০৬ আগস্ট ২০২০
বাবা দিবস

অভিমানী বাবা

-
24tkt

রাত ৩টায় হঠাৎ ডা: নাদিয়ার ফোন বিকট শব্দে বেজে উঠল। ওপাশ থেকে কণ্ঠ ভেসে আসে ম্যাডাম, একজন হার্টের পেশেন্ট ভর্তি হয়েছেন। রোগীর অবস্থা বেশি ভালো না। শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। চেয়ারম্যান স্যার আপনাকে ফোন দিতে বললেন। রোগীর বয়স কত? ম্যাডাম, ৬৩-৬৪ হবে হয়তো! ওকে সিস্টার, আপনি অক্সিজেন সিলিন্ডার রেডি করুন, আমি আসছি।
ডা: নাদিয়া ঢাকা মেডিক্যালের ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট ছিলেন। মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষায় সারা দেশের মধ্যে প্রথম হয়েছিলেন। রেটিনা-উদ্ভাস দুই কোচিং সেন্টারই তা ফলাও করে প্রচার করেছিল বছরব্যাপী। এক হুলস্থূল ব্যাপার! মাত্র দুই বছর আগে এমবিবিএস করে জয়েন্ট করেছেন ধানমন্ডির ইবনে সিনা হাসপাতালে। জুনিয়র হলেও সাঙ্ঘাতিক নামডাক ডা: নাদিয়ার। হাসপাতালের ক্রিটিক্যাল অপারেশনগুলোতে এখন ডা: নাদিয়ার জুড়ি মেলা ভার। বিসিএস আর উচ্চতর ডিগ্রির জন্য এখনো রাত-দিন পড়ালেখা করতে হয়। আসলে মেডিক্যাল মানেই তো লেখাপড়া। ডাক্তারি বিদ্যায় পড়ালেখার কোনো কূলকিনারা নেই। মানবসেবার ব্রত নিয়েই ডাক্তারি বিদ্যা পড়তে হয়।
আজিমপুর থেকে ধানমন্ডি মাত্র ১০ মিনিটের দূরত্ব! দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে যান ডা: নাদিয়া। রোগীর তখনো শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। রোগীর মুখের দিকে তাকিয়েই ডা: নাদিয়া বললেন, ওনার আইসিইউ লাগবে। কুইক। প্রাথমিক মেডিসিন লিখে কিছু আর্জেন্ট পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিলেন। এক ঘণ্টার মধ্যেই রিপোর্ট হাতে চলে এলো। রিপোর্ট ভালো না। রাতেই অপারেশন লাগবে।
সবকিছু রেডি হতে লাগল। বিভাগীয় প্রধান ডা: মুকিত চৌধুরী এসেছেন কেবিনে। ডা: নাদিয়ার দিকে তাকিয়ে মুকিত চৌধুরী বললেন, কি মা! হায়দার সাহেবকে ফেরাতে পারবে তো? আল্লাহ ভরসা স্যার! আপনি দোয়া করবেন। অফকোর্স মাই ডটার, আই নো, ইউ উইল বি সাকসেস! আই প্রে ফর ইউ। বাই দ্য বাই, ভদ্রলোক অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী। ওখানে একটা কলেজে অধ্যাপনা করেন। এক সপ্তাহ হলো দেশে এসেছেন। ভীষণ অভিমানী মানুষ! এ দেশে তার আপনজন থেকেও নেই।
ডা: নাদিয়া বাসায় ফোন করে তার আম্মুকে জানিয়ে দিলেন। আম্মু, একটা জরুরি ওটি হবে। ফিরতে দেরি হবে, চিন্তা করো না। হায়দার সাহেবকে দেখে নাদিয়ার বুকের মধ্যে একটা মোচড় দিয়ে ওঠে। এখন রাত প্রায় ভোর হতে চলল। ভদ্রলোক শিশুর মতো ঘুমাচ্ছে। মাঝে মধ্যে ব্যথায় কঁকিয়ে উঠছে। মানুষ ঘুমালে খুব নিষ্পাপ লাগে। হায়দার সাহেবকে দেখে নাদিয়ার নিজের বাবার কথা মনে পড়ছে। তার চেহারা এখন কেমন হতে পারে কল্পনা করতে থাকে। বাবার ইয়ং বয়সের ছবি দেখেছে নাদিয়া । অনেক স্মার্ট ছিলেন বাবা। আম্মু বলে, আমি দেখতে নাকি অবিকল বাবার মতো হয়েছি। বাবার কার্বন কপি। বাবা বেঁচে থাকলে হয়তো এমন বয়সই হবে।
খুব সুখের জীবন ছিল নাদিয়াদের। নাদিয়ারা দুই বোন। তার বাবার ইচ্ছা ছিল আরো একটা সন্তান নেয়ার। একটা ছেলের খুব শখ ছিল নাদিয়ার বাবার। এত সুখের মধ্যেও বাবার বুকের মধ্যে ছেলের জন্য তার একটা হাহাকার ছিল। কিন্তু নাদিয়ার আম্মু তাতে বেঁকে বসেন। তার আম্মু একটা কলেজের ইংরেজি শিক্ষিকা। তিনি জানিয়ে দেন, ‘আমার আর সন্তান নেয়া সম্ভব নয়। ধরো একটা ছেলে হলো, তাতে কী লাভ হবে?’ এই সাধারণ ব্যাপার নিয়ে বাবা চরম অভিমান করে বসে আম্মুর ওপর। তার বাবা ভিসা নিয়ে বিদেশে চলে যান। প্রায় ২০ বছর হলো নাদিয়ার আম্মুর সাথে আর কোনো যোগাযোগ রাখেন না। পরিবারের সাথেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।
অপারেশন সফল। পাঁচ ঘণ্টা লেগেছে অপারেশন শেষ করতে। বাসায় ফিরে ডা: নাদিয়া যেন বিশ্বজয়ের আনন্দে ঘুমাচ্ছে। আবারো হাসপাতাল থেকে ফোন...। ম্যাডাম, হায়দার সাহেবের জ্ঞান ফিরেছে! ডা: নাদিয়া শব্দ করে বলে উঠলেন, আলহামদুলিল্লাহ। সিস্টার বললেন, ম্যাডাম ভদ্রলোক আপনাকে দেখতে চাচ্ছেন। ওকে, আমি সন্ধ্যায় আসব।
নাদিয়ার আম্মু কফি হাতে নিয়ে নাদিয়ার বিছানার পাশে এসে দাঁড়ান। নাদিয়া জুমে মিটিং করে হায়দার সাহেবের খোঁজ নিচ্ছেন। তিন দিন পার হয়ে গেছে আপনি এখন ঝুঁকিমুক্ত। তবে খুব সাবধান থাকবেন। আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ মা। আপনি আমার নতুন জীবন দান করেছেন। না আঙ্কেল, জীবন-মরণ আল্লাহর হাতে। আমরা চেষ্টা করি মাত্র।
মোবাইলে হায়দার সাহেবের ছবি দেখে নাদিয়ার আম্মু আঁতকে ওঠেন। কফির মগটা হাত থেকে পড়ে যায়। নাদিয়া বলল, কি ব্যাপার আম্মু এনি প্রবলেম? তুমি কি ওনাকে চেনো নাকি? নাদিয়ার আম্মুর দু’চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। হ্যাঁ মা, আমি চিনি। তার মুখের বামপাশে একটা কালো দাগ আছে। তুই ছবিতে দেখিসনি! তিনিই তোর সেই হারিয়ে যাওয়া অভিমানী বাবা!
লালবাগ, ঢাকা।


আরো সংবাদ