২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

চাউবা মেমোরিয়াল মনিপুরী মিউজিয়াম

নিজের প্রতিষ্ঠিত মিউজিয়ামে হামোম তনুবাবু -

বাংলাদেশের মনিপুরী সম্প্রদায়ের কয়েক শ’ বছরের লোকসংস্কৃতির ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের নিভৃত আদিবাসী পল্লী ছনগাঁওয়ে গড়ে উঠেছে মনিপুরী জাদুঘর। মনিপুরী অধ্যুষিত আদিবাসী পল্লী ছনগাঁও গ্রামের বাসিন্দা সমাজকর্মী ও মনিপুরী সম্প্রদায়ের সুপরিচিত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হামোম তনুবাবু (৬৬) নিজ বাড়ির একটি কক্ষে গড়ে তুলেছেন অনন্য এ জাদুঘরটি। এককভাবে তিনি পরিচালনাও করছেন এটি। জাদুঘরটির ব্যয়ভার নির্বাহ করছেন তিনি নিজেই। ইতোমধ্যে দেশ-বিদেশের অসংখ্য পর্যটক নিভৃত পল্লীতে অবস্থিত মনিপুরী জাদুঘরটি পরিদর্শনে এসেছেন। হামোম তনুবাবু কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মনিপুরী জাদুঘরে স্থান পাওয়া ১১৬ প্রকারের ১৭১টি দ্রব্য দেখে জাদুঘর পরিদর্শনে আগতরা মুগ্ধ হন।
মৌলভীবাজার জেলার ছায়ানিবিড় আদমপুর ইউনিয়নের ছনগাঁও গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হামোম তনুবাবুর মনিপুরী জাদুঘর ‘চাউবা মেমোরিয়াল মনিপুরী ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি মিউজিয়াম’-এর কথা স্থানীয়দের কাছে শুনে কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর বাজারে যাই। সেখানে গ্রাম্য মেঠোপথে দেখা হয় চলতি বছর এইচএসসি উত্তীর্ণ তরুণ পলাশ সিংহের সাথে। তিনি আমাদের পথপ্রদর্শক হিসেবে পৌঁছে দেন ‘চাউবা মেমোরিয়াল মনিপুরী ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি মিউজিয়াম’-এ। জাদুঘরটিতে পৌঁছে ভালো লাগার আবেশে ছুঁয়ে যায় মন। ছবি তোলার ফাঁকে চলে হামোম তনুবাবুর সাথে জাদুঘরের প্রতিষ্ঠা নিয়ে আলাপন।
আদমপুর উদয়ন সঙ্ঘের সভাপতি ও মনিপুরী কালচারাল একাডেমির সাধারণ সম্পাদক হামোম তনুবাবু আলাপকালে জানান, তার প্রয়াত বাবা হামোম চাউবার স্মৃতি সংরক্ষণে তার বাড়ির একটি সুসজ্জিত কক্ষে গড়ে তোলা হয়েছে এই জাদুঘরটি। নামকরণ করা হয়েছে প্রয়াত বাবার নামানুসারে ‘চাউবা মেমোরিয়াল মনিপুরী ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি মিউজিয়াম’। মনিপুরী জাদুঘর প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে তিনি জানান, ২০০৬ সালে ঢাকায় বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাবের সেমিনার কক্ষে ‘বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতি শনাক্তকরণ ও মূল্যমান নির্ধারণ এবং মেধাস্বত্ব সংরক্ষণ’ শীর্ষক একটি জাতীয় সেমিনারের আয়োজন করেছিল লোকবাংলা গবেষক দল। ওই সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত ছিলেন হামোম তনুবাবু। সেমিনারে অপর বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলা একাডেমির পরিচালক কবি মুহাম্মদ নুরুল হুদা। সেমিনারে হামোম তনুবাবু কর্তৃক উপস্থাপিত মনিপুরী লোকসংস্কৃতির ওপর প্রবন্ধ তৈরির লক্ষ্যে তিনি ২০০৫ সাল থেকে বিভিন্ন মনিপুরী অধ্যুষিত এলাকা ঘুরে নানা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেন। তথ্য ও উপাত্ত সংগ্রহ করতে গিয়ে মনিপুরী লোকসংস্কৃতির অনেক ঐতিহ্য ও নিদর্শন হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি তিনি উপলব্ধি করেন। তার মনে হয় এসব ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা না হলে তা মনিপুরীদের ইতিহাস-ঐতিহ্য থেকে একেবারে হারিয়ে যাবে। বিষয়টি উপলব্ধি করেই তিনি মনিপুরী ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে উদ্যোগ নেন। গ্রামে গ্রামে ঘুরে প্রবীণ মনিপুরী ব্যক্তিত্বদের সহায়তায় মনিপুরী জাতিসত্তার ঐতিহ্যবাহী দ্রব্যাদি সংগ্রহ করতে থাকেন। এক সময় তিনি আদমপুর ইউনিয়নের ছনগাঁও গ্রামের নিজ বাড়ির একটি কক্ষে গড়ে তোলেন বিশাল এক সংগ্রহশালা বা জাদুঘর।
গণমানুষের কবি দিলওয়ার ২০০৬ সালের ১ অক্টোবর হামোম তনুবাবুর স্বপ্ন সাধের ‘চাউবা মেমোরিয়াল মনিপুরী ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি মিউজিয়াম’-এর আনুষ্ঠানিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ওইদিন থেকেই হামোম তনুবাবু তার সংগ্রহশালাকে অধিক সমৃদ্ধ করার প্রয়াসে ঘুরতে থাকেন গ্রামের পর গ্রাম, বাড়ির পর বাড়ি। মনিপুরীদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে সংগ্রহ করতে থাকেন তাদের ব্যবহƒত কৃষি, তাঁত, বিনোদন, খেলাধুলা, শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিভিন্ন নিদর্শন। এক সময় হামোম তনুবাবুর জাদুঘরটি মনিপুরীদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের দ্রব্যাদি দিয়ে সমৃদ্ধশালী হয়ে ওঠে। এ অবস্থায় ২০০৭ সালের ১২ মে বিশিষ্ট কবি ও গবেষক মুহাম্মদ নুরুল হুদা মনিপুরী এই জাদুঘরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
বর্তমানে ‘চাউবা মেমোরিয়াল মনিপুরী ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি মিউজিয়াম’-এ সংরক্ষিত বিভিন্ন ঐতিহ্য ও নিদর্শনের মধ্যে রয়েছেÑ প্রাচীন যুগে মনিপুরীদের নিত্যব্যবহার্য দ্রব্যাদি এবং বর্তমান সময়ের কিছু দ্রব্য। উল্লেখযোগ্য দ্রব্যাদির মধ্যে রয়েছে মীতৈ ময়েক মপি (২৭ অক্ষর বিশিষ্ট মনিপুরী বর্ণমালা), ফিংগারুক (বেতের তৈরি এক ধরনের ঝুড়ি), চেংজাসুক (এক ধরনের টুকরী), য়াংকুক (এক ধরনের চাল ঝাড়ার জিনিস), ঙা-খারাই (মাছ শুকানোর কাজে ব্যবহৃত), লোং (মাছ ধরার কাজে ব্যবহৃত), তুংগোল (মাছ রাখার খালই), কবোক লোং (ধান আলগানোর দ্রব্য), ইসোপ (পানি সেচের হেয়ত), লুবাক (বস্ত্র ও জিনিসপত্র রাখার পাত্র), পোলাং (ঝাঁকা), মেরুক (রান্নার চাল পরিমাপের দ্রব্য), য়েন্দাই (ফুল রাখার পাত্র), তংলালুক (পান-সুপারি রাখার জিনিস), শেলুক (তাঁতিদের ছোটখাটো হাতিয়ার রাখার দ্রব্য), চিল্লুপ (গরু-মহিষের মুখে ব্যবহারের), কাবো-লু, উতোং-লু, সরা-লু, লোংগুব (মাছ ধরার দ্রব্য), শখজেৎ (বাঁশের তৈরী চিরুনি), য়েম্বাক (ছাতা), মোইথাপ-লু (মাছ ধরার পারণ), পাংদেশ (মনিপুরী বাদ্যযন্ত্র), ফিশা শমজেৎ (মনিপুরী বাদ্যযন্ত্র), সুনা উপাক (মনিপুরী বাদ্যযন্ত্র), ফেহৌ কৈরাক (মনিপুরী বাদ্যযন্ত্র), লংচাক (মনিপুরী বাদ্যযন্ত্র), লুপাসী মরি (রুপার তৈরি চেইন), খোংজি (পিতলের তৈরি পায়ে ব্যবহারের শব্দকর), কোরিয়ান (পিতলের তৈরী কানে ব্যবহারের কানফুল), লিরেন তাংখাই (রুপার তৈরী হাতের চুড়ি), খ¦াংথৌরী চরোৎয়ানবী (রুপার তৈরী কোমরে ব্যবহারের অলঙ্কার), ক্রোকারিজ, চাকথোং কোন, কোর্ফু, কোনডেক, চাইরি/সোরিয়া/কোনপাক, সানাপুন (পিতলের কলস), থেংগু পুখম (কাসার থাল), গংগা পুখম (কাসার থাল বিশেষ), তেংগোৎ অয়ৈইশেন (কুপি বাতি), চাইসেন (পানির পাত্র), মীতৈ খুজাই (বিলুপ্ত পানির পাত্র) ইত্যাদি। এ সবের সাথে আরো মনিপুরীদের ব্যবহারের জিনিসপত্র রয়েছে মিউজিয়ামে। এ দ্রব্যগুলোর মধ্যে কিছু কিছু দ্রব্য ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং কিছু দ্রব্য বিলুপ্তপ্রায়।
এক মেয়ে দুই ছেলের গর্বিত জনক হামোম তনুবাবুর মেয়ে হামোম চানু মেনচা এক সময়ে প্রখ্যাত মনিপুরী নৃত্যশিল্পী ছিলেন। ২০০০ সালে তার বিয়ে হয়ে যায়। দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলে এইচ বুয়চা বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে অফিসার হিসেবে কর্মরত। ছোট ছেলে এইচ নানাচা ব্র্যাক ব্যাংকে চাকরি করছেন। বিয়ে ও চাকরির সুবাদে ছেলেমেয়েরা সবাই বাড়ির বাইরে অবস্থান করছেন। এ অবস্থায় হামোম তনুবাবু ও তার স্ত্রী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বীণা রানী সিনহা মিলে সাজিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন ‘চাউবা মেমোরিয়াল মনিপুরী ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি মিউজিয়াম’-এর সমুদয় দ্রব্যাদি। ‘চাউবা মেমোরিয়াল মনিপুরী ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি মিউজিয়াম’ সবার জন্য উন্মুক্ত। এটিতে প্রবেশে কোনো প্রবেশ ফি নেই। সপ্তাহের সাত দিনই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খোলা রাখা হয় মনিপুরী জাদুঘরটি। মনিপুরী সম্প্রদায়ের শত শত বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য জানা যায়, এ জাদুঘরটি পরিদর্শনে।


আরো সংবাদ