২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০

অশ্রুজল

চারাগল্প
-

চার দিকে কুয়াশা পড়েছে বেশ। দু-চার দিন ধরে রোদের দেখা নেই। শীতকাল কিন্তু শীত লাগছে না। ইজি চেয়ারে বসে দোল খাচ্ছিলেন আর পত্রিকা পড়ছিলেন আনিস সাহেব। তার মুখে গোমড়া ভাব, পত্রিকাও আজকাল পড়তে ইচ্ছা করে না। কত দুঃখের খবর থাকে পত্রিকার পাতাজুড়ে। গুম, খুন, হত্যা, ধর্ষণ যেন থামছেই না। আনিস সাহেবের দারুণ খারাপ লাগে। আজকাল তাই তিনি গুম, খুন, ধর্ষণের খবরগুলো বাদ দিয়ে পড়েন। আজকাল তার নজর থাকে সাহিত্য পাতায় কিংবা ফিচারে।
আনিস সাহেব স্ত্রীকে হারিয়েছেন ১০ বছর আগে। তার বড় ছেলে তখন ইন্টার পরীক্ষা শেষ করেছে। ছোট মেয়েটা ক্লাস টেনে পড়ে। স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি ছেলেমেয়েদের বুকে আগলে রাখেন। বড় ছেলেটা এখন আমেরিকায় থাকে। বিয়েও নাকি করেছে সেখানে। আর ছোট মেয়েটা কানাডায়। আনিস সাহেবের জন্য প্রতি মাসে তারা টাকা পাঠায়। এতে আনিস সাহেবের দিব্যি চলে যায়। মাঝে মধ্যে প্রচুর নিঃসঙ্গতায় ভোগেন তিনি। তাই তো তার বাসার কাজের লোক মফিজের সাথে কথা বলেন। মফিজ অবশ্য এতে, ‘হু হ্যাঁ, জ্বি স্যার’ ছাড়া আর কিছুই বলে না।
সকালবেলা মর্নিং ওয়ার্ক শেষে টংয়ের দোকানে চা খাচ্ছিলেন তিনি। আশপাশে কত মানুষ একে অপরের সাথে কথা বলছে। তিনি পাচ্ছেন না কাউকে। তার এই নিঃসঙ্গতা দূর করতে হঠাৎ করেই উদয় হলো পাশের বাসার করিম সাহেব। তিনি খুশি হলেন। দু’জনেই আলোচনা করলেন নানা বিষয় নিয়ে। আনিস সাহেব বললেন, ‘বিকেল বেলা কী করেন? আমার বাসায় আসেন। দু’জনে একসাথে গল্পগুজব করি?’ করিম সাহেব বললেন, ‘আজকাল কোমরের ব্যথাটা যা বেড়েছে। তারপর আবার সেদিন বাথরুমে পা পিছলে পড়ে গেলাম। বিকেলবেলা দারুণ আলস্য লাগে ভাই। আর আমার নাতিটা তো আমায় ছেড়ে থাকতেই পারে না। সারাদিন শুধু দাদু দাদু করে।’ আনিস সাহেব বললেন, ‘আপনার তো তাও নাতি আছে। সময় কেটে যায়। আমি একলা থাকি, আর আছিই বা ক’দিন। সারাজীবন বন্ধু-বান্ধব, অফিসের কলিগদের সাথে কত আড্ডাই না দিয়েছি। আর এখন গল্প করার জন্য মানুষ পাচ্ছি না ভাই। হা হা হা।’ তাদের গল্পগুজব চলতে থাকে। একপর্যায়ে দোকান থেকে উঠে বাসার দিকে হাঁটতে শুরু করেন দু’জন।

২.
বিকেলবেলা আলসেমি ঝেড়ে বাইরে বের হলেন আনিস সাহেব। বাইরে বের হয়েই বুঝতে পারলেন, আজ তার শরীরটা বেশ ফুরফুরে লাগছে। ভাবলেন, একটা সিগারেট জ্বালাবেন কি না। কিন্তু পরক্ষণে সে চিন্তা মাথা থেকে বের করে দিলেন। সিগারেট খাওয়ার বয়স নেই এখন। ভাবলেন চা খাবেন এক কাপ। চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছিলেন তিনি। হঠাৎ তার সামনে একজন মহিলা হাত পেতে করুণ গলায় বলল, ‘স্যার! আমগোরে কিছু সাহায্য করেন। পোলাডার অসুখ। খাইতে লইতে পারি না। চিকিৎসা করোনের টাহা নাই।’ চায়ের দোকানদার কঠিন করে বললেন, ‘যাও যাও! কাম নাই কাইজ নাই, সারাদিন ভিক্ষা।’ এই বলে তিনি ক্যাশবাক্স থেকে পাঁচ টাকার একটি নোট বের করে দিলেন। আনিস সাহেব বললেন, ‘কী হয়েছে ছেলেটার?’ মহিলা বলল, ‘হেইদিন রাস্তা দিয়া আওনের সময় মোটরসাইকেলের নিচে চাপা পড়ছে। একখান পা ভাইঙ্গা গেছে। চিকিৎসা করোনের মতো টাকা নাই।’
ছেলেটা চোখ বুজে আছে। তার কপালে ক্ষতের দাগ শুকিয়ে গেছে। পায়ে চামড়া ছিলে গেছে। মাছি ভন ভন করছে। আনিস সাহেব তেমন বেশি টাকা নিয়ে বের হন না। পকেটে হাত দিয়ে একশ’ টাকার একটি নোট বের করলেন। দিলেন মহিলাটির হাতে।
মহিলাটা চলে গেল। কিছু দূর যেতেই হাত পাতল। আনিস সাহেব চা না শেষ করেই উঠে পড়লেন। দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে রইলেন কিছুক্ষণ।
রাতে ঘুমানোর সময় তার মাথায় চিন্তার উদয় হলো। তিনি ভাবলেন, ইসস! ছেলেটা কত কষ্টেই না আছে। মহিলাটিকে আরো কিছু টাকা দেয়া দরকার ছিল।

 


আরো সংবাদ