১৪ আগস্ট ২০২২
`

সীমান্ত হত্যার শেষ কোথায়

-

নির্বিচারে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ( বিএসএফ ) গুলিতে প্রতি বছর বহু বাংলাদেশী নিহত হচ্ছেন। অথচ ভারতের অন্য প্রতিবেশী পাকিস্তান কিংবা চীনের সীমান্তে এমন হত্যার ঘটনা ঘটে না। এমনকি ভারতের সীমান্তবর্তী দেশ নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার সীমান্তে সাধারণ নাগরিক শান্তিতে বসবাস করতে পারলে আমরা বন্ধুরাষ্ট্র বাংলাদেশ কেন ভারতের বিএসএফের গুলি খেয়ে মরছি। প্রশ্ন একটাইÑ বিএসএফের গুলিতে কেন শুধু বাংলাদেশের নাগরিক মরেন? ভারতের সীমান্তবর্তী সন্ত্রাসীরা কেন মরেন না। এ যাবৎ কালে বিএসএফের গুলিতে যত বাংলাদেশী নাগরিক মারা গেছেন প্রকৃতপক্ষে তারা বাংলাদেশ সাধারণ কৃষক কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। তা হলে বিএসএফ গুলি করে হত্যা করে, কেন বাংলাদেশী নাগরিকদের সন্ত্রাসী বলছে? আমরা যদি ভারতের বন্ধুরাষ্ট্র হই তা হলে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী আমাদের বন্ধু। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে তার বিপরীত, ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী আমাদের নাগরিকদের গুলি করে তারাই প্রমাণ করছে আমরা তাদের শত্রু। আমরা তাদের বন্ধুরাষ্ট্র ভাবলেও, তাদের ব্যবহার শত্রুরাষ্ট্রের মতো।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে, ২০১৯ সালে সীমান্তে ৪৩ জন বাংলাদেশী নিহত হন। তাদের মধ্যে গুলিতে ৩৭ জন এবং নির্যাতনে ছয়জন। আহত হয়েছেন ৪৮ জন। অপহৃত হয়েছেন ৩৪ জন। ২০১৮ সালে নিহত হয়েছেন ১৪ জন। আর ২০১৭ সালে ২৪ জন। সরকারি হিসাবে এক বছরে সীমান্ত হত্যা ১২ গুণ বেড়েছে বাংলাদেশ। নানা প্রতিশ্রুতির পরও সীমান্ত হত্যা কমছে না। আর গত তিন বছরের হিসাবে সবচেয়ে বেশি সীমান্ত হত্যা হয়েছে গত বছর (২০১৯)। ২০২০ সালের ঠিক একই রকম চলছে।
পশ্চিমবঙ্গভিত্তিক ভারতীয় মানবাধিকার সংগঠন, মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চের (মাসুম) প্রধান কিরিটি রায় বলেন, ‘আগে বিএসএফ বলত আমাদের ওপর আক্রমণ করতে এলে আমরা আত্মরক্ষার্থে গুলি করেছি। লাশ ফেরত দিত। এখন আর তাও বলে না। গুলি করে হত্যার পর লাশ নদীতে ফেলে দেয়। ফেরতও দেয় না।’ তিনি বলেন, ‘ভারত তো একটা হিন্দুরাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। তারা তো সীমান্ত হত্যা বন্ধ করবে না। সীমান্তে মুসলমানদের মারছে। আর ঠেলে বাংলাদেশে পাঠাচ্ছে। আমরা প্রতিটি ঘটনার প্রতিবাদ করছি। কিন্তু ভারত হত্যা করবেই থামবে না। তারা মারছে তো মারছেই। কিন্তু বাংলাদেশের দিক দিয়ে শক্ত কোনো প্রতিবাদ দেখতে পাচ্ছি না। মেরে দিচ্ছে কোনো বিচার নাই।’
বিগত ১০ বছরে প্রায় এক হাজার মানুষ ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক নিহত হয়, যার বেশির ভাগই বাংলাদেশী। সীমান্ত এলাকাকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি হত্যার ক্ষেত্রে পরিণত করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নিরস্ত্র ও অসহায় স্থানীয় বাসিন্দাদের বিরুদ্ধে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যাকাণ্ডের পরিষ্কার প্রমাণ সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত কাউকেই হত্যাকাণ্ডের জন্য অভিযুক্ত করা হয়নি।
মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের রেকর্ড অনুযায়ীÑ ২০০০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে গত ২০১২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এক হাজার ৬৪ জন বাংলাদেশী নাগরিককে হত্যা করেছে বিএসএফ। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০০৭ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ছয় বছরে বিএসএফ গুলি ও শারীরিক নির্যাতনে হত্যা করেছে ৪২ বাংলাদেশীকে। অন্য একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সীমান্তে ৩১২ বার হামলা চালানো হয়। এতে ১২৪ জন বাংলাদেশী নিহত হয়। এর মধ্যে ১৯৯৬ সালে ১৩০টি হামলায় ১৩ জন নিহত, ১৯৯৭ সালে ৩৯টি ঘটনায় ১১ জন, ১৯৯৮ সালে ৫৬টি ঘটনায় ২৩ জন, ১৯৯৯ সালে ৪৩টি ঘটনায় ৩৩ জন, ২০০০ সালে ৪২টি ঘটনায় ৩৯ জন নিহত হয়।
জাতীয় মানবাধিকার সংগঠনের হিসাব অনুসারে, ২০১২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বিএসএফ হত্যা করেছে ৩৫ জনকে। এ সময় বিএসএফ ২২ বাংলাদেশীকে গুলি ও নির্যাতন করে আহত করেছে আর অপহরণ করেছে ৫৮ জনকে ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে ভারতীয়রা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে তিন বাংলাদেশীকে জোর-জবরদস্তি অপহরণ করে নিয়ে গেছে।
বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী, ২০১৩ সালে মোট ২৭ বাংলাদেশীকে হত্যা করেছে বিএসএফ। ২০১৪ সালে হত্যা করা হয়েছে ৩৩ বাংলাদেশীকে। আহত হয়েছেন ৬৮ জন। এ ছাড়া বিএসএফ ধরে নিয়ে গেছে ৫৯ জনকে। ২০১৫ সালে বিএসএফ হত্যা করেছে ৪৫ বাংলাদেশীকে।
২০২০ সালের প্রথম ছয় মাসে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের জেলাগুলোতে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ২৫ বাংলাদেশী নাগরিককে হত্যা করেছে ভারতীয় বিএসএফ। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরেও থেমে নেই এই হত্যাকাণ্ড। ভারতের সাথে সম্পর্কের উন্নতি ঘটলেও তার প্রতিফলন মেলে না সীমান্তে, এমনকি সামগ্রিক প্রেক্ষাপটেও। দুই দেশের আলোচনায় সিদ্ধান্ত হয় যে, বিএসএফ নন-লেথাল (প্রাণঘাতী নয়) অস্ত্র ব্যবহার করবে; যাতে সীমান্তে হত্যা শূন্যতে নামিয়ে আনা যায়। কিন্তু তার পরও কেন এত হুজ্জতি করে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার? সীমান্ত হত্যা এভাবে চলতে পারে না। বাংলাদেশ এবং ভারত সরকারের এখনি উচিত সঠিক সমাধান খুঁজে বের করে, সীমান্ত হত্যা বন্ধ করা। তা না হলে অতিদ্রুত দুই দেশ মধ্যে বন্ধুত্বের ফাটল ধরতে পারে। হ
লেখক : শিক্ষার্থী, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
Sablushahabuddin@gmail.com

 


আরো সংবাদ


premium cement