২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০

মাসুরি ঝরনায় একদিন

-

খুব ভোরে আমরা ছয় বন্ধু মাইক্রোতে চড়ে বসলাম। গত রাতেই প্ল্যান হয়েছে উত্তরাখণ্ডের মাসুরি যাওয়ার। রাত গভীর হওয়ার আগেই যেন ফিরে আসা যায়, তাই এত আগে রওনা হয়েছি। মাইক্রো চলতে শুরু করল একসময়। সকালের স্নিগ্ধ বাতাস আর গাড়ির প্রবল ঝাঁকুনিতে তন্দ্রা এসে চোখে জড়ো হয় বারবার। না ঘুমিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখে চললাম। প্রায় তিন ঘণ্টার মাথায় উত্তরাখণ্ড প্রদেশে প্রবেশ করলাম। পুরো প্রদেশটাই যেন সুন্দরের নিকুঞ্জ। শুরু থেকেই চোখে এসে ধরা দিতে লাগল প্রকৃতির অপরূপ ছবি। রাস্তার দু’পাশে বুনো জঙ্গল। গাছে গাছে নাম না জানা হাজারো পাখির গান। মাঝে মধ্যে হঠাৎই গাড়ির সামনে দিয়ে দৌড়ে যায় পাহাড়ি বানর। একটু পর নজর আটকালো শুষ্ক খালের ওপর। বর্ষাকালে হয়তো কলকল ধ্বনিতে পানি প্রবাহিত হয়। পানি চলার রেখা এখন অবধি বিদ্যমান। একটু পর শুরু হলো পাহাড়ে চড়া। মাসুরির মূল শহর আর ঝরনাটি পাহাড়ের সর্বোচ্চ চূড়ায়; প্রায় সাত হাজার ফুট উপরে। পাহাড়ের গা-ঘেঁষে পিচের সরু পথ। পুরো পথটি পাহাড় কেটে অভিনব পদ্ধতিতে তৈরি। হাজারো গাড়ির সাথে এগিয়ে চলছে আমাদের মাইক্রোটাও। উপর থেকে বহুদূর পর্যন্ত নজরে আসে। নিচের সবুজ গাছগুলো দেখলে মনে হয় সবুজে ছাওয়া বিশাল একটি প্রান্তর। পাহাড়ের পাদদেশে বিশাল খাদ। রাস্তার দু’পাশে লোহার রেলিং দেয়া। গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যেন খাদে না পড়ে যায়, সে জন্য এ ব্যবস্থা। একটু পরপর বাঁক। মোড় নিতে গেলে গা ছমছম করে। এই বুঝি সামনের কোনো গাড়ির ধাক্কায় খাদে পড়ে যাই! কিন্তু না। রাস্তাটা বিপজ্জনক হলেও অ্যাক্সিডেন্টের হার শূন্যের কোঠায়। ক্রমেই মেঘের কাছাকাছি হচ্ছি বলে শীত শীত লাগছে গায়ে। সেখানকার শীতের কথা আগেই জানা ছিল। তাই সঙ্গে করে শীতবস্ত্রও নিয়ে এসেছি। ব্যাগ থেকে চাদরটা জড়িয়ে নিলাম গায়ে। একের পর এক বাঁকে মোড় নিতে গিয়ে মাথাটাও ঘুরছিল। তবুও বাইরের অনিন্দ্য রূপে মুগ্ধ হয়ে এগোতে থাকলাম। দূরে যোজন যোজন পাহাড়। তার পেছনেও বরফে ঢাকা বিশাল শুভ্র পর্বত। মনে আশা জাগল, একবার যদি সেখানটায় যেতে পারতাম! সইতে না পেরে বলেই ফেললাম ড্রাইভারকে। কিন্তু ড্রাইভার বললেন, ‘কাছে দেখা গেলেও পাহাড়টা বেশ দূরে। পুরো একদিন লাগবে যেতে।’ সেখানে যাওয়ার আকাক্সক্ষা মনেই সমাহিত করলাম তার কথা শুনে।
একটা টি-স্টলের সামনে খানিকটা যাত্রাবিরতি দিলেন ড্রাইভার। পাহাড়ের এক পাশে মাত্র একটি টি-স্টল। অদ্ভুত সুন্দর লাগছিল দৃশ্যটা। দূরে সারি সারি সবুজ পাহাড়ের অপরূপ সৌন্দর্য দেখে বারবার হারাচ্ছিলাম কেবল নন্দন মুগ্ধতায়। চা পান করে ফটো তুলে নিলাম কয়েকটা। ফের চড়ে বসলাম গাড়িতে। প্রায় দুই ঘণ্টা পর পৌঁছলাম মাসুরির ঝরনার কাছে। গোসলের কাপড় নিয়ে হুড়মুড় করে নামলাম গাড়ি থেকে। অনেক সিঁড়ি ভেঙে নিচে এসে দাঁড়ালাম ঝরনার কাছে। জীবনে এই প্রথম দেখলাম ঝরনা। আনন্দ আর বিস্ময়ের সীমা রইল না। পাথরের গা ছুঁয়ে অবিরাম কলকল ধ্বনিতে গড়াচ্ছে টলটলে পানি। এর চেয়ে সুন্দর দৃশ্য আর হয় না। ঝরনার পানির ওপর ছোট্ট একটা ব্রিজ। সেখানে উঠে বন্ধুদের সাথে আনন্দে মেতে রইলাম কতক্ষণ। ঝরনার পেছনে রেখে ফটো তুলে নিলাম কয়েকটা। অনেকেই গোসল করছে ঝরনার পানিতে। চার পাশটা সুইমিংপুলের মতো সাদা পাথর দিয়ে বাঁধানো। কাপড় বদল করে আমরাও নেমে পড়লাম ঝরনার পানিতে। ঠাণ্ডায় যেন বরফ বনে গেলাম। ঠকঠক করে কাঁপছি। আনন্দ একটু কমল না তবুও। যারা ঘুরতে এসেছেন সবাই অনাবিল আনন্দে ভাসছে। ঝরনায় দাঁড়িয়ে সেলফি তুললাম। সাঁতার কাটলাম মনভরে। মূল ঝরনার নিচে দাঁড়িয়ে গা ভিজিয়ে নিলাম। পরস্পরে পানি ছিটিয়ে মজা করলাম বেশ কিছুক্ষণ। গোসলপর্ব শেষ করে আরেকটু উপরে উঠলাম ঝরনার মূল উৎস দেখব বলে। কিন্তু একটু উপরে ওঠার পর রাস্তা বন্ধ। তাই উৎসটি দেখা হলো না আর। দুপুরের খাবার শেষ করে গাড়িতে ফের চড়ে বসলাম। গাড়িচালক আমাদের নিয়ে চললেন মাসুরির মেইন স্পট ‘মালরোড’। ঘণ্টাখানেক পর পৌঁছলাম সেখানে। পাহাড়ের সর্বোচ্চ চূড়া এটি। এক কোণে এসে নিচে তাকালাম। আমি যেন মহাশূন্যে ভাসছি! হাজার হাজার ফুট উঁচু থেকে নিচের পৃথিবীটা দেখলাম সম্পূর্ণ ভিন্নরূপে। বিশাল দালানগুলোকে মনে হচ্ছে সাদা কিছু পলিথিন পড়ে আছে! গাড়িগুলো যেন ছোট ছোট পিঁপড়া। পাহাড়ের কোলঘেঁষে খোপের মতো ছোট ছোট ঘর। কোনোমতে ঝুলে আছে যেন। জুমচাষ করে কাটে তাদের জীবন। উপর-নিচে বারবার আসা-যাওয়া করেও যে এখানের মানুষ ক্লান্ত হয় না, সেটাই অবাক করার বিষয়। পাহাড়ের সাথে সখ্য গড়ে উঠেছে বলেই হয়তো সম্ভব। আমরা হেঁটে হেঁটে পাহাড়ের আরেকটু উপরে উঠলাম। বর্ষাকালে নাকি এখানে মেঘেরা ভেসে বেড়ায়। হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায়। সেদিন ছিল রৌদ্রোজ্জ্বল দিন। মেঘের দেখা মিলল না তাই। সে আফসোসটা রয়েই গেল। সূর্যটা ক্রমেই হেলে পড়ছে পশ্চিমাকাশে। সন্ধ্যা নামতে বেশি সময় বাকি নেই। পাহাড়ের জগৎটা মনে নিবিড়ভাবে দৃশ্যায়ন করে ফিরে চললাম আপন গন্তব্যে।

 


আরো সংবাদ