২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

গোলের রসে তৈরি হচ্ছে গুড়

-


পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় প্রচণ্ড শীত উপেক্ষা করে কাকডাকা ভোরে প্রতিদিন ঘর থেকে বেরিয়ে গোলের রস সংগ্রহে ব্যস্ত গাছিরা। গোলগাছের ইংরেজি নাম (হুঢ়ধ ভৎঁঃরপধহং)। গোলগাছের ফুলের ডগা কেটে পরিকল্পিতভাবে রস সংগ্রহ করে। ফুলের ডগা কেটে পাত্র বেঁধে রেখে গোলের রস সংগ্রহ করা হয়। এরপর শুরু হয় বাড়ির উঠোনে বসে রস দিয়ে গুড় তৈরি কাজ। আর সেই গুড় স্থানীয় বাজারে বিক্রি করছেন গাছিরা। কিন্তু জলবায়ুর প্রভাবজনিত কারণ ও প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ আর চাষাবাদের অভাবে ঐতিহ্যবাহী এ গোলগাছ এখন ক্রমেই ধ্বংস হতে বসেছে। একসময় এ উপকূলীয় এলাকার বিভিন্ন খাল-বিল ও নদীর তীরে প্রচুর গোলের বাগান দেখা যেত। গাছের নাম গোল হলেও আকৃতি অনেকটা নারিকেল পাতার মতো। ভাদ্র-আশ্বিন মাসে গোলগাছে একটি বা দুটি লম্বা ছড়ায় ফল ধরে। খেজুর গাছের মতো কাঁধিতে জন্মানো এ ফলকে গাবনা বলে। রস সংগ্রহকারী ভালো মানের রস আহরণের জন্য কার্তিক মাসের শুরুতেই হৃষ্টপুষ্ট ছড়াটি রেখে ফলসহ বাকি অংশ কেটে ফেলেন। ছড়াটি বিশেষ পদ্ধতিতে রস সংগ্রহের উপযোগী করে তোলা হয়। অগ্রহায়ণ থেকে ফালগুন মাস পর্যন্ত দিনে দু’বার মাটির হাঁড়ি পেতে রস সংগ্রহ করা হয়। সংগৃহীত রস ফুটিয়ে গুড় তৈরি করা হয়। অতি মিষ্টি এ গুড়ের পরিচিতি একসময় এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে এটি বেশ বাণিজ্যিক প্রসারতা লাভ করেছে। এ গাছের উচ্চতা প্রায় ১৫ থেকে ২০ ফুটের বেশি। সাধারণত লবণাক্ত পলিযুক্ত মাটিতে ভালো জন্মায়। বিস্তীর্ণ এলাকাসহ খালের ধার, চরাঞ্চল গোলগাছ চাষের উপযুক্ত স্থান। গোলগাছের বীজ (গাবনা) মাটিতে পুঁতে রাখলেই চারা জন্মায়। একেকটি গাবনায় ১২৫-১৫০টি পর্যন্ত বীজ থাকে। গোল চাষে মোটা অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করতে হয় না। সহজলভ্য এবং ব্যয় কম হওয়ায় চাষাবাদ অত্যন্ত লাভজনক। গোলগাছ চাষে রাসায়নিক সার, কীটনাশক প্রয়োজন হয় না। এ ছাড়া গোলের গুড় কৃমিনাশক বলে অনেকে মন্তব্য করেন। রস ছাড়াও গাছের নি¤œাংশ দিয়ে নিউজপ্রিন্ট, হার্ডবোর্ড ও আয়োডিনযুক্ত লবণ উৎপাদন করা যায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের সর্ববৃহৎ বনাঞ্চল সুন্দরবনসহ দক্ষিণ উপকূলের বিভিন্ন স্থানে গোলগাছ রয়েছে। তবে বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া, কুয়াকাটা, রাঙ্গাবালি, গলাচিপা, দশমিনা, বাউফল, বরগুনার আমতলী, তালতলী, পাথরঘাটা, ভোলা ও খুলনা জেলার বিস্তীর্ণ এলাকাসহ চরাঞ্চলে গোলগাছের একাধিক বাগান রয়েছে।
স্থানীয়দের সূত্রে জানা গেছে, এই জনপদের সর্বত্র রাখাইন সম্প্রদায়ের লোকজনসহ নি¤œ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ঘরের ছাউনি হিসেবে গোলপাতা ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া শীত মৌসুমে গোলবাগানের মালিকরা এর রস দিয়ে গুড় উৎপাদন করে বাড়তি অর্থ উপার্জন করে থাকেন। রস দিয়ে সুস্বাদু পায়েশ তৈরি করা হয়। সংশ্লিষ্ট গাছিদের সাথে আলাপ করলে তারা জানান, উপকূলীয় এলাকায় যেসব গোলগাছের বাগান রয়েছে, তা প্রকৃতির অশেষ দান। বনবিভাগের এক শ্রেণীর অসাধু বনকর্মীর সহযোগিতায় বনদস্যুরা অবাধে গাছ কেটে নিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে এ গোল বাগানগুলো ধ্বংস হতে বসেছে। গোলগাছ চাষাবাদ অত্যন্ত লাভজনক, সহজসাধ্য এবং ব্যয়ও খুব কম। রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োজন হয় না। এতে কোনো পরিচর্যা করতে হয় না।
শুধু গোলগাছের বীজ (গাবনা) সংরক্ষণ করে তা নিচু জমিতে পুঁতে রাখলেই চারা গজায়। এর একেকটি ছড়ায় এক থেকে দেড়শ’ বীজ থাকে। এতে ব্যয়ের চেয়ে আয় অনেক গুণ বেশি। তবে এ বছর ছড়া থেকে রস অনেক কম বের হচ্ছে বলে নীলগঞ্জ ইউনিয়নের নবীপুর এলাকার অমল ঘরামি জানান।
উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের নবীপুর গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, শিখা রানী হাওলাদার তাফালে খড়কুটা দিয়ে আগুন জ¦ালিয়ে ঢোঙ্গায় রস দিয়ে গুড় তৈরি করছেন। তাকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, ‘বাবা রে, বিয়ের পর থেকেই প্রতি বছর এই সময় রস জ¦াল দিতে হইছে। আবার তা দিয়ে গুড় তৈরি করা হচ্ছে।’
গোলচাষি সজল জানান, এখন বাজারে গিয়ে গুড় বিক্রি করতে হয় না। এক শ্রেণীর খুচরা বিক্রেতা বাড়িতে এসেই গুড় নিয়ে যান। প্রতি কেজি ৮০-১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গুড় ক্রেতা আনসার উদ্দিন বলেন, ‘অন্য গুড়ের চেয়ে আলাদা স্বাদযুক্ত, সাশ্রয়ী হওয়ায় এবং দীর্ঘদিন সংরক্ষিত থাকে বলে গোলের গুড়ের ব্যাপক চাহিদা।’ এ রসের পিঠা বা পায়েশ অতি সুস্বাদু হয় বলেও তিনি জানান।

 


আরো সংবাদ