘর উঠোনের মাটি গায়ে মেখে একাকার করে ফেললাম। ঢাকায় না নিলে দুপুরের খাবারও খাবো না বলে জেদ ধরলাম। শেষে বাবা রাজি হলেন। গোসল ও খাওয়া সেরে নতুন জামা পরে সেদিন বিকেলেই আমি আর বাবা রওনা দিলাম ঢাকার উদ্দেশে।
কতক্ষণ লাগল জানি না, তবে একটি টেম্পোতে চড়ে খুব অল্প সময়েই আমরা ঢাকায় পৌঁছে গেলাম। বাবা আমাকে একটা বিশাল মাঠে নিয়ে গেলেন। সেখানে সভা-সেমিনার বা ওয়াজ মাহফিলের মতো কিছু একটা হচ্ছিল। আমি বাবার সাথে ঢাকায় এসেছি এই ভেবে তখন খুব খুশি। কিন্তু ফুপুুর বাসায় না গিয়ে এ আবার কোথায় এসে বসে আছি তা নিয়ে খুব অস্বস্তি হচ্ছিল। বাবাকে বারকয়েক জিজ্ঞেস করলাম, ‘বাবা, ফুপুুর বাসা কই? ফুপুুর বাসায় কখন যাবো?’ বাবা বললেন, ‘এই তো পাশেই বাসা। একটু পরেই যাবো আমরা।’
সময় যেন কাটছিল না। আমি ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। আশপাশের বিল্ডিংগুলোর দিকে তাকালাম যদি ফুপুদের দেখা যায়! কিন্তু আমাকে হতাশ হতে হলো। একসময় ক্লান্ত হয়ে বাবার কোলে ঘুমিয়ে পড়লাম।
ঘুম থেকে জেগে আমি নিজেকে আমাদের ঘরের বিছানায় আবিষ্কার করলাম। সকাল হয়ে গেছে। কাল বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত আমি তাহলে ঢাকায় ঘুরে এসেছি। আমার মনে খুশির জোয়ার, চোখে মুখে উল্লাস। আমার ভাইবোনরা আমাকে রাগাতে লাগল। বাবা নাকি আমাকে ঢাকায় নেননি। ফেনী শহর থেকে ঘুরিয়ে নিয়ে এসেছেন। আমার মনে সান্ত্বনা ছিল এই ভেবে যে, ওরা কেউ ঢাকায় যেতে পারেনি বলেই আমাকে হিংসা করছে।
এখন আমি জানি, সেদিন কিভাবে একটা টেম্পোতে করে এত অল্প সময়ে ফেনী থেকে ১৬১ কিলোমিটার দূরের ঢাকা শহরে গিয়েছিলাম। সত্যিই সেদিন ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়নি আমাকে। আমাকে নিয়ে যাওয়া সেই বিশাল মাঠটি ছিল বাড়ি থেকে আট কিলোমিটার দূরের ফেনী ওয়াপদা মাঠ। সে যাই হোক, আমার ছোট্ট মন তো ঢাকা থেকেই ঘুরে গিয়েছিল সেদিন। তবে সত্যি সত্যি ঢাকায় যাওয়ার জন্য আমাকে খুব বেশি দিন অপেক্ষা করতে হয়নি। এ ঘটনার বছরখানেক পরে ফুপুুর অসুস্থতার জন্য ফুপুুকে দেখতে বাবা-মা ঢাকায় গিয়েছিলেন। জীবনে প্রথমবারের মতো আমার ঢাকায় যাওয়া, প্রথম বাসে চড়া, মেঘনা ব্রিজ থেকে বড় বড় লঞ্চ দেখা, বুড়িগঙ্গা নদীতে প্রথম নৌকা ভ্রমণ, ঢাকা শহরের উঁচু উঁচু বিল্ডিং দেখা, ফুপুকে হাসপাতালে দেখতে গিয়ে প্রথমবারের মতো লিফটে ওঠা এবং পুরান ঢাকায় ফুপুুর বাসায় কাটানো সেই দিনগুলোর স্মৃতি চির অম্লান আমার কাছে। বাবা-মায়ের সাথে এটিই ছিল আমার প্রথম এবং একমাত্র ঢাকা ভ্রমণ। এর তিন বছর পরই বাবাকে হারাই। আজ বাবা নেই। এখন আমি ঢাকাতেই থাকি। বাবার কাছে ঢাকায় যাওয়ার বায়না ধরা, বাবার সাথে সেই প্রথম মিছেমিছি ঢাকা ভ্রমণ আর দেড় যুগ আগে বাবা-মায়ের সাথে সত্যি সত্যি ঢাকা ভ্রমণের সেসব সুখস্মৃতি এখনও আমাকে নাড়া দেয়।
শহীদ স্মৃতি হল, বুয়েট


আরো সংবাদ