৩১ মার্চ ২০২০

বই চুরি

-

কিশোর বয়স থেকেই আমার একটা বদ অভ্যাস ছিল, সেটা হলো বই চুরি করা। বই চুরির কলাকৌশল আমি বেশ নিখুঁতভাবেই রপ্ত করে ছিলাম। তাই বলে সব সময়ই যে পার পেয়ে যেতাম, তা কিন্তু নয়। মাঝে মধ্যে হাতেনাতে ধরাও পড়েছি এবং চরম অপমানিত হয়েছি। তবুও অভ্যাসটা তখন বদলাতে পারিনি। লাজলজ্জা ভুলে আবার বই চুরি করেছি। আমি তখন বই চুরি করা অপরাধ মনে করতাম না। পৃথিবীর বহু বিখ্যাত লোকের জীবনে বই চুরির অভিজ্ঞতা আছে। তাই আমি বই চুরি করলে এটাতে কোনো দোষের কিছু নেই। যিনিই আমাকে এই ব্যাপারে তিরস্কার করতেন, তার বই চুরি করে অপমানের শোধ নিতাম। অবশ্য বই চুরির পেছনে আমাকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছিলেন আমেরিকার বিখ্যাত রম্য লেখক মার্ক টোয়েন। তিনিও ছিলেন বই চুরিতে একজন সিদ্ধ পুরুষ। যা হোক, আমার জীবনে বই চুরির অভিজ্ঞতা থেকে কিছু মজার ঘটনা বলছি।
এক.
তখন আমি অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। এক বন্ধুর বাসায় বেড়াতে গিয়ে দেখি, ওদের পড়ার টেবিলের এককোণে যতœ করে রাখা আছে হুমায়ূন আহমেদের ‘এলেবেলে’ বইটি। রুম থেকে বের হওয়ার সময় আমিও যতœ করে বইটি আমার জাম্বু টাইপের জ্যাকেটের ভেতর ঢুকিয়ে দিই। তারপর ড্রয়িং রুমে বসে আধা ঘণ্টা সময় আড্ডা দিয়ে বিদায় নিয়ে চলে আসি। সেদিন রাতেই ওই বন্ধুর বড় ভাই আমাদের বাসায় এসে হাজির। আমাকে বইয়ের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতেই আমি যেন আকাশ থেকে মাটিতে পড়লাম। আমার অভিনয়ে তিনিও দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েন। তবুও তিনি নাছোড়বান্দা হয়ে আমাকে বইটি ফেরত দিতে চাপ দিচ্ছেন। একপর্যায়ে তিনি কসম কেটে বললেন, ‘যদি তুমি ওই বইটা ফেরত দাও, আমি তোমাকে এখনই তিন গোয়েন্দা সিরিজের দুটো বই এনে দেবো।’ শেষ পর্যন্ত তিন গোয়েন্দা সিরিজের দু’টি বই পাওয়ার লোভে ওই বইটা ফেরত দিলাম। তবে ফেরত দেয়ার আগে ভালো মতো চেক করে দেখি ওই বইয়ের ভেতরে লুকিয়ে আছে ভাইয়ার একটা প্রেমপত্র। ভাগ্যিস, তখন প্রেমপত্রটা রেখে দিয়েছিলাম। তাই অনাগত বিপদ থেকে প্রেমপত্রটা রক্ষাকবজের কাজ করেছিল।
দুই.
এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে আমার আম্মুকে নিয়ে নানার বাড়িতে বেড়াতে গেলাম। তখন বেশ কিছু গল্পের বই ব্যাগে ভরে নিয়ে গিয়ে ছিলাম। আশপাশের যারাই আসতেন, আমার বইগুলো দেখে ধার চাইতেন। আমিও হাসিমুখে দিয়ে দিতাম। তবে হ্যাঁ, তাদের কাছ থেকেও নতুন কোনো বই পড়ার জন্য ধার নিয়ে আসতাম। এভাবে পাঁচ-ছয়জনের কাছ থেকে ১০-১২টা বই সংগ্রহ করে নিলাম। নানাবাড়ি থেকে ফিরে আসার আগের দিন আমার সব বই ফেরত নিয়ে আসি। আমি ফেরত দেয়ার সময় বলি, বইয়ের শেষাংশে কিছু বাকি আছে। আজকে রাতের মধ্যে বইটা পড়ে শেষ করে টেবিলের ওপর রেখে যাবো। আগামীকাল এসে নিয়ে যাবেন। আমি পরের দিন সকালে সবগুলো বই বেঁধে চম্পট দিই। এতগুলো বই দেখে আমার আম্মু জানতে চাইলেন, বইগুলো কোথায় পেলাম? আমি জানাই, এগুলো উপহার পেয়েছিলাম। তারপর টানা দুই বছর নানার বাড়িতে যাইনি।
তিন.
কলেজে ছাত্রাবস্থায় বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক ইভেন্টে অংশগ্রহণ করতাম। এখনকার সময়ে পুরস্কার হিসেবে ক্রেস্ট কিংবা মেডেল দেয়া হলেও আমাদের সময়ে পুরস্কার হিসেবে দেয়া হতো মহামূল্যবান বই। একবার এক বিতর্ক প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করে আমি পেলাম তিনটি বই আর যে তৃতীয় স্থান অধিকার করে, সে পেল একটি বই। মজার ব্যাপার হলো, তৃতীয় স্থান অধিকারীর বইটি আমার ভীষণ পছন্দ হয়ে যায়। সেটি ছিল সৈয়দ মুজতবা আলীর রম্য গল্পের বই ‘পঞ্চতন্ত্র’। বিভিন্নভাবে তাকে বুঝলাম ওই বইটা আমাকে দিয়ে দিতে, তার বিনিময়ে তাকে দেবো দু’টি বই। এতেও সে রাজি হয়নি। কারণ এটাই তার জীবনে প্রথম কোনো পুরস্কারপ্রাপ্তি। এই বইয়ের ভেতরে তার নামসহ পুরস্কারপ্রাপ্তির বিবরণ লেখা আছে। তাই এই বইটি স্মৃতি হিসেবে রেখে দেবে, কোনোভাবেই হাতছাড়া করবে না। কোনো উপায় না দেখে শেষ পর্যন্ত অত্যন্ত সুচারু কৌশলে ওই বইটা চুরি করতে বাধ্য হলাম। বই চুরি হওয়ায় সে ভীষণ কষ্ট পায় এবং নীরবে চোখের পানি ফেলে। তার অবস্থা দেখে আমিও বেশ কষ্ট পাচ্ছিলাম। তাই তার চোখের পানি মুছে দিয়ে আমার একটি বই তার হাতে তুলে দিই। ওই বইটা চুরি করে দীর্ঘ দিন আমি অনুশোচনায় ভুগে ছিলাম।
চার.
প্রবাদে আছে, চোরের দশ দিন তো গৃহস্থের এক দিন। প্রবাদের বাণী আমার ক্ষেত্রেও সত্য প্রমাণিত হয়েছিল। প্রতি বছরই বইমেলায় ভিড়ের মধ্যে সুযোগ বুঝে বই চুরি করতাম। একবার অনার্সে পড়ার সময় চার বন্ধু মিলে একুশে বইমেলায় ঘুরতে গেলাম। বাংলাদেশের একটি স্বনামধন্য প্রকাশনীর স্টলের সামনে তখন বেশ জটলা বেঁধে আছে। আমিও তখন ঝোপ বুঝে কোপ মারতে এগিয়ে গেলাম। গিয়ে দেখি প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক অধ্যাপক জাফর ইকবাল স্যারকে ঘিরে এই জটলা। সবাই তার নতুন বই কিনে অটোগ্রাফ নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ঠিক তখনই আমি ওই স্টল থেকে তার ‘জলমানব’ বইটা নিয়ে জটলার ভেতরে ঢুকে যাই। আমার বন্ধুরাও আমাকে অনুসরণ করে একই কাজ করল। আমি সেলসম্যানের চোখ ফাঁকি দিতে পারলেও তারা সেটা পারেনি। তাই সেলসম্যান আমাদের অনুসরণ করে পেছন থেকে এগিয়ে আসে। যেই না আমরা অটোগ্রাফ নিয়ে কেটে পড়ব, ঠিক তখনই বই চোর বলে আমাদের পেছন দিক থেকে দু’জন সেলসম্যান জাপটে ধরে। খুবই অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে পড়েছিলাম, সেই ঘটনা আর নাইবা বলি। যা হোক, জাফর ইকবাল স্যার সেই যাত্রায় আমাদের বাঁচিয়ে দিলেন। তবে ওয়াদা করিয়ে নিলেন, ভবিষ্যতে যেন এভাবে বই চুরি না করি। বাস্তবে ওটাই ছিল আমার জীবনের শেষ বই চুরি।
চৌধুরীপাড়া, মালিবাগ, ঢাকা


আরো সংবাদ