০২ জুলাই ২০২০
পাঠক সংখ্যা

গল্পটা একাত্তরের

-

ঘুম আসে না ফজিলার। বারান্দায় এসে দাঁড়াল সে। বাইরে মৃদু বাতাস বইছে। ঝিঁঝি পোকা ডাকছে। বাড়ির সামনে নদী। নদীর ধারে বুনোঝোপ। ঝোপে ফুটেছে নানান রঙের বুনোফুল। বুনোফুলের সুগন্ধে চারপাশ ভরে উঠেছে। পূর্ণিমার চাঁদ থালাভর্তি আলো গলগল করে ঢালছে পৃথিবীর বুকে। চারপাশটা রূপালি আলোয় ফকফকা। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল ফজিলা। স্মৃতিগুলো এসে ভিড় জমালো মনের জানালায়।
জাফর। বাবার বন্ধুর ছেলে। বিদেশে লেখাপড়া শেষ করে দেশে ফিরেছে কয়েক দিন আগে। বেশ সুদর্শন যুবক। টগবগে ফিগার। দেশে ফিরেই সে এলো সুখপুর গ্রামে। ফজিলাদের বাড়ি। ছবির মতো সুন্দর গ্রাম দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল সে। বিদেশে এত সুন্দর গ্রাম কখনো দেখেনি ও। তখন ফাল্গুন মাস। চারদিক মাতাল হাওয়া বইছে। গাছ থেকে মড়মড় শব্দে শুকনো পাতা ঝরছে। বাঁশঝাড় শনশন করছে। নদীর ধারে নানারকম বুনোফুল ফুটেছে। বুনোফুলের ঘ্রাণ সুগন্ধে ভরে রেখেছে চারপাশ। সবমিলে গ্রামে এক মনকাড়া পরিবেশ। জাফর ঠিক করল সে এই গ্রাম ছেড়ে আর শহরে যাবে না। এখানে থেকে যাবে। ফজিলাকে বিয়ে করবে। গ্রামে একটা স্কুল করবে। ছেলেমেয়েদের পড়াবে। যে ভাবা সে কাজ। সে গ্রামে একটা স্কুল দিলো। নদীর ধারে। বুনোঝোপের পাশে। স্কুলে গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়াতে লাগল। সে এখন নদীর তীরে, বুনোঝোপের পাশে বসে ফজিলার সাথে গল্প করে। কখনো বুনোফুল এনে ফজিলার খোঁপায় গুঁজে দেয়। কখনো নদীর শীতল পানি ফজিলার মুখে ছিটিয়ে দেয়। মন রাঙানো শিমুল, পলাশ ফুল এনে দেয় ফজিলার হাতে। ফজিলা খুশি হয়। খুশি হয়ে জাফরের হাত ধরে। খালি পায়ে শুকনো পাতার ওপর দু’জনে পাশাপাশি হাঁটে। খুনসুটি করে। হাসে। তাদের প্রেম এগিয়ে যায় প্রণয়ের দিকে। মুরুব্বিরা বসন্তের শেষদিনে তাদের বিয়ের দিন ঠিক করে।
তখন উনিনশো একাত্তর সাল। দেশের অবস্থা ভালো নয়। থমথমে। দুই পাকিস্তানের বিরোধ চরমে উঠেছে। এক কালোরাতে পশ্চিম পাকিস্তান আকস্মিক হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর। পাখির মতো গুলি করে মারতে লাগল বাঙালিদের। কয়েক দিনের মধ্যে বাঙালিরাও ঘুরে দাঁড়াল। প্রতিরোধ গড়ল। মুক্তিবাহিনী গড়ে তুলল। জাফর বসল ফজিলার সামনে। পরম মমতায় ফজিলার নরম হাত দু’টি নিজের হাতে নিলো। ফজিলা।
হুমম।
আমি যাচ্ছি মুক্তিযুদ্ধে। মা ও মাটিকে রক্ষা করতে। তুমি দোয়া করো। আমরা দ্রুত মেলিটারিদের পরাজিত করব। আমরা একটা স্বাধীন দেশ পাবো। আলাদা পতাকা পাবো। আলাদা আকাশ পাবো। যেখানে আমরা প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিতে পারব।
ফজিলা কথা বলতে পারে না। শুধু তিরতির করে তার ঠোঁট দুটো কেঁপে ওঠে।
জাফর তার জলেভেজা দুই চোখে আলতো করে চুমু দেয়। তারপর ধীরে ধীরে চলে যায়। যোগ দেয় মুক্তিযুদ্ধে।
দুই মাস হলো জাফরের কোনো হদিস নেই। কোনো চিঠি নেই। কোথায় আছে কোনো খবর নেই। জাফর কী বেঁচে আছে?
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ে ফজিলা। আঁচল দিয়ে চোখের কোণা মুছে। তখন এক পশলা শীতল বাতাস এসে ঝাপটা মারে ওর চোখ মুখে।
সেতাবগঞ্জ, দিনাজপুর।


আরো সংবাদ