২৯ নভেম্বর ২০২২, ১৪ অগ্রহায়ন ১৪২৯, ৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

দূষণমুক্ত নদী

-

দেশে নদ-নদী দখল ও দূষণের চিত্র উদ্বেগজনক। দীর্ঘ দিন ধরে দৃষ্টি না দেয়ায় দেশের ২৩০টি নদ-নদী আজ মৃতপ্রায়। এসব নদ-নদী প্রায় ১০ হাজার প্রভাবশালী ভূমিদস্যু দখলবাজরা দীর্ঘ দিন ধরে দখল করে আসছে। কলকারখানার বর্জ্য, নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা শহর, নগরের দূষিত পানি, শহর বাজারের (মাছ, গোশত বাজারের নোংরা বর্জ্য) দূষিত বর্জ্যে ভরে থাকা ড্রেনের সাথে সংযোগ রাখায় নদীদূষণ হচ্ছে। মৃতপ্রায় এসব নদ-নদী দেখলে মনে হয়, যেন বর্জ্য রাখার ভাগাড়। নদ-নদী ধ্বংসের পেছনে কাজ করছে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা।
সম্প্রতি সরকারের বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থা চার ক্যাটাগরিতে ১ হাজার ৮৯ পৃষ্ঠার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য পাওয়া গিয়েছে (সূত্র : সংবাদ ১৩-০৩-২০২০)।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নদ-নদী দখলবাজদের সাথে বেশির ভাগ স্থানীয় ভূমি অফিস ও বিআইডব্লিউটিএর কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ রয়েছে। এ ছাড়া স্থানীয় ক্ষমতাধর প্রভাবশালী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের দৌরাত্ম্যও রয়েছে। সারা দেশে নদী দখল ও দূষণের চিত্রটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। প্রায় প্রতিদিনই নদী দূষণের ও দখলের খবর মিডিয়ায় দেখা যায়। বিআইডব্লিউটিএ সব বিষয়ে দেখাশোনা করার কথা থাকলেও তা না করে অনেক ক্ষেত্রে দখলদারদের সহযোগিতা করে আসছে। সারা দেশে নদীনালা খাল-বিল অবৈধভাবে দখল হওয়ায় পানিপ্রবাহের গতিপথ পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে।
দেশের বেশির ভাগ মিল কলকারখানার বর্জ্য ও বসতবাড়ি, হাটবাজারের নোংরা দূষিত পানি, মৃত প্রাণী, প্রাণীর পচা উচ্ছিষ্ট অংশ নদীতে ফেলা হচ্ছে। শহর এলাকায় অপরিকল্পিত অস্বাস্থ্যকর টয়লেট ব্যবস্থা ও বিভিন্ন ভবনের টয়লেট ড্রেনের সাথে সংযোগ করে নদীতে ফেলা হচ্ছে। এতে নদ-নদীর পানি ব্যবহারের অনুপযোগী ও জলজ প্রাণী ধ্বংস হচ্ছে। ঢাকার পরিবেশ দূষণ বুড়িগঙ্গার দুর্গন্ধযুক্ত পানি ও খাল ডোবার দিকে তাকালে এ দৃশ্য চোখে পড়ে। এভাবে নদী দূষণ ও দখলের কারণে নদীগুলো মেরে ফেলা হচ্ছে, অন্য দিকে পরিবেশ মারাত্মকভাবে হুমকিতে পড়ছে। তা ছাড়া নদীর প্রবাহ না থাকায় প্রতি বছরই বর্ষাকালে মারাত্মক বন্যার সৃষ্টি হচ্ছে। নদী দূষণকারী শুধু প্রভাবশালী কলকারখানার মালিকরাই নয়, সরকার নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন সংস্থা নানাভাবে নদ-নদী দূষণ করছে। কলকারখানার বর্জ্য, রোগজীবাণু বহনকারী মশা-মাছির উপদ্রব ও বংশবিস্তারের সাহায্য করে।
দেশের বেশির ভাগ মিল কলকারখানার বর্জ্য নিজস্ব শোধনাগার না থাকায় দূষণকারীরা তাদের নিজস্ব সম্পদ মনে করে নদী দূষণ করে পরিবেশ নষ্ট করছে। নদী দখল ও দূষণকারীরা এতই শক্তিশালী যে রাষ্ট্্রীয় সব উদ্যোগ তাদের কাছে অসহায় হয়ে পড়ছে। তা ছাড়া নদী দখল এবং দূষণ ঠেকানোর জন্য সরকারি যেসব সংস্থার দায়িত্ব দেয়া আছে, দৃশ্যমান এসব অনিয়ম দেখেও তাদের চুপ থাকার রহস্য উন্মোচিত হওয়া দরকার। অনেক সময় দেখা যায়, সরকারের পক্ষ থেকে নদ-নদী মুক্ত করতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করতে প্রভাবশালীদের বাধার সম্মুখীন হয়ে আর বেশি দূর এগোতে পারে না, থেমে যায়। ক্ষমতাশীল, প্রভাবশালীদের স্বার্থের কাছে নদী উদ্ধারের উন্নয়নকাজ ব্যাহত হোক দেশের ১৭ কেটি মানুষ তা আশা করে না।
নদী রক্ষায় শুধু প্রকল্প গ্রহণ করলেই হবে না, বাস্তবায়নও করতে হবে। নদীর তীরে কলকারখানা নির্মাণ বন্ধ করতে হবে। ইতঃপূর্বে যেসব কলকারখানার বর্জ্য শোধনাগার নেই সেগুলোর শোধনাগার তৈরি বাধ্যতামূলক করতে হবে। দেশের বড় বড় শহর, জেলা শহর, পৌর এলাকা দূষিত বর্জ্য ড্রেনের মাধ্যমে নদীর সাথে সংযুক্ত না করে শোধনাগারের মাধ্যমে শোধন করতে হবে। সমুদ্রের পাড়ে জাহাজ ভাঙা শিল্প নদী দূষণ ও পরিবেশ দূষণের কারণে বন্ধ করতে হবে অথবা নদী দূষণ ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। লঞ্চ স্টিমার নির্মাণ ও মেরামতকালে নদী ও সমুদ্রের পাড়ে তৈলাক্ত বর্জ্য নিঃসরণ বন্ধ করতে হবে।
সর্বদা পানিপ্রবাহ সচল রাখতে হবে এবং যেকোনো মূল্যে দলমত নির্বিশেষে জীবন বাঁচানোর তাগিদে পরিবেশদূষণ ঠেকাতে মৃতপ্রায় নদীকে বাঁচাতে হবে। যেহেতু ক্ষমতাবান প্রভাবশালীরা নদীকে ধ্বংস করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে, নদীগুলো উদ্ধারের কাজে সরকারের সাথে সাধারণ জনগণের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে কাজকে বেগমান করলেই দেশের ২৩০টি নদী বাঁচবে, জলজ প্রাণী বাঁচবে, পরিবেশ বাঁচবে, ১৭ কোটি মানুষের প্রাণ বাঁচবে।
ই-মেইল : সধশধফবৎ৯৫৮@মসধরষ.পড়স


আরো সংবাদ


premium cement