২৯ নভেম্বর ২০২২, ১৪ অগ্রহায়ন ১৪২৯, ৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

উন্নতির চাবিকাঠি

-

শৃঙ্খলাহীন জীবন মাঝিবিহীন নৌকার মতো। মাঝিবিহীন নৌকা যেমন স্রোতের টানে যেখানে সেখানে চলে যায়, ঠিক শৃঙ্খলাহীন স্বেচ্ছাচারী মানুষ ধ্বংসের পথে দ্রুত এগিয়ে যায়। মানুষ বুদ্ধিমান জীব। একই সাথে নিয়ম-শৃঙ্খলার প্রতি পরম শ্রদ্ধাশীল। এ গুণের ফলেই মানুষ সমাজ গঠন করে একত্রে বসবাস করতে অভ্যস্ত। সমাজজীবনে যেমন ব্যক্তিজীবনেও তেমনি মানুষের জন্য নিয়মানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলাবোধের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য।
জীবন চলার পথে প্রতিটি কাজের সুনির্দিষ্ট নিয়মকানুন বিদ্যমান। সে নিয়মকেই বলা হয় শৃঙ্খলা। সুশৃঙ্খলাই জীবনকে সুন্দর, গতিশীল ও সার্থক করে তোলে। বিশ্বর সব কিছু এক অদৃশ্য নিয়ম ও শৃঙ্খলার অধীন। যেমনÑ সৌরজগতের গ্রহ-উপগ্রহ থেকে পৃথিবীর গাছপালা, সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত ও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কীটপতঙ্গ একটি নির্দিষ্ট নিয়ম-শৃঙ্খলায় নিয়ন্ত্রিত। কোথাও এর সামান্যতম ব্যতিক্রম বা বিপর্যয় নেই। শৃঙ্খলা হলো উন্নতির চাবিকাঠি যা প্রক্রিয়াকে সমন্বয় করার নিমিত্তে বাধ্যতামূলক অনুসরণীয়। মানবজীবনেও একইভাবে প্রয়োজন সেই নিয়মের শাসন।
জীবনকে সুন্দর ও উন্নত করে গড়ে তুলতে শৃঙ্খলাবোধের একান্ত প্রয়োজন। কারণ শৃঙ্খলাই সৌন্দর্য ও জাতীয় উন্নতির অন্যতম উপায়। শৃঙ্খলা ছাড়া মানবজীবন চলতে পারে না। বিভিন্ন সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান, ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক, সামাজিক অনুষ্ঠান প্রভৃতি সব কিছুই নিয়ম-শৃঙ্খলা অনুযায়ী হয়ে থাকে। নিয়ম-শৃঙ্খলা না থাকলে সমাজে চরম আকারে শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘিœত হয়। তাই নিয়ম-শৃঙ্খলা সমাজজীবনের জন্য অপরিহার্য। শৃঙ্খলাই সমাজকে সুন্দর ও সার্থক করে তোলে। আর শৈশবকালই হচ্ছে মানব জীবনে প্রবেশের সিংহদ্বার। কাজেই শৈশবের সূচনালগ্নেই শৃঙ্খলা ও নিয়মানুশীলনের শিক্ষা গ্রহণ একান্ত জরুরি। মানব জীবনে শ্রেষ্ঠ লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে চাই নিয়মানুবর্তিতা, শৃঙ্খলাবোধের নিখুঁত ও আন্তরিক অনুশীলন। কঠিন নিয়মের বাঁধনে বাঁধতে না পারলে পরিবারে ভাঙন ধরে, সমাজ টেকে না, রাষ্ট্র পর্যন্ত বিপর্যস্ত হয়, প্রতিষ্ঠান অচল হয়ে পড়ে।
শৈশব থেকে প্রতিটি মানব শিশুকে সমাজে বিচরণ করতে হয় বিধায় গ্রহণ করতে হয় নানা সামাজিক দায়িত্ব। কিন্তু সমাজের প্রতিটি মানুষ যদি খেয়ালখুশিমতো যথেচ্ছাচার শুরু করে, তাহলে পুরো সমাজটাই উচ্ছৃঙ্খলতার উন্মাদাগারে পরিণত হতে বাধ্য। সামাজিক জীবনে শৃঙ্খলা বিধান অপরিহার্য। সে ক্ষেত্রে মা-বাবার দায়িত্ব খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ছাত্রজীবনেও শৃঙ্খলাবোধের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কারণ ছাত্রজীবন মানবজীবনের উৎকৃষ্ট সময়। এ সময়ই যথাযথভাবে জীবন গঠন পূর্বক পরবর্তীকালে যথার্থ মানুষ হয়ে ওঠার উৎকৃষ্ট সময়। কেননা ছাত্রদের ভবিষ্যতে দেশ ও জাতির গঠনমূলক কার্যের ভার গ্রহণ করতে হবে।
ছাত্রজীবনে যারা শৃঙ্খলা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন, সে জীবনে উন্নতি লাভ করতে পারবে। তাই ছাত্রদের মেনে চলতে হয় কঠোর নিয়ম ও শৃঙ্খলা। শিক্ষাঙ্গনে নিয়ম-শৃঙ্খলার প্রয়োজনীয়তা অধিক। শিক্ষার্থীদের শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান থাকা একান্ত প্রয়োজন। নিয়ম-শৃঙ্খলার গণ্ডির মধ্যে ছাত্রদের চলার পথকে গৌরবোজ্জ্বল করে ও সফলতা এনে দেয়। শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতা না থাকলে সুশিক্ষা ও জ্ঞানের পরিধি বিস্তার করা অসম্ভব। অবশ্য সব ছাত্রেরই মেধা একরকম থাকে না, আবার আর্থিক সামর্থ্যও সবার একরকম থাকে না, কিন্তু ছাত্র যদি নিয়মনিষ্ঠ জীবন যাপন করেন, শিক্ষা ক্ষেত্রে যদি উপযুক্ত শৃঙ্খলা মেনে চলেন, জীবনযাপনেও যদি তার সঠিক প্রয়োগ করেন তাহলে ছাত্ররাও ভবিষ্যতে শ্রেষ্ঠ নাগরিক ও শ্রেষ্ঠ দেশপ্রেমিকরূপে গড়ে ওঠবেন। যেসব ছাত্রছাত্রী সর্বদাই নিয়ম-শৃঙ্খলার প্রতি চরম উদাসীন এবং নিয়মিত পড়াশোনা করেন না, তাদের জীবনভর অনুতাপের অনলে তিলে তিলে দগ্ধ হতে হয়। তাই বিদ্যালয়ের সব নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চলা প্রতিটি শিক্ষার্থীর দায়িত্ব।
নিয়ম-শৃঙ্খলা শিক্ষার অনুকরণীয় মাধ্যম হচ্ছে জীবজগত। যেমনÑ পাখিরা সকালে ওঠে কলগান করে, রাতে বিশ্রাম নেয়। মৃদুমন্দ বাতাসের পরশে নদীর বুকে কলতান শুরু হয়, আবার বায়ুপ্রবাহ বন্ধ হওয়ার সাথে সাথে নদীর বুক শান্ত হয়ে যায়। মৌমাছি ও পিপীলিকা প্রভৃতি ক্ষুদ্র প্রাণীর মাঝেও নিয়ম-শৃঙ্খলার ব্যতিক্রম দেখা যায় না। তা ছাড়া বনের হরিণ, ভেড়া ও অন্যান্য প্রাণী দলবদ্ধভাবে দলনেতার আদেশ পালন করে। একটা কাককে যদি কেউ আঘাত করে কিংবা হত্যা করে তখন সব কাক দলবদ্ধভাবে এর তীব্র প্রতিবাদ করে। আবার শীতকালে অতিথি পাখি দলবদ্ধভাবে উড়ে এক দেশ থেকে আরেক দেশে যায়। শীত শেষে শৃঙ্খলার সাথে একইভাবে নিজস্ব গন্তব্যে উড়ে যায়। সামান্য পিঁপড়া ও মৌমাছিও সুশৃঙ্খলভাবে একতাবদ্ধ হয়ে মিলেমিশে শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করে। কাজেই আমরা পশুপাখি ও ক্ষুদ্র প্রাণীর জীবন যাত্রার প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি থেকেও অনায়াসে নিয়মানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলার শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি।
জীবন চলার প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের শৃঙ্খলাবোধ ও নিয়মানুবর্তিতার প্রতি অতন্দ্র প্রহরীর মতো সজাগ থাকতে হবে, অন্যথায় জীবনভর পরাজয়ের গ্লানি বহন করতে হবে। পৃথিবীতে যারা বড় হয়েছেন, স্মরণীয় হয়েছেন, তারা জীবন চলার সর্বক্ষেত্রে কঠোরভাবে শৃঙ্খলা ও নিয়মনীতি পালন করেছেন। সে জন্য নিয়ম শৃঙ্খলাহীন মানুষ বা জাতি কোনো দিন উন্নতির শিখরে আরোহণ করতে পারে না। আমাদের সবার জীবন সফল ও স্বার্থক করে গড়ে তুলতে শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন একান্ত প্রয়োজন। হ
লেখক : প্রাবন্ধিক


আরো সংবাদ


premium cement