২১ অক্টোবর ২০২০

দর্পচূর্ণ

চারাগল্প
-

এই কুয়াশা ঝরা সন্ধ্যার পড়ন্ত শীতে মা রান্নাঘরে মহা আয়োজনে তিনটি হাঁস কুটতে ব্যস্ত। আজ আমাদের বাড়িতে হাঁসপার্টি হচ্ছে। শীতকালে আজকাল গ্রামে হাঁসপার্টি নামক এক ধরনের আধুনিকতা শুরু হয়েছে।
হাঁসের সাথে রুটিও খাওয়া হবে। মা বিকেলেই রুটি বেলেছেন। হাঁসপার্টির এই আয়োজনের উদ্যোক্তা মূলত নজরুল ভাই। গতকাল মাকে হঠাৎ করে জানালেন এই আয়োজনের কথা। মা কোনো কথা না বলে একবাক্যে রাজি হয়ে গেলেন। এই পার্টিতে সুদূর কুমিল্লা থেকে আসবেন রনি ভাই। নজরুল ভাইয়ের বিশেষ বন্ধু রনি ভাই। ফেসবুকে দু’জনের পরিচয়।
বিকেলে নজরুল ভাই আমাকে আর রানা ভাইকে ডেকে বললেন, ‘তোরা পাঞ্জাবি পরবি। আর শোন, রনির সামনে উল্টাপাল্টা কথা বলবি না। সুন্দর করে সালাম দিবি।’ আমি আর রানা ভাই বললাম, ‘আচ্ছা’।
সন্ধ্যার পরে দুনিয়ার ফলফলাদি নিয়ে এক দারুণ ছেলে আমাদের বাড়ি এলো। নজরুল ভাই মাকে, রানা ভাইকে আর আমাকে ডেকে পরিচয় করালেন সেই দারুণ ছেলের সাথে। ‘রনি, উনি আমার মা। আর ওরা রানা ও রঞ্জু। আমার দুই ভাই।’ নজরুল ভাই পরিচয় করিয়ে দেয়ার পর রনি ভাই মাকে পা ছুঁয়ে সালাম করলেন। কোট প্যান্ট আর টাই পরা রনি ভাই রানা ভাইকে বললেন, ‘তুমি ভালো আছো রানা? নজরুলের কাছে তোমার অনেক গল্প শুনেছি।’ রানা ভাই মুচকি হাসলেন। রনি ভাই আমার সাথে কথা না বলে শুধু কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। আমি রনি ভাইকে সালাম দিলাম। রনি ভাই সালামের উত্তর নিয়ে বললেন, ‘তুমি তো খুব সুন্দর। কে তুমি?’ আমি কোনো কিছু বলার আগেই নজরুল ভাই বললেন, ‘ও রঞ্জু। ওটাও আমার ভাই। এবার সেভেনে পড়ে।’
২.
রাত ৯টায় হাঁস ভোজনের এলাহি কাণ্ড শুরু হলো। আমরা সবাই মহা উল্লাসে হাঁস দিয়ে রুটি খেলাম। মায়ের রান্নার প্রশংসা করে রনি ভাই বললেন, ‘খালাম্মা দারুণ রেঁধেছেন। এত চমৎকার রান্না জীবনে আর খাইনি।’ মা ম্লান হাসলেন।
চরম শীতের কারণে রাত ১০টার দিকে যে যার বিছানায় চলে গেলেও নজরুল ভাই বললেন, ‘আমি আর রনি আজ রাতে ঘুমাব না। দু’জন বারান্দায় চেয়ার পেতে বসে গল্পে গল্পে রাত পার করব।’
সত্যি সত্যি তাই লো। শীত উপেক্ষা করে অনেক রাত পর্যন্ত নজরুল ভাই আর রনি ভাই বারান্দায় বসে গল্পের আসর তুললেন। আমি পাশের রুমে কম্বল গায়ে আয়েশ করে শুয়ে আছি আর নজরুল ভাই ও রনি ভাইয়ের গল্প শুনছি। গল্পের একপর্যায়ে রনি ভাই বললেন, ‘আচ্ছা, রঞ্জু নামে তোর এত কিউট একটি ভাই আছে, আগে তো বলিসনি কখনো। ঘুরে ফিরে রানার গল্পই করতি।’ নজরুল ভাই ফিসফিস করে বললেন, ‘আরে রঞ্জু আমার সৎভাই। রানা আর আমার মা মারা যাবার পর বাবা আবার বিয়ে করেন। রঞ্জু বাবার সেই সংসারের ছেলে। আমাদের সৎভাই।’ রনি ভাই অবাক গলায় বললেন, ‘তার মানে খালাম্মা তোর আর রানার সৎমা?’ নজরুল ভাই জবাব দেন, ‘হ্যাঁ। বেটি আমাদের ভালোই আদরযতœ করে। কিন্তু আমার আর রানার মনে কোনো জায়গা নেই ওই বেটির। আর রঞ্জুকে আমরা বাবার একফোঁটাও সম্পত্তি দেবো না। সৎ কখনো আপন হয় নারে।’
নজরুল ভাইয়ের কথাগুলো বিষের মতো ঢুকল আমার কানে। এই শীতের রাতে কম্বলের তলে আমি ঘামতে শুরু করলাম। নজরুল ভাই এসব বলতে পারল! এই আছে তার মনে! হ্যাঁ, আমি তার সৎভাই, আমার মা তাদের সৎমা, কিন্তু আমাদের মা-ছেলের মনে কোনো হারামি না থাকলেও নজরুল ভাই আমাদের আপন ভাবতে পারছেন না। এত দিনে আজ এই সত্য আল্লাহ আমাদের জানিয়ে দিলেন।
গা থেকে কম্বল সরিয়ে উঠে বসলাম। একি শুনলাম আমি! বুক ধুকধুক করছে। লাইট জ্বালিয়ে দিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ালাম। ওই রকম একটি আয়না আমার বুকের ভেতরেও আছে। সেই আয়নার নাম মনের আয়না। সেই আয়নায় আমি সবসময় চারটি মুখ দেখি। মা, নজরুল ভাই, রানা ভাই আর আমাদের স্বর্গবাসী বাবার মুখটি। শীতের এই গভীর রাতে আমার সেই মনের আয়না ভেঙে চূর্ণ হয়ে গেছে। নজরুল ভাইয়ের ফিসফিস করে বলা কথাগুলো কঠিন এক পাথর হয়ে আমার সেই মনের আয়না ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। পানিতে আমার চোখ টলমল করে উঠল। পাশের ঘর থেকে ঘুমন্ত রানা ভাইয়ের নাক ডাকার শব্দ আসছে। বারান্দায় নজরুল ভাই আর রনি ভাই এই পড়ন্ত শীতে গভীর গল্পে রাত পার করছেন। সেই গল্পজুড়ে থাকছে আমার আর মায়ের কথা, যাদের নজরুল ভাই সৎভাই আর সৎমা বলে আজ আমার ছোট্ট মনটা ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিয়েছেন।
আমিশাপাড়া, নোয়াখালী

 


আরো সংবাদ